তিস্তা ব্যারেজ সেরকম একটা আঞ্চলিক খণ্ড ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছে। সেই আঞ্চলিক ইতিহাসের চেহারাটাও এক রকমের নয় কিন্তু সব চেহারাতেই তার আঞ্চলিকতার চরিত্র অত্যন্ত স্পষ্ট।
যেমন, মালদহ-দিনাজপুরের পোলিয়া রাজবংশী থেকে শুরু করে কোচবিহার-জলপাইগুড়ির রাজবংশী পর্যন্ত মিলিত ভাবে নিজেদের আদিবাসীসত্তার প্রাধান্য চেয়ে বাস মাঝে-মাঝেই।
সেই উত্তরখণ্ড পার্টি বা, পার্টি, না বলে উত্তরখণ্ড আন্দোলনের কিছুটা বিবরণ ত আমরা এর আগের পর্বেই পেয়েছি। সেই উত্তরখণ্ড আন্দোলন বা পার্টি কখনোই খুব বড় হয়ে উঠতে পারবে কিনা সেটা আলাদা প্রশ্ন। বরং সে-আন্দোলনের ভেতর এত নানা ধরনের স্বার্থ ও উদ্দেশ্য এসে মিশেছে তাদের সব নেতার একসঙ্গে কাজ করাই মুশকিল। কিন্তু যত মুশকিলই হোক, তেমন দরকারে ত বষের ফিল্ম-আর্টিস্ট শ্রীদেবী আর জল্পেশ মন্দিরের শিবলিঙ্গ–একাকার করে দিয়ে এরা এমন একটা অবস্থা তৈরি করে তুলতে পারে যাতে মনে হয় সত্যি বুঝি এদের পেছনে অনেক লোক আছে। লোকবল, বা, জমায়েতই যদি শক্তি দেখানোর প্রধান উপায় হয়, সে-উপায় ত নানা ভাবেই ব্যবহৃত হতে পারে।
প্রাচীন ইতিহাস, জনবৈশিষ্ট্য এই সব নিয়ে একটি অঞ্চলের বিশিষ্টতা যখন তার বিচ্ছিন্নতার উপাদান হয়ে ওঠে, তখন, ইতিহাসের কোনো উপাদানই অব্যবহৃত থাকে না। উত্তরবঙ্গ শুধু সমতল নয়–তার বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চল পশ্চিমবঙ্গেরই অংশ। সেই পার্বত্য অঞ্চল প্রধানত দার্জিলিং জেলার মধ্যেই ছড়িয়ে, আর-একটা অংশ জলপাইগুড়ি জেলার উত্তরভাগ দিয়ে অনেকখানি নেমে এসেছে। প্রকৃতপক্ষে, জলপাইগুড়ি জেলা যত উত্তরে গেছে ততই তার জনমণ্ডলীর চেহারা বদলে যায়। প্রায় মাঝখান দিয়ে যদি পূর্ব-পশ্চিমে একটা রেখা টেনে জলপাইগুড়ি জেলাকে দুভাগ করা যায়, তা হলে ওপরের ভাগের তিন ভাগের দুই ভাগ রাজবংশী এলাকার বাইরে। এই ভাগে প্রধানত চাবাগান–সেই সূত্রে কোল-মুন্ডা-সাঁওতালরাই প্রধান অধিবাসী। আরো একটু উত্তরে গেলে, নেপালি অধিবাসীরাই প্রধান। এই উত্তরের জলপাইগুড়ির সঙ্গে জলপাইগুড়ির জনবসতিগত পার্থক্য নির্বাচন কমিশনও পরোক্ষে মেনে নিয়েছেন। দার্জিলিঙের লোকসভা আসন বলে যা পরিচিত, তার মধ্যে জলপাইগুড়ি জেলার উত্তরাঞ্চলের অনেকটা পড়ে। অর্থাৎ জলপাইগুড়ি জেলার উত্তরের নেপালিরা, কোল-মুন্ডা-সাঁওতালরা দার্জিলিং লোকসভা আসনের ভোটার। এ ব্যবস্থা দু-তিনটে ভোট ধরে চালু হয়েছে। ফলে পার্বত্য এলাকার সঙ্গে জলপাইগুড়ির একটা সম্পর্ক প্রায় স্থায়ী হয়ে গেছে।
.
১৯৭.
পাহাড় থেকে সমতল
ভৌগোলিক আরো একটা কারণ আছে জলপাইগুড়ির মধ্য দিয়ে পাহাড় আর সমতলের এই সংযোগের।
দার্জিলিঙের সঙ্গে শিলিগুড়ির সমতলভূমির সম্পর্কটাই চোখে পড়ে বেশি, সেই সম্পর্কটাতেই অভ্যস্ততাও বেশি। শিলিগুড়ি থেকে হিলকার্ট রোড দিয়েই দার্জিলিঙের সঙ্গে প্রধান সংযোগ। কিন্তু সেটাই পাহাড়ের সঙ্গে সমতলের একমাত্র সংযোগ নয়। জলপাইগুড়ি জেলার ওদলাবাড়ি থেকে গরুবাথানের রাস্তা সোজা উঠে গেছে লাভা-আলগাড়া হয়ে কালিম্পং। দার্জিলিং পাহাড় থেকে কালিম্পং পাহাড় আলাদা। আর, এই কালিম্পং পাহাড়ের সঙ্গে জলপাইগুড়ির সংযোগ অনেক প্রাচীন। এই গরুবাথানের রাস্তায়, বা লাভা-আলগাড়ার রাস্তায়, বা সরকারি ভাষায় ওল্ড মিলিটারি রোডে জলপাইগুড়ির অনেক চা-বাগান ধীরে-ধীরে ধাপে-ধাপে পাহাড়ে উঠে গেছে, পাহাড়ের আনাচে-কানাচে ঢুকে গেছে, পাহাড়ের আড়াল থেকে গড়িয়ে নেমে এসেছে। পাথরঝোরা, শুড়িবাড়ি, ছোট ফাগু, বড় ফাগু। আবার, এই সব পাহাড় জুড়েই উঠে গেছে জলপাইগুড়ি ডিভিশনের অধীনে ফরেস্টের নানা রেঞ্জ। কোনো একটা জায়গায় জলপাইগুড়ির জেলা শেষ হয়ে দার্জিলিং জেলা শুরু হয়ে যায় বটে, কিন্তু বাইরে থেকে তা বোঝাই যায় না। সর্বত্রই নেপালি শ্রমিক, নেপালি অধিবাসী। মানুষের মুখ আর মুখের ভাষায় কোনো ছেদ ধরা পড়ে না।
সেই নিরবচ্ছিন্ন মুখ আর ভাষার সূত্রেই সম্প্রতিকালে পাহাড়ি মানুষদের এক স্বাতন্ত্রের দাবি পাহাড়, থেকে জলপাইগুড়ির এই সমতলে নেমে এসেছে। সে-দাবিকে কাগজে কাগজে গোখাল্যান্ডই বলা হচ্ছে। বটে যেহেতু পাকিস্তান, খালিস্তান, ঝাড়খণ্ড ইত্যাদির পর যে-কোনো স্বাতন্ত্রের দাবিকেই–স্তান বা ল্যান্ড দিয়ে বোঝানোনা সহজ, কিন্তু আসলে সেই স্বাতন্ত্রের দাবির ভেতর নিহিত আছে–পশ্চিমবঙ্গের এই পার্বত্য এলাকার প্রতি দীর্ঘ-দীর্ঘ দিনের উপেক্ষা, পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তর সমাজে পাহাড়ের মানুষদের যোগ্য ভূমিকার অভাব, নিজেদের মাতৃভাষার অস্বীকৃতি আর, সবচেয়ে বড় কথা, আহত আত্মসম্মানবোধ।
আত্মসম্মান একবার আঘাত পেলে তার নানা বিকার দেখা দিতে পারে যেমন তেমনি আবার সেই আহত আত্মসম্মানবোধ থেকেই আত্মপরিচয় লাভের সুযোগও খুলে যেতে পারে।
পাহাড়ের মানুষ যখন হিশেব দাখিল করে যে পার্বত্য এলাকা থেকে কত কাঠ, কত চা, নীচে যায় আর সেই বাবদ সরকার কত টাকা আয় করে অথচ পাহাড়ের মানুষজনের জন্যে মাথা পিছু কত কম ব্যয় করে–তখন তার ভেতর নিহিত থাকে রাজ্যের সরকারেরই ভাষা ও বচন।
রাজ্যের সরকারও ত প্রায় একই ভাষায় হিশেব দিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে কত টাকা সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার, পায়, অথচ পশ্চিমবঙ্গকে কত কম ফিরিয়ে দেয়। রাজ্যের সরকার যখন মাতৃভাষার গৌরব প্রচার করে, মাতৃভাষাকে এ রাজ্যের সব কাজের ভাষা হিশেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি স্মরণ করে, মাতৃভাষাকে উচ্চতম শিক্ষার বাহন করতে চায়, তখন, এই রাজ্যের একটি অঞ্চলের প্রধান যে-অধিবাসীদের ভাষা বাংলা নয়, তারা ত নিজের উপেক্ষিত ভাষার জন্যে দুঃখ বোধ করতেই পারে।
