মাদারির মা তখন কোথায় ছিল সেটা মাদারির মা-ই জানে না। কিন্তু সে যখন এখানে এসে। ডালপালা পাতা দিয়ে ঘর ছেয়ে বসবাস শুরু করে, তখন তার কাছে, আর, যে কারো কাছেই, জায়গাটা। শ্যাওড়াঝোরা বলেই পরিচিত হয়ে যেতে পারে; ঝোরার মুখে শ্যাওড়া গাছটার একাকিত্ব ঐ নির্জনেও এতই একাকী।
শ্যাওড়া গাছের বয়স বোঝা যায় না-যে-গাছ দেখে মনে হয় চারা, সেটা আসলে কয়েক দশকের পুরনো। এ-গাছটা মোটেই তত তরুণ ছিল না। বরং ফরেস্ট থেকে অতটা আলগা, রাস্তা থেকেও একটু বিচ্ছিন্ন ঐ গাছটাকে চোখে পড়ে যায়, তার অবস্থানের জন্যে ত বটেই, কিন্তু অনেকখানিই তার অবয়বের জন্যে। নইলে, ঐ অবস্থানে গাছটা হারিয়ে যেতে পারত। গাছটা যে শুধু বেড়েই উঠেছে, তা নয়, তার একটা শাখা রাস্তার দিকে এগিয়ে এসেছে। এগিয়ে আসার পর আবার সেখান থেকে একটা শাখা ওপরের দিকে বেড়ে গেছে, একটা মাত্র সরল রেখায়। আর-একটা শাখা নীচের দিকে বেড়ে গেছে, আর-একটু ঝাপটা হয়ে, জলের দিকে। সেটার মাথাটা জলের ওপর দোলে, হয়ত কোনো-কোনো সময় জল ঘেঁয়ও। আর ওপরের ডালের মাথাটা বাতাসে দোলে। এই ফরেস্টে, এই রাস্তায়, এমন একটা কোণে, আকাশে বেড়ে ওঠা কোনো দোলা দেখলেই হাতির কথা মনে না হয়েই পারে না। আবছায়ায়, পেছনে ফরেস্টের একীভূত আঁধার, আর মাথার ওপরে পাতাচেরা আকাশের নীল-ঐ একাকী গাছের শাখার অমন নিঃসঙ্গ আন্দোলন দেখলে হাতি বলে ভয়ও হতে পারে আচমকা। জল, জলে ছায়া, বিচ্ছিন্নতা আর অবয়ব নিয়ে শ্যাওড়া গাছটা যেন বৃক্ষদেবতা বা পথদেবতা হওয়ার জন্যে তৈরি হয়েই ছিল-কে চিনতে পারে, তার অপেক্ষায়।
মাদারির মা চিনতে পেরেছিল–কতটা গাছটাকে দেখে, আর কতটা ওখানে মাঝে-মাঝে ট্রাক দাঁড়ায় বলে, তা নির্ণয় করা যাবে না। কিন্তু সে দুহাতে তোলা যায় এমন সব পাথর এনে-এনে জলের ভেতর গাছের গোড়ার কাছে পেতে দিয়েছে। সেই পাথরের স্তর জলের ওপরও উঠে এসেছে-পর-পর বসানো, গোল করে সাজানো, যে-ভাবে প্রাচীন মিশরীয়রা ওবেলিস্ক বানাত, বা এখনো এদিককার পাহাড়ের লোকরা মহাযানী বৌদ্ধচৈত্য বানায়। জলে-জলে সেই পাথরের তূপের তলার দিকটা পুরু শ্যাওলায় ছেয়ে গেছে। শীতেও সে-শ্যাওলা ঘোচে না।
.
১৯২.
শ্যাওড়াঝোরা-রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য
মাদারির মা ভেবেছিল, এরকম দেবতার মত দেখতে শ্যাওড়া গাছটাকে যদি পাথর দিয়ে ঘিরে সত্যি দেবতা বানানো যায়, তা হলে চলতি ট্রাক-বাস থেকে ড্রাইভাররা দু-চার পয়সা ছুঁড়ে দেবে। সে দেখেছে, ড্রাইভাররা এরকম ছোড়ে, বাসের লোকজনও ছোড়ে। এ রাস্তায় বাস যায় বটে কিন্তু তারা হয়ত নতুন করে একটা পয়সা দেয়ার জায়গা বাড়াতে চাইবে না, তবে এত যে ট্রাক যায় এদিক থেকে ওদিক ওদিক থেকে এদিক, মাদারির মা এটাও জানে আসাম থেকে কলকাতা আর কলকাতা থেকে আসাম, তারা ত এখানকার সব কিছু জানে না, তা হলে, এরকম দেবতার মত দেখতে গাছটাকে দু-দশ পয়সা তারা ছুঁড়ে দেবে না কেন?
এমন একটা ফরেস্টের কিনারায়, শ্যাওড়া গাছটার মতই, মাদারির মা কেন থাকে, তার কোনো ইতিহাস নেই। আর-কোথাও থাকার জায়গা নেই, তাই থাকে। কিন্তু এখানে এসে বসবাস শুরু করার পর সে এই শ্যাওড়া গাছটাকে দেবতা বানাবার কাজে সর্বক্ষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তখন মাদারি হয়নি। মাদারির আগের ভাই, কিংবা তার আগের ভাই, কে তখন মাদারির মার সঙ্গে, সেটা মনে করে ওঠা খুব কঠিন। কিন্তু সেই ছেলেকে মাদারির মা খুব শিখিয়েছিল কয়েক মাইল দূরের গণেশমোড় থেকে গণেশের মূর্তিটা চুরি করে আনতে। মাদারির মা তখন তার যে-ছেলের নামে পরিচিত ছিল, সে, প্রায় করেই ফেলেছিল। কিন্তু পরে তার মাথায় বুদ্ধি গজায় যে মাত্র কয়েক মাইল দূরের গণেশমোড় থেকে মূর্তি আনলে ত সবাই টেরই পেয়ে যাবে।
তা হলে? আর-কোনো উপায় মাদারির মার হাতে বা মাথায় ছিল না। পরপর কয়েক বছর গণেশের মোড়ে হাতির পাল রাস্তা আটকানোয় ওখানে মাটির গণেশ মূর্তি বসিয়ে পুজো হল, এখন ট্রাক-বাস সব কিছু থেকেই ওখানে পয়সা ঘেঁড়ে। মাদারির মা ত আর ফরেস্টের হাতির পালকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বলতে পারে না, তোমরা এখানে এসেও রাস্তা আটকাও। অন্তত এই ঢালটাতে যদি দুটো-একটা ট্রাক ওল্টাত তা হলেও তোকজনের একটু ভয়-ভক্তি হত, তা হলে তারা হয়ত দেবতার মত দেখতে শ্যাওড়া গাছটাকে পয়সাও ছুঁড়ত। কিন্তু মাদারির মা অত, বড়বড় ট্রাক ওল্টায় কিসে, তা কী করে জানবে? সেগুলো রাস্তা দিয়ে গেলে তার ঘরের মাটি থরথরিয়ে কাপে।
কিন্তু খুব ভ্যাপসা গরমের বিকেলে মাদারির মা যখন পথে এসে বসে, দেখে-আসন্ন গোধূলিতে শ্যাওড়া গাছের ওপরের শাখাটা হাতির গুঁড়ের মতই নড়ে। নিশ্চিত নড়ে। কায়ও দেখিবার না পায় রো, কায়ও দেখিবার না পায়।
মাদারির মা কী ভেবেছিল, সেটা মাদারির মা-ই জানে। কিন্তু তার ভাবনারও ত একটা সীমা আছে। সারা দুনিয়ায় এত জায়গা ছেড়ে যাকে এসে থাকতে হয় এই ফরেস্টের কাছে, বাঁ, ভেতরেই, এমন একটা অস্পষ্ট ঝোরার পাশে, ন্যাশন্যাল হাইওয়ে বানানোর সময় ফাঁকা করা খানিকটা জমিতে, তার ভাবনার জোর নিশ্চয়ই খুব বেশি নয়।
কিন্তু ঐ ঝোরা, ঐ শ্যাওড়া গাছ আর এই মাদারির মা–এই তিনটির কোনটির সুবাদে এই ফরেস্টের মধ্যে মাইল-মাইল চলা ন্যাশন্যাল হাইওয়েটার এখানকার নাম হয়ে যায় শ্যাওড়াঝোরা?
