কিন্তু এ-সব ঝগড়াঝাটি, তর্কবিতর্ক শেষ হওয়ার আগেই জরুরি অবস্থা, ৭৭-এর ভোট ও ইন্দিরা গান্ধীর হার। কংগ্রেসই যদি কেন্দ্রে হেরে যেতে পারে, প্রধানমন্ত্রী যদি ভোটে গড়াগড়ি খায়-তা হলে তিস্তা ব্যারেজই বা কী? মহানন্দা ব্যারেজই বা কী? ১৯৭৭ সালের ভোটে রাজ্যে বামফ্রন্টের সরকার হল। ৬৭ আর ৬৯-এর রাজনীতির ধারাবাহিকতা যেন আবার ফিরে এলমাঝখানের দুটো-একটা ভোট আর দুটো-একটা সরকার যেন এলেবেলে হয়ে গেল, যদিও এলেবেলে হতে বছর দশেক লেগেছে।
স্পেশ্যাল সেটলমেন্টের জরিপের কাজ শুরু হল ৭৭-সাল নাগাদই। মালদায় ব্যারেজ-অফিস হওয়ার কোনো প্রশ্নই আর ওঠে না। কিন্তু একটা অফিস নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের কাছে থাকল, কোয়ার্টার-টোয়ার্টারও হল। সংযোগ রাখা, জিনিশপত্র আনা, কলকাতায় ছোটাছুটি, এ-সবের জন্যে এরকম একটা জায়গায় এরকম একটা ক্যাম্পাস দরকার বোধ করল সবাই। বিশেষত ব্যারেজ শেষ হলে তার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও ত আছে।
এ-সবের মধ্য দিয়ে তিস্তা-মহানন্দা মাস্টার প্ল্যানের একটা পর্যায় হিশেবে তিস্তা ব্যারেজের কাজটা কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই হতে লাগল। গাজোলডোবা গ্রাম হয়ে উঠল প্রধান কর্মকেন্দ্র। দেখতে-দেখতে, এপারে গাজোলডোবা আর ওপারে বৈকুণ্ঠপুর ফরেস্টের মাঝখানে, চওড়া-চওড়ি, তিস্তার মাঝখান দিয়ে ব্যারেজ তৈরি শুরু হয়ে যায়। স্লুইস গেট, রিজার্ভেয়ার সহ, তিস্তা ব্যারেজ। সেকাজ এখনো শেষ হয় নি। কিন্তু তার উদ্বোধন এখনই করা হচ্ছে, অন্তত আংশিক উদ্বোধন। সেই উদ্বোধনেই এত জলুশ যাচ্ছে।
.
১৯৫.
শেষ-না হতেই উদ্বোধন
কিন্তু অসম্পূর্ণ ব্যারেজ উদ্বোধনের দরকারটাই-বা পড়ল কেন?
সেটাই সাম্প্রতিক ইতিহাসের ব্যাপার এবং এ গল্পের পক্ষে জরুরি।
এত বড় একটা কর্মযজ্ঞে স্থানীয় লোকজন কিছু সুযোগ-সুবিধে পেয়েই থাকে। কিন্তু সেই সুযোগ-সুবিধের ব্যাপারেই প্রথম থেকে গণ্ডগোল। কাজটা হচ্ছে নদীর ভেতরে চওড়া-চওড়ি। এই ব্যারেজের ফলে তিস্তার জলকে তার মূলখাতে শাসনে রাখা যাবে। এ বর্ষায় এক খাত, পরের বর্ষায় অন্য খাত, বা, একই বর্ষায় প্রথম দিকে বাঁ-পাড় ঘেঁষে, শেষ দিকে ডান-পাড় ঘেঁষে–এই সব আর চলবে না।
কিন্তু ফলে, তিস্তার এই স্বভাবের ফলে, তিস্তার যে-খাত বিরাট হয়ে গেছে, তার মাঝখানে-মাঝখানে অনেক চর তৈরি হয়েছে। সে-সব চর প্রায় ডাঙার মত উঁচুও হয়ে গেছে। তিস্তা ব্যারেজের ফলে নদীখাতের এই সব চরে ত আর বসতি বা চাষবাস চলবে না কারণ, তিস্তাকে তার মূলখাতেই রাখা হবে। সঞ্চিত জল যখন ছাড়া হবে, তখন সেই জলস্রোতের ধাক্কায় এই মধ্যবর্তী চরগুলো ভেসে যাবে।
এই সব চরে প্রধানত পূর্ববঙ্গের নমশূদ্র চাষিরা বসতি করেছে, আবাদ করেছে। কোনো-কোনো জায়গায়, যেমন মউয়ামারির চরে, তাদের কোঅপারেটিভ পর্যন্ত আছে। তিস্তা ব্যারেজের জল কবে ছাড়া যাবে সে-হিশেব এখনো কেউ কষছে না বটে কিন্তু যখনই ছাড়া হোক, এসব চরবসতি তার আগে উঠে যাবে। ইতিমধ্যেই এরা হয়ত অন্যকোনো জায়গায় খোঁজ-খবর করছে। সরকারের সঙ্গেও কথাবার্তা চলছে–এদের আর-কোথাও পুনর্বাসন দেয়া যায় কিনা।
ভবিষ্যতের ব্যবস্থা কী হবে, সেই সব নিয়ে নানা চেষ্টার মধ্যেও ত এরা বর্তমানকে ছেড়ে দিতে পারে না। তাই তিস্তা ব্যারেজের শুরুতেই তাদের দাবি হল–যে ব্যারেজের ফলে তাদের উচ্ছেদ হতে হবে, সেই ব্যারেজের কাজে তাদেরই নিতে হবে। বিশেষ করে মাটিকাটার প্রাথমিক কাজে।
ব্যারেজ কর্তৃপক্ষের এ নিয়ে কিছু বলার নেই। কারণ, কাজ করাবে কনট্রাকটার। সে কোথা থেকে লোক এনে কাজ করাবে, এটা সম্পূর্ণতই তার ব্যাপার। কিন্তু তবু যাতে কাজের শুরুতেই কোনো গোলমাল না বাধে সেইজন্যে সরকারি ইনজিনিয়াররা একটা আপসের চেষ্টা করে।
আপসের পথে বাধা ছিল। কারণ একনস্ট্রাকশন কোম্পানির সারা ভারত জুড়ে কাজ। তাদের সাবকনট্রাকটার, লেবার, এ-সব বাধা। এমনকি তারা এসে গাজোলডোবার জঙ্গল পরিষ্কার করে তাবু গেড়ে ফেলেছে, ইলেকট্রিক লাইন টানবার জন্যে শালগাছের ডালপালা ঘেঁটে দিয়েছে। এই অবস্থায় তাদের অভ্যস্ত ব্যবস্থা বদলাতে কোম্পানি কেন রাজি হবে? একথা আগে ওঠেনি। ফলে, কোম্পানির সাবকনট্রাকটাররা তাদের লোকজনকে আনতে টাকা-পয়সা নিয়ে নানা জায়গায় চলে গেছে। প্রতিদিনই বেশ কিছু মজুর এসে পৌঁছচ্ছে। আপলচাঁদ ফরেস্টের মধ্যে তাদের অস্থায়ী আস্তানার সীমা প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে। এমন-কি, ট্রাক আসার জন্যে যে রাস্তাটা এখন কিছুটা মাত্র তৈরি হয়েছে, তার পাশে, খানিকটা জায়গা জুড়ে ছোটখাট একটা বাজারও কিছুদিন থেকে বসতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় এই সব লোককে বসিয়ে রেখে কোম্পানি কি চরের লোকদের কাজ দিতে যাবে?
আসলে, কোম্পানি একটা গোপন হিশেব করে ফেলেছিল। ব্যারেজের কাজে আসতে পারে কাছাকাছি চরের বাড়তি লোজন, যারা কৃষিকাজে খাটে না। দূরের চর থেকে কেউ এ কাজে আসবে না। আর, এই কাছাকাছির চরগুলো থেকে যত সংখ্যক লোক ব্যারেজের কাজে আসতে পারে, অন্য জেলা থেকে সাবকনট্রাকটারদের সূত্রে তার চাইতে অনেক বেশি লোক কোম্পানির নিজের হাতেই চলে আসবে। এই সব চরের লোকরা যদি বাধা দিতে চায়, শুধু সংখ্যাতেই তারা হেরে যাবে। এই পরিস্থিতির জন্যে কোম্পানির আরো কিছু দিন সময় দরকার ছিল। ইনজিনিয়ারদের সঙ্গে কথা বলে, চরের লোকদের সঙ্গে কথা বলে, পরে কথা বলার দিন ঠিক করে–কোম্পানি এই সময়টা নিচ্ছিল।
