লাল শুকরার পেছনে-পেছনে ঘুরতে-ঘুরতে মাদারি তার সামনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে, বড় জলুশ না ছোট জলুশ? আর-একবার সামনে গিয়ে বলে, ট্রাক আসিবে, ট্রাক?
এসব জিজ্ঞাসার সময় সে খানিকটা দূরত্ব রাখে, অভ্যাসেই। কারণ, উত্তরের বদলে শুকরার হাতের কাঠি তার পিঠে পড়তে পারে। শুকরা এমনিতেই আধা পাগলা, আধা মাতালকী যে করবে, কেউ বলতে পারে না।
কিন্তু দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসার পরই শুকরা একটা অদ্ভুত কাজ করেছিল। সে টিনটা আর কাঠিটা মাদারির দিকে বাড়িয়ে দেয়। মাদারি আরো খানিকটা পেছিয়ে যায়। লে লে বলতে-বলতে টলটলায়মান শুকরা তার পেছনে দু-এক পা আসতে-আসতেই কেশে ফেলে। তারপর টিন আর কাঠি-ধরা বাড়িয়ে রাখা হাতেই দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কাশে, কেশে যায়। তার ঠোঁট বেয়ে লালা গড়াতে থাকে, চোখ দুটো যেন বেরিয়ে আসবে এতটাই বড় হয়ে যায়।
শুকরার হাত থেকে টিনটা আর কাঠিটা নিলে সে অন্তত একটু স্বস্তি পেতে পারে এই আশায় মারি এগিয়ে গিয়ে টিন আর কাঠিটা নিয়ে নেয়, কিন্তু, তাতেও শুকরা তার দুই বাড়ানো হাত শরীরের পাশে নামিয়ে নিতে পারে না–এমনই তার দুর্দম কাশি।
সেটা থামলে, ঢোঁক গিলে, হাত দুটো নামিয়ে, বা হাতের পাঞ্জা দিয়ে মুখের ঘাম একবার মুছে ফেলে, ডান হাতটা তুলে সারা হাটের ওপর বুলিয়ে শুকরা বলে, যা হে মাদারি, ঢোলাই দে, কালি তিস্তা ব্যারাজমে জলুশ হবেক, মিনিস্টার আবেক, ট্রাক আবেক–।
ট্রাক আসিবে? মাদারি জিজ্ঞাসা করে।
জরুর আবেক। ট্রাক জরুর আবেক। সব কোইকো যাবার লাগেক। যাও, ঢোলাই লাগাও মাদারি। বলে শুকরা ডান দিকে ঘুরে মাটির হাঁড়ির দোকানগুলোর পেছনে গাছতলায় প্রথমে গা এলায়, তারপর শুয়ে পড়ে।
আর, মাদারি লাফাতে লাফাতে টিন বগলে নিয়ে কাঠি পেটায়–জলুশ জলুশ, কালি জলুশ, ট্রাক আসিবে, সগায় যাবেন, সগায় যাবেন।
মাদারির বগলে টিনটা আঁটছিল না। তাকে বারবার হাত বাড়িয়ে টিনটা তার শরীরের সঙ্গে চেপে রাখতে হচ্ছিল। আর সেই বাকা অবস্থায় কাঠি দিয়ে পিটতে হচ্ছিল। কিন্তু সে এত তাড়াতাড়ি দৌড়ে-দৌড়ে, সারা হাটে ঘুরছিল যে মনে হচ্ছিল সে কোথাও থেকে টিন পেয়ে শখ করে পিটিয়ে বেড়াচ্ছে। তার কচি গলার চিৎকারে জলুশ, জলুশ আওয়াজটা তখনো নাবসা হাটের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছিল–পাখির চিৎকারের মতন।
হাট তখনো বসেনি, তাই দোকানের সারির ভেতর দিয়ে দৌড়োদৌড়ি করা সম্ভব হচ্ছিল। দোকানিদের সামনে সাজানো দোকানে তখনো প্রায় হাত পড়েনি। তারাও মাদারির এই ঢোলাইয়ে অংশ নিতে পারে। ফলে, মাদারি একটু মজাই পাচ্ছিল।
কিন্তু মজা পেতে-পেতে ঘোমশাইয়ের মিষ্টির দোকানের সামনে আসতেই ঘোমশাই চিৎকার করে ডাকেন, এ-ই মাদারি। নিজের টিনের আওয়াজে মাদারি সে-ডাক শুনতেই পায় না। ফলে ঘোষমশাইকে আরো জোরে হাঁক দিতে হয়, এ-ই মাদারি।
সে-হাঁক শুনে মাদারি চমকে, থেমে, ঘুরে, মিষ্টির দোকানের দিকে তাকায়। দেখে, ঘোমশাই চোখ গরম করে তার দিকে তাকিয়ে। সে বগল থেকে টিন নামিয়ে দুই হাতে টিনটা সামনে ধরে, পায়ে-পায়ে ঘোষমশাইয়ের সামনে যায়।
ঘোষমশাই ধমকে ওঠেন, কে দিয়েছে তোকে, ঢোলাই দিতে?
শুকরা।
কোন শুকরা?
লাল শুকরা।
যা, এখনই দিয়ে আয় তার টিন। ঢোলাই দিচ্ছে! জলুশ হবে কি না-হবে তাতে তোর কী? যা, টিন দিয়ে এসে কাপ ধুয়ে রাখ–
মাদারি চড় খাবে–ভয় পেয়েছিল। না-খাওয়ায় দৌড়ে লাল শুকরার খোঁজে গিয়েছিল। গিয়ে অবিশ্যি তাকে বেশি খুঁজতে হয় না। লাল শুকরা সেই গাছটার তলাতেই শুয়ে আছে আর হাপরের মত শ্বাস ফেলছে।
মাদারি আস্তে-আস্তে পা ফেলে শুকরার কাছে যায়। একটু দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর লাল শুকরা আর গাছটার মাঝখানের একটা ফাঁক দেখে সেইখানে টিনটাকে রেখে দেয়, সাবধানে, যাতে, কোনো আওয়াজ না-হয়, যাতে, লাল শুকরার গায়ে ধাক্কা না লাগে, যাতে, লাল শুকরা জেগে না ওঠে। টিনটা সে ঠিকমত রাখতে পেরেছিল। তারপর কাঠিটা টিনের ওপর রেখেছিল। কিন্তু কাঠিটা টিনের ঠিক মাঝখানটাতে রাখতে পারে না। খানিকটা বেরিয়ে থাকে। সে কাঠিটা ঠিকমত রাখতে আবার হাত বাড়াতেই কাঠিটা গড়িয়ে লাল শুকরার পেটের ওপর পড়ে তার শ্বাসের সঙ্গে ওঠানামা করে। ততক্ষণে মাদারি দৌড়ে আবার ঘোমশাইয়ের দোকানে।
ঘোষমশাইয়ের দোকানে মাদারি দুই হাটবারে দরকারের সময় কাপডিশ ধুয়ে দেয়। দু-এক সময় চাও, দেয়, খদ্দেরদের। চা বানায় বাহাদুর–সে বলেছে, মাদারিকে চা বানানো শিখিয়ে দেবে। ঘোষমশাই তাকে সব সময়ই দু-চার পয়সা দেন। যদি বাহাদুর সত্যি মাদারিকে চা বানানো শিখিয়ে দেয়, তা হলে, সে ঘোমশাইয়ের দোকানে চাকরিও পেতে পারে। কিন্তু চা বানানোর টেবিলটা এখনো তার থুতনি পর্যন্ত। চা বানানো শেখার আগে তাকে আরো লম্বা হতে হবে।
হাট শেষ হওয়ার আগে দেখা গেল–জলুশ একটা না, অন্তত দু-তিনটি। হাতুড়িপার্টি বাগানের লোকজন এনে মিছিল তুলে দিল, আর পাহাড়িরা ফরেস্ট থেকে লোকজন এনে মিছিল সাজাল। দেশি মানষিরও একটা মিছিল উঠল। সবাইই বলে–কাল তিস্তা ব্যারেজে জলুশ।
.
১৯৪.
তিস্তা ব্যারেজ কী করে হল
এ গল্পটা জলুশের সঙ্গে তিস্তা ব্যারেজেই যাবে। তাই, তিস্তা ব্যারেজের কথাটা এখানে সেরে নেয়াই ভাল।
