এখন নদীর পাড়ে, নদীর দিকে পেছন ফিরে সুহাস। তার সামনে একটু দূরে সার্ভে টেবিল। তার থেকে একটু দূরে গাছতলায় সেই চেয়ার। তার থেকেও একটু দুরে, বায়ে এই সমস্ত ভিড়টা গিয়ে জমা হয়েছে এক গাছের নীচে। সুহাস আঙুলে ধরা পেন্সিলের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে। তারপর নিজের বোকামিটাই আরেকবার দেখতে একটু আনমনায় দিগন্তের দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ধূসর জলভূমির দিকে তাকায়। তার ওপর দিয়ে যেন শুধু বাতাসই বয়ে আসছে-ধারাবাহিক কিন্তু প্রবলতর। হে এ বাঘারু–চিৎকারে যেন আবার মোরগ ডেকে উঠল। সুহাস আবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, গাছতলায় সেই ভিড়টার পেছনে সেই খাটো, রোগা, শুকনো লোকটা চিৎকার করছে। তার চিৎকারে ভিড়ের ভেতর কী আন্দোলন হয় সুহাস দেখতে পায় না। কিন্তু কিছু একটা হচ্ছে, অনুমান করে। একটু এগিয়ে যেতেই লোকটি তার পাশে এসে বলে, স্যার, বাতাসটা বেশি ত, পাড়ি দিছি। সুহাস দেখে, একটা লোক তরতর করে গাছটাতে উঠে যাচ্ছে। সে কি সেই লোকটিই, যে চেয়ার মুছছিল? এ-লোকটি যেন সেরকম ভাবেই ডাকল।
যে গাছে উঠছিল সে ত এমন ভাবে গাছে ওঠে যেন হাঁটার চাইতেও গাছে ওঠার অভ্যাসই তার বেশি। কিন্তু সে ডালের খাজ থেকে ম্যাপটা বের করেও বুঝে উঠতে পারে না, ম্যাপটা নিয়ে কী করবে। সে যদি ওপর থেকে ছেড়ে দেয় তা হলে ত বাতাসে আবার উড়ে যাবে। সে যদি হাতে ধরে নামতে যায় তা হলে গাছের ঘসায় ম্যাপ ছিঁড়ে যেতে পারে। কিন্তু সুহাস, তার পাশের সেই হাফশার্ট-পরা লোকটি, আর গাছতলার ঐ ভিড়টা সমস্যা বুঝতে পারলেও লোকটি তা মেটাবার জন্য কিছুই করে না। সে একহাতের ঘেরে নিজেকে গাছটার সঙ্গে সেঁটে রাখে, আর-একহাতে ম্যাপটা ধরে থাকে। বাতাসের ধাক্কায় সেখানেই ম্যাপটা ফরফর করে।
হে-এ বাঘারু মুখত ধরি নামা কেনে, মুখত ধরি নামা।
লোকটি যেন জানতই এরকম কোনো নির্দেশ আসবে। মুহূর্তের ভেতর সে অতবড় ম্যাপটা দাতে চেপে ঝুলিয়ে সড় সড় করে নেমে আসতে শুরু করে–যেন বাতাসের বেগে গাছটাই কাত হয়ে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে–ডালেপাতায় পাখির বাসা, পিঁপড়ের ডিম, এমন-কি সাপখোপ সবই। মাটিতে পৌঁছনের আগেই ম্যাপের একটা কোনা মাটি হোয়। লোকজন সেটা ধরে নেয়। লোকটা দাঁতের কামড় ছেড়ে দেয়। আর অন্যরা ম্যাপটা ধরে সুহাসের দিকে যায়। কিন্তু সুহাসের কাছে পৌঁছনোর আগেই সেই শাটপরা লোকটা নিয়ে নেয়। তারপর সে সুহাসের দিকে হেঁটে এসে, ম্যাপটা দিয়ে বলে–চাপি ধরি রাখিবেন, বড় বাতাস, যেন ম্যাপটা তার প্রীতি-উপহার। নদীর কাছে সার্ভে টেবিলের পাশে সুহাস, আর, ঐ দিকে ভিড়, তারও পেছনে লোকটা কোথায় দেখা যায় না–যে গাছে উঠেছিল। ঐ ভিড় আর সুহাসের মধ্যে এই হাফশার্ট-পরা লোকটা সংযোগ স্থাপন করে যায় যেন। কিন্তু এই লোকটা কে? কোনো-এক জোতদার ত বোঝাই যাচ্ছে। তালটা কী?
.
০২২.
জঙ্গলের ভেতরে
ফরেস্টের ভেতর থেকে প্রিয়নাথ বেরিয়ে আসে, স্যার, একটু ওদিকে চলেন, বিনোদবাবু দাঁড়িয়ে আছেন।
হ্যাঁ, চলুন, প্রিয়নাথের সঙ্গে শালবনে ঢুকতে ঢুকতে সুহাস হেসে বলে, ম্যাপটা হাত থেকে উড়ে গিয়েছিল।
যে বাতাস! আমাকে দেন স্যার, প্রিয়নাথ হাত বাড়িয়ে ম্যাপটা নেয়। সুহাস দেখে সেই শার্টপরা লোকটিও তার সঙ্গে চলেছে। একবার ভাবে বলে দেয়, আপনি কেন আসছেন। কিন্তু বলে না। দরকার কী। ওর সঙ্গে যখন কোনো মাপামাপির ব্যাপারে লাগবে তখন দেখা যাবে। কিন্তু তখনই-বা দেখা যাবে কেন? সুহাস ভেবেই নিচ্ছে কেন, লোকটি কিছু একটা বদ মতলবে ঘুরছে। সন্দেহটা সুহাস মন থেকে সরাতে চায়। কিন্তু মনে লেগে থাকে। আর সে কারণেই যেন সে থেমে, ঘুরে লোকটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে বসে, আপনারা ত এখানকার অনেক দিনের?
প্রশ্নটি শুনে প্রিয়নাথও থেমে যায়, লোকটিও থেমে যায়। প্রিয়নাথ একটু অবাক হয়ে সুহাসের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাত্র ত এই কয়েক পা এসেছে–কিন্তু এতেই সুহাসের মনে হয় যেন ফরেস্টের কত ভেতরে। তিস্তাও দেখা যাচ্ছে না। তাদের সেই মাপামাপির জায়গাও না।
আর চারপাশে বর্ষার ফরেস্টের ঘন সবুজ জঙ্গলের ঘের। শালগাছের কাণ্ডময় গভীর শ্যাওলা। এই সবের ভেতর ওরা, দুজন থেমে যাওয়ায় সুহাসকেও থামতে হয়।
প্রিয়নাথ জিজ্ঞাসা করে, কে স্যার?
সুহাস বলে, না, আপনাকে নয়, ওঁকে জিজ্ঞাসা করছি, আপনারা ত এখানে অনেক দিনের?
প্রিয়নাথ না নড়ে বলে, উনি ত স্যার গয়ানাথ জোতদার। কথাটা শোনাল যেন স্যারটা গয়ানাথের উপাধি। শুনে গয়ানাথ তার দুই হাত বুকের কাছে তুলে নমস্কারের ভঙ্গিতে ঘাড় নুইয়ে থাকে, যেন এখানে সুহাস আর প্রিয়নাথই শুধু নয়, বেশ অনেক লোক আছে, যেন এই গাছগাছড়ার কাছেও তার এই পরিচয়ের একটা অর্থ আছে। ভঙ্গিটা প্রায় অপরিবর্তিত রেখে গয়ানাথ বলে, হয়। মুই গয়ানাথ। লোকটি বোধহয় এই প্রথম তার নিজের ভাষাতেই সম্পূর্ণ কথাটি বলল। সুহাসের চোখেমুখে এই কথার কোনো অর্থ ধরা না পড়লেও সে বলে, ও! আচ্ছা। তারপর পা ফেলে।
গয়ানাথ কিন্তু সুহাস আর প্রিয়নাথের পেছনেই থাকে, পাশে আসে না। সেখান থেকেই জিজ্ঞাসা করে, আপনি, স্যার কী বলিছিলেন?
আপনারা ত এখানে অনেক দিন আছেন?
হ্যাঁ স্যার। আমরা ত এইখানেই থাকি।
