তিস্তা ব্যারেজের পরিকল্পনা কী, কবে থেকে তার কাজ শুরু হয়েছে, কাজ শুরুর আগে কী গোলমাল হয়েছে, রাজ্যের কোন সরকার আর কেন্দ্রের কোন সরকার কী করেছে–সে-সব ত সাতকাহন কথা। তিস্তার জল কোথাও আটকে সেখান থেকে জলবিদ্যুৎ বানানো যায় কিনা-এ নিয়ে নানারকম কথাবার্তা নানা সময়ই হয়েছে। সরকারের ঘরে কাগজপত্রও কিছু কম জমা হয় নি, সে-সুবাদে। কিন্তু জলঢাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের হালের পর কারো ঘাড়ে আর দুটো মাথা ছিল না যে উত্তরবঙ্গের এই সব পাহাড়ি নদী নিয়ে কোনো কথা জোর দিয়ে বলে।
কিংবা, তাও হয়ত নয়। কারণ, জলঢাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিপর্যয়ের পর কারো গর্দানই কাটা, যায়নি। সরকারি কোনো প্রকল্পেই কোনো একজনকে দায়ী করা যায় না। এত নানা স্তর দিয়ে, এত নানা লোক, এত বিভিন্ন পর্যায়ে একটা প্রকল্পের রূপ দেয় যে কোনো এক স্তরের কোনো একজনকে কোন একটি কাজের জন্যে দায়ী করা যায় না। জলঢাকায় সব হিশেবই ঠিক ছিল–জল বছরে কোন-কোন সময় কত পরিমাণ আছে, জলের বেগ কত থাকে, সেই বেগের আঘাতে টারবাইন কত জোরে ঘুরতে পারে, তাতে কতটা শক্তি তৈরি হতে পারে–এ-সব হিশেবের কোনো জায়গায় কোনো ভুল ছিল না। পৃথিবীর সব জায়গায় যে-অঙ্ক মিলিয়ে বিখ্যাত-বিখ্যাত সব জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হয়েছে, জলঢাকাতেও সেই অঙ্ক ছিল নির্ভুল। কিন্তু পৃথিবীর বিখ্যাত বিখ্যাত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অঙ্ককষা বইগুলিতে শুধু ছিল না এখানকার পাহাড়ের বৈশিষ্ট্যের লোকাল ফ্যাক্টার। তাই সেই স্থানিক উপাদান অঙ্কের হিশেবে ধরা হয়নি। এখানকার পাহাড়ে পাথরের চাইতে মাটি অনেক বেশি। জল যখন পাহাড় বেয়ে নীচে নামে, স্বাভাবিক খাতে বা ঢলে, তখন জলের সঙ্গে সঙ্গে নামে পাহাড়ের মাটিও। পাহাড় থেকে মাটি অত খসে যায় বলেই এদিকের পাহাড়ে এত ধস নামে। আর সেই মাটি, জলে গোলা মাটি টারবাইনের ঘূর্ণন যে থামিয়ে দিতে পারে, তা জানা গেল যখন টারবাইন থেমে গেল, তখনই।
জলঢাকার এই অভিজ্ঞতার ফলে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি নদী সম্পর্কে সবাই একটু অনিশ্চিত হয়ে যায়। এরা ঠিক চেনা নদী নয়। এদের স্বভাবও সব সময় বই-পড়া নদীবিজ্ঞানের সঙ্গে মেলে না। বা, এই ধরনের ভৌগোলিক অবস্থানের নদীর বৈশিষ্ট্য নিয়ে তেমন কোনো বইপত্র এখনো লেখা হয়ে ওঠেনি। সুতরাং যতদিন তা না হয়, অর্থাৎ এই সব নদীর ধর্ম পাকাপাকি জানা না যায়, ততদিন নদীগুলো নদীগুলোর মতই থাকুক। মে থেকে অক্টোবর, মৌসুমি বাতাসের প্রথম অভিঘাত থেকে সে-বাতাসের প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত ছয়-ছয়টি মাস, নদীগুলি নানা খাতে বয়ে যাক, নানা ধরনের বন্যায় নানা জায়গা ভাসাক, একই নদীতে ছোট-বড় নানা বন্যা আসুক। বরং, বন্যার হাত থেকে মানুষজনকে বাঁচানোর চেষ্টা করা ভাল, বন্যার মানুষজনের যা ক্ষতি তা পূরণ করে দেওয়া নিরাপদ, কিন্তু, নদীর গায়ে হাত দেয়ার দরকার নেই।
এই সংস্কার কবে কাটল তার সাল-তারিখ খোঁজার দরকার নেই। মোটামুটি বলা যায় ১৯৬৮ সালে তিস্তার সব চাইতে বড় বন্যার পর, ৬৯ সালের দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় তিস্তাপ্রকল্প কথাটা প্রথম খবরের কাগজের পাতায় আসে। তিস্তা-মহানন্দা মাস্টার প্ল্যান কথাটিও সেই সময়ের। কিন্তু তখন এ-সব কথা কাগজে উঠতে-উঠতেই যুক্তফ্রন্টের সরকার চলে যায়। তারপর, আর এ-নিয়ে বিশেষ সাড়াশব্দ হয় নি।
তারপর, আবার উঠল বছরছয়েক পরে। তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের কাজে প্রথম হাত দেয়া হবে, তিস্তা-মহানন্দা মাস্টার প্ল্যান এক-একটা পর্যায় ধরে রূপায়িত হবে, তিস্তা ব্যারেজ ডিভিশন তৈরি হয়ে গেল–এই সব খবর খুব ঘন-ঘন কাগজে তখন বেরতে শুরু করে এক কেচ্ছার সূত্রে। মালদার এক মন্ত্রী ছিলেন এই সবের দায়িত্বে। তিনি নিউ জলপাইগুড়িতে তিস্তা ব্যারেজের এক অফিস আর কোয়ার্টার খুললেন আর তিস্তা ব্যারেজের প্রধান অফিস খুললেন মালদায়।
এই নিয়ে কেচ্ছা তখন বেশ জমে উঠেছিল, কারণ, নিউ জলপাইগুড়ি বা মালদা কোথাওই তিস্তা নেই! যেখানে তিস্তা নদীর নামগন্ধ নেই, সেখানে প্রকল্পের মূল অফিস খোলার একটাই উদ্দেশ্য, যাতে, মন্ত্রীর জায়গার লোক এই প্রকল্পে বেশি চাকরি পায়। সুতরাং জলপাইগুড়ি-কোচবিহার থেকে প্রতিবাদ শুরু হল যে ব্যারেজের অফিস নদীগুলির জেলাতে করতে হবে।
কিন্তু মন্ত্রীর যদি ইচ্ছাই হবে যে তার জেলার বা শহরের লোকরা কাজ পাক, তা হলে ত তিনি মহানন্দা ব্যারেজের কাজেই আগে হাত দিতে পারতেন। তা ত তিনি দেননি। আসলে, মালদায় মূল অফিস হলে তিনি নিয়মিত দেখাশুনা করতে পারবেন। তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে উত্তরবঙ্গের, তথা, পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ নদী তিস্তার প্রকল্পটি যাতে দ্রুততম বেগে ও অল্পতম সময়ে সম্পূর্ণ হয়–তাই তিনি প্রকল্পের মূল অফিসটি মালদা শহরে বসিয়েছেন। তা ছাড়া অফিসে আর ক-জন লোক কাজ করে? নতুন লোক ত নেয়া হবে ব্যারেজ যেখানে হবে, সেখানে। আর লোক ত নেবে, কনট্রাকটাররা। তাতে মন্ত্রীর কী করার আছে?
এই দুই মতের মাঝখানে একটা তৃতীয় মতও ছিল। তারা বোধহয় বিশ্বাস করে না যে কোনো কিছু নিজ অধিকারে পাওয়া যায়। তাই তারা বলে–যেখানে খুশি সেখানে অফিস হোক, ব্যারেজটা ত তিস্তাতেই হচ্ছে। তিস্তায় ব্যারেজ করে মন্ত্রীর কী লাভ? সে তাই অফিসটুকু মালদায় নিয়ে গেছে। মন্ত্রীর এইটুকু লাভ মেনে নিলে ব্যারেজটা হয়ত হত। আর, তা না হলে, মন্ত্রী হয়ত ব্যারেজটাই তুলে নেবে, রাগ করে আর কাজে হাত দেবে না।
