শ্যাওড়া গাছটা ত আছেই, ঝোরাটাও আছে, কিন্তু, এখানে এই একটু ফাঁকাতে, নানা পাতায় ছাওয়া মাদারির মার ঐ ঘরটা না-থাকলে, সেই ঘরের সামনে একটু জমিতে গাছের ডালপালায় বেড়া-মত দেয়া না থাকলে, কি এই ঝোরার বা এই শ্যাওড়া গাছের নামকরণ প্রয়োজন হত? ঐ ঘরটাকে যারা হঠাৎ ঘর বলে চিনতে পারে, তারাই হয়ত এখানে ট্রাক গাড়ি থামায়, গাড়িকে একটু জল খাওয়ায়, নিজেও একটু হাতেমুখে জল দেয়। তাদেরই মুখে-মুখে হয়ত এই জায়গার একটা নামকরণের দরকার হয়েছিল।
কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও, মাদারির মা যা চেয়েছিল সেটা কিছুতেই ঘটে ওঠে না। বেদিসহ শ্যাওড়া গাছটাকে দেবতার জায়গা বলে মনে হয় না। যদি এক নজরেই মনে হত, তা হলে দশ-বিশ পয়সা ছুঁড়ে দিতে তাদের কারো আপত্তি হওয়ার কথা নয়, যারা হাজার-হাজার মণ মাল নিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে আর-এক প্রান্তে এমন নদীর মত ছুটে যাচ্ছে। কিন্তু মাদারির মা কিছুতেই এই জায়গাটিকে দেবতার জায়গা বলে চিনিয়ে দিতে পারে নি।
অগত্যা, গাড়ি থামলে মাদারিকেই দৌড়ে যেতে হয়। পাহাড়ের মত গাড়িটার চাকার মাঝখান থেকে সে আকাশের দিকে ঘাড় হেলিয়ে হাত পাতে, প্রার্থীর সনির্বন্ধ হাত। ঐটুকু এক শিশুকে ঐ বনের মধ্যে কেমন অনৈসর্গিক বোধ হয়, যেন, আকাশে ডানা মেলে নেমে এল বা মাটি ফুটে উঠে এল। তার ঐ ছুটে আসাটুকুকেই, মাদারির মায়ের ঘর থেকে সেই ছোট্ট ঢাল পেরিয়ে এই রাস্তায় নেমে আবার রাস্তার ঢাল দিয়ে এই ট্রাকের কাছে ছুটে আসা–কেমন অপ্রাকৃত ঠেকে। কিন্তু তারপর, ট্রাকের, পাহাড়প্রমাণ মালবোঝাই ট্রাকের প্রায় চাকার তলা থেকে তার বাড়িয়ে দেয়া সনির্বন্ধ একজোড়া কাঠির মত হাত দেখলেই সে বড় বেশি চেনা ঠেকে, বড় বেশি চেনা, বিশেষত তাদের কাছে যারা সারা দেশের এমন বন, নদী, পাহাড় সমুদ্রপার চিরে-চিরে ছুটছে। হাতমুখ ধোয়ার পর, ট্রাককে জল খাওয়ানোর পর, ড্রাইভার। তার বিরাট বুকপকেট থেকে কিছু খুচরো পয়সা মাদারির হাতে দেয়। তারপর, আবার গাড়িতে উঠে স্টার্ট দেয়ার আগে তাকিয়ে দেখে, ফিরবার সময় মাদারি রাস্তার চড়াইটা বা মাঠের উঁচুটা দৌড়ে উঠতে পারে না, তেঁ ই ওঠে, ধীরে-ধীরে। মাদারির মায়ের ঘরটার সামনে মাদারির মাকেও দু-এক সময় দেখা যায়। সারা দেশের নানা দৃশ্য দেখতে-দেখতে যে-ড্রাইভার বন, নদী, সমুদ্রপার চিরে-চিরে ছুটছে, তার পক্ষেও এই দৃশ্যটা সম্পূর্ণ না দেখে গাড়ি ছেড়ে দেয়া সম্ভব হয় না–মাদারি গাড়ির তলা ছেড়ে এই ন্যাশন্যাল হাইওয়ের দীর্ঘতায়, এই ঘন ফরেস্টের বনস্পতিগুলির নীচে কেমন সাবালক পদক্ষেপে ধীরে-ধীরে চড়াই ভেঙে, মাঠের ডাঙা ভেঙে উঠে যাচ্ছে, উঠে যাচ্ছে।
কিন্তু এমন ট্রাক থামা, এখানে, এই শ্যাওড়াঝোরাতে, এতই অনিশ্চিত। যদি আরো একটু নিয়মিত, থাকত, যাতে মাদারি পয়সাটাও আর-একটু নিয়মিত পেতে পারত!
কিন্তু, তা হলে ত আর মাদারিকে চাকার তলায় দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে পয়সা চাইতে হত না। মাদারি এখন ত হাটের দিন, মিষ্টির দোকান থেকে একটা ন্যাকড়া চেয়ে নিয়ে দাঁড়ানো ট্রাকগুলোর অত বড় শরীরে কিলবিল করে। ট্রাকটার অত বড় বনেট দুহাতে রগড়েরগড়ে মোছে, বনেটের ওপর উঠে ট্রাকের মাথার নকশা মোছে, কাঁচ মোছে, ড্রাইভারের দরজা মোছে, চাকার ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ট্রাকের গা মোছে। প্রথম দিকে ট্রাকের ক্লিনার তাকে তাড়িয়ে দিত। কিন্তু ধীরে-ধীরে, মাদারি এই কাজটা প্রায় আদায় করে নিয়েছে। দুই হাটেই আসে এক চা-বাগানের ট্রাকগুলো। চা বাগানে ট্রাকে মাল আসে না, মানুষ আসে। সেগুলো মুছলে কেউ পয়সা দেয় না। সেগুলোকে বাদ দিলেও মাদারির ট্রাকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এক-একটা হাটে সে চার-পাঁচ টাকা পর্যন্ত পেয়ে যায়। তার মধ্যে কতকগুলি ট্রাক ত যেন তার নিজের–এম-পি-সিং-এর ট্রাক, হরিয়ানার ট্রাক, জনের ট্রাকজন ক্লিনার। শ্যাওড়াঝোরায় নিয়মিত ট্রাক দাঁড়ালে মাদারি ত সেগুলোও মুছতে পারত।
.
১৯৩.
মাদারিহাটে জলুশের ঢোলাই
জলুশের কথা হাটেই শুনেছিল মাদারি। টিন পিটিয়ে-পিটিয়ে হাটে ঢোলাই দিচ্ছিল লাল শুকরা। হাট তখনো বসে নি। মাদারি তার পেছন-পেছন খানিকটা ঘোরে। লাল শুকরা টিন পেটাচ্ছিল আর বলছিল-কাল তিস্তা ব্যারাজ যাবার লাগেক, জলুশ হবে।
শুকরার গলা কফে ঘরঘর করে আর এই কথাগুলো লোকজনকে শোনানোর জন্যে সে গলা তুলছিলও না। ফলে কী যে সে বলছে সেটা কিছুটা শোনা গেলেও, বোঝা যায় না। হাটের লোকজনের অবিশ্যি তা নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না হয় তারা সব কিছুই জানে, নইলে তারা কোনো কিছুই জানতে চায় না।
কিন্তু জলুশ শব্দটি শুনে মাদারি আর শুকরার পেছন ছাড়তে পারে না। সে জানে জলুশ-এর নানা রকম আছে। শুধু হাটের মধ্যে ছোট জলুশ ওঠে। চা বাগানের জলুশ ওঠে–সেখানে মাদারির কিছু করার থাকে না। আর বড়বড় জলুশ মাঝে-মাঝে হয়–তখন ট্রাকে করে শহরে নিয়ে যায়, কখনো আলিপুরদুয়ার, কখনো জলপাইগুড়ি। গতবছর মাদারি একবার আলিপুরদুয়ার শহরে, এরকম জলুশ-এর সঙ্গে গিয়ে, জলুশ-এর সঙ্গেই ফিরে এসেছিল। জলপাইগুড়ি শহর তার দেখা হয়নি।
লাল শুকরা খুব রোগা, মনে হয় যেন হাঁটতে গেলে পড়ে যাবে। তার ওপর সকালেই হাড়িয়া খেয়েছে। নেশা বা শরীরের জন্যেই তার পা ঠিকমত পড়ছিল না। কিন্তু সেই টলমলে পায়ে ঘড়ঘড় গলায় সে বলে যাচ্ছিল, জলুশ হবেক, জলুশ হবে। দেখে মনে হতে পারে, জলুশের কথাটা তার নেশার কথা।
