এই কোম্পানি ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় এই রকম বিরাট-বিরাট কাজ বছরের পর বছর ধরে করে থাকে। এরকম সমস্যা মেটানোর ব্যাপারে তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দুইই যথেষ্ট আছে।
সেই অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাও তারা কাজে লাগায় সাবকনট্রাকটারদেরও নীচের স্তরে।
সাব-কনট্রাকটারদের কাজের জন্যে আবার কিছু সাবকনট্রাকটার দরকার, বা, বলা ভাল, এক-একটি কাজের জন্যে এক-একজন সাপ্লায়ার দরকার হয়। এসব সাপ্লায়ার লোক্যাল লোক হওয়া ভাল ও নিরাপদ। কারণ স্থানীয় ভাবে কোথায় কোন জিনিশ পাওয়া যায়, তারা ভাল জানে, জোগাড়-করে নিয়েও আসতে পারে, একজন না পারলে আর-একজন সাহায্যও করে।
স্থানীয় ছোটখাট কনট্রাকটারদের হদিশ করে তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার কাজে কোম্পানি সাবকনট্রাকটারদের লাগিয়ে দেয়। মাটিকাটার কাজের শুরুতেই বাশ লাগবে গাড়ি-গাড়ি। শালবরগা লাগবেকত তার শেষ নেই। পাথর ফেলতে হবে পাহাড়-পাহাড় জলের স্রোতের ধার ভাঙতে। এই রকম একটা ব্যারেজের কাজের একটা অংশেরও অংশে শুধু বাশ, বা শাল-বরগা, বা পাথর সরবরাহের কাজ যদি স্থানীয় কোনো কনট্রাকটার পায় সে ত হাতে চাঁদ পেয়ে যাবে।
সাবকনট্রাকটাররা সেই মালবাজার, ওদলাবাড়ি, জলপাইগুড়ির সব কনট্রাকটারদের সঙ্গে এই নিয়ে কথাবার্তা বলে। আর, তাদের প্রত্যেকেই জেনে যায়, ব্যারেজের কাজ শুরু করতে দিচ্ছে না চরের লোজন। কোম্পানির এহিশেবটা পাকা ছিল যে এসব জায়গার জনাপঞ্চাশ, বা শ-খানেক, বা শ-দেড়েক কনট্রাকটারকে সাপ্লাইয়ের কাজ দেয়া যাবেই।
এই সব কথাবার্তার সূত্রে জেলার এই কনট্রাকটাররাও কোম্পানির সমর্থনে এসে দাঁড়ায়। তাদের মধ্যে যাদের রাজনৈতিক ক্ষমতাও কিছুটা আছে, তারা চরের লোকজনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবও খাটাতে থাকে যে এত বড় একটা কাজে ওরকম বাধা দেয়া ঠিক হচ্ছে না।
কিন্তু কোম্পানি সবচেয়ে দক্ষতা দেখায় স্থানীয় গ্রামাঞ্চলে বাজবংশীদের একটা সংগঠন প্রায় তৈরি করে ফেলায়। চরের নমশূদ্রদের সঙ্গে রাজবংশীদের সম্পর্ক কোনোদিনই খুব ভাল নয়। কী করে একথা কাছাকাছি সব গ্রামে রটে যায়–সেই ক্রান্তির হাট ছাড়িয়ে, সেই ওদলাবাড়ি ছাড়িয়ে যে চরের লোকরা কোম্পানিকে বলেছে তাদের কাজে নিতে হবে, রাজবংশীদের কাজে নেয়া চলবে না।
ব্যাপারটা আইন-শৃঙ্খলার মধ্যে গিয়ে পড়ে।
কোম্পানি পরিষ্কার জানায় যে—চরের লোকদের কাজ দিলে রাজবংশীরা দাঙ্গা বাধাবে। রাজবংশীদের কাজ দিলে চরের লোকরা দাঙ্গা বাধাবে। দু-দলকে কাজ দিলে কাজের জায়গায় দাঙ্গা বাধবে। সুতরাং কোম্পানি সরকারের অনুমতি অনুসারে নিজের লোকদের দিয়ে কাজ শুরু করে দেয়।
.
১৯৬.
ব্যারেজের আগেও ইতিহাস আছে
কিন্তু সে ত কাজ শুরুর ব্যাপার। তার সঙ্গে এই এখনকার উদ্বোধনের সম্পর্ক কী। উদ্বোধন মানে ত কাজ শেষ। আংশিক উদ্বোধন মানে অন্তত আংশিক কাজ শেষ। কিন্তু এই ব্যারেজ ছাড়াও ইতিহাস আছে। সে-ইতিহাস ত প্রতিদিন, প্রতি বছরের নানা ঘটনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এখন যেমন তিস্তায় ব্যারেজ বেঁধে তিস্তার খাত পাকাপাকি স্থির করা হচ্ছে, সেভাবে ত আর ইতিহাসে ব্যারেজ বেধে ইতিহাসের খাত ঠিক করা যায় না। ইতিহাসের খাত সব সময়ই মুক্ত তিস্তার মতন। কখনো সে ডাইনে পাড় ভাঙে, কখনো বয়ে। একই বর্ষার শুরুতে সে তার পুরনো চর উৎখাত করে বয়ে চলে। সে বর্ষার শেষে নতুন চর ফেলে সরে যায়। সে-ইতিহাস এই গোটা ভারতেরই হোক, বা, এই তার এক রাজ্য পশ্চিমবঙ্গেরই হোক, অথবা, পশ্চিমবঙ্গেরই একটা অংশ এই উত্তরবঙ্গেরই হোক। খবরের কাগজ, বা রেডিও, বা টিভি পড়ে শুনে দেখে মনে এই ধারণা প্রায় অনড় হয়ে ওঠে যে ইতিহাসের মত বড় ব্যাপার দিল্লি-বম্বের মত বড় শহরে, বা কলকাতার মত রাজধানীতেই ঘটে উঠতে পারে, তারপর সেখান থেকে অন্যত্র ছড়াতে পারে। কিন্তু কোনো-কোনো সময় দেখা যায় উত্তরবঙ্গের মত এক অনির্দিষ্ট ভূখণ্ডেও ইতিহাস একটা নির্দিষ্ট আকার পেতে চায়। বা হয়ত সব খণ্ড অংশেরই একটা নিজস্ব ইতিহাসের গতি আছে। বড় ইতিহাসের গতির সেটা অনুকূলও হতে পারে, প্রতিকূলও হতে পারে। বড় ইতিহাস নিজের বড়ত্বের চাপে কখনো বা সেই প্রতিকূলতাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিতে পারে, কখনো বা সেই প্রতিকূলতাকে নানা মোড়ে ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে অনুকূলতার স্রোতে মিশিয়ে দিতে পারে। কিন্তু কখনো কখনো দেখা যায় সেই আঞ্চলিক খণ্ডের ইতিহাসের বাকা পথ কিছুতেই আর সোজা হচ্ছে না, শেষ পর্যন্ত তা হয়ে দাঁড়ায় মূল ইতিহাসের অসম কিন্তু প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। তিরিশের দশকের মাঝামাঝির আগে কেউ কখনো ভাবতেও পারে নি যে ভারতীয় ইতিহাসের মূল ধারার বিরুদ্ধে মুসলমানের একটা বিচ্ছিন্ন ধারা কোথাও কোনো স্বীকৃতি পেতে পারে। ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইনে সেই বিচ্ছিন্নতার ধারাকে আরো বড় প্রবাহপথ দেওয়া হল। আর তারই ফলে মাত্র দশ বছরের মধ্যে পাকিস্তানের দাবি হয়ে উঠল স্বাধীনতার দাবিরই সমতুল্য। ১৯৪৭-এ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে পাকিস্তানের সেই দাবির বয়স মাত্র সাত বছর–১৯৪০-এর মার্চে লাহোরের সম্মিলনে পাকিস্তানের দাবি প্রথম তোলা হয়–অথচ তা মাত্র এই সাত বছরেই অখণ্ড ভারতের অখণ্ড স্বাধীনতার প্রায় একশ বছরের স্বপ্ন, কল্পনা ও প্রয়াসের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পেরেছিল।
