কিন্তু মেলাতে ত হবে। বাঘারুকেই মেলাতে হবে। এখানে এই আপাদে বাঘারু না-দেখলে একটা বিরাট লাম্পাতি গাছের বাড় আটকে যায়। কী লাভ বেড়ে যদি বাঘারুই না দেখে? এখানে এই আপাদে একটা লতার কুঁড়ির ফুল হওয়া আটকে যায় বাঘারু না-দেখলে। কী লাভ বেড়ে যদি বাঘারুই না দেখে? এখানে এই তিস্তার একটা স্রোতের একটু উদাসীন সরে যাওয়াও থমকে যায় বাঘারু না-দেখলে। কী লাভ সরে গিয়ে যদি বাঘারুই না দেখে? আর, এই আপলাদের পাশে এই তিস্তা নদীর ভেতর এমন একটা আড়াআড়ি পাহাড় পুঁতে দিয়ে উত্তর আর দক্ষিণের নদীটাকে আলাদা করে দেয়া হবে বাঘারু না-দেখতেই? সেই পাহাড়ের গায়ে এত গেট আর এত মঞ্চ আর এত স্টেজ হবে বাঘারুকে না-দেখিয়েই? এই আপলচাঁদ ফরেস্ট আর তিস্তা দিয়ে তৈরি তার স্বদেশে ঐ তিস্তা ব্যারেজটাকে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে বাঘারু সেই উদ্বোধন মঞ্চের দিকে এগিয়ে যায়। দুপা গিয়েই বোঝে কাঁধে তার ঝাণ্ডাটা তখনো আছে। সে বা হাত বাশটা থেকে সরিয়ে নেয় আর বা কাঁধে একটা ঝাঁকি দেয়। ঝাণ্ডাটা মাটিতে পড়ে যায়, বাঁশের গোড়াটা পড়ে বাঘারুর পরবর্তী পদক্ষেপের নীচে। সেটা মাড়িয়ে বাঘারু এগিয়ে যায়।
এবার বাঘারুর দুই হাত খালি, কাধ খালি, সারা শরীর হাল্কা। একটুকরো নেংটি ছাড়া তার আর-কোনো আবরণ নেই। এখানে, আপলচাদে, তিস্তার পাড়ে, যেমন পা ফেলতে সে আজন্ম অভ্যন্ত সেই ছন্দে তার শরীরটা দুলে ওঠে। দোলে। বাতাসে দুলতে-দুলতে বাঘারু তিস্তা ব্যারেজ উদ্বোধনের ঐ রঙচঙে স্টেজ আর প্যান্ডেলের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে–দেখিবার নাগে ঐঠে কি সত্যিই একখান নতুন নদী বানিবার ধরিছে, নাকি, ময়নাগুড়ির ঐ বেটিছোয়াখানের নাখান নাচানাচি নাগাবার ধরিছে।
৬.১ অন্ত্যপর্ব – মাদারির মায়ের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র
হাট থেকে ফিরে মাদারি বলে, মা, কাল জলুশ হবে, হাটত ট্রাক আসিবে।
জলুশ, বা মিছিল হতে পারে, আর মিছিল হলে তা ট্রাক আসেই। লোজন, না-হলে, যাবে কী, করে? মাদারির মার তাই আর-কিছু জিজ্ঞাসার থাকে না। মাদারির আর-কিছু বলারও থাকে না।
হাটের দিন তাদের ঘুমিয়ে পড়তে বোধহয় একটু দেরিই হয়। হাটফেরতা গরুর গাড়িগুলো কঁকাতে কঁকাতে রাস্তা দিয়ে যায়। তাদের যাওয়াও যেন ফুরয় না, কঁকানিও যেন ফুরয় না। সন্ধে থেকে কঁকানি শুরু করে, কতক্ষণ চলে তা মেপে দেখে কে?
মাদারির মার ঘর ফরেস্টের সীমায় রাস্তা থেকে দেখলে ওটাকে ফরেস্টের সীমা মনে হতেই পারে। ন্যাশন্যাল হাইওয়ের পরে খানিকটা জমি তারপর ফরেস্ট। ফরেস্ট ত আর এরকম নদীর মত পাড় মেনে চলে না। কিন্তু সে যা-হোক, এখানে ঐ চাষের জমিটুকুরছাড় থাকায় ফরেস্টটা হাইওয়ের ওপর একেবারে উঠে আসে নি। ঠিক এই জায়গাটাতে মনে হয়, ফরেস্টের সঙ্গে ন্যাশন্যাল হাইওয়ের একটা ভদ্রগোছের দূরত্ব আছে। কিন্তু এর দুদিকেই ফরেস্টের জঙ্গল রাস্তার ওপর এমন উঠে এসেছে যে ভয় হয় সেই জঙ্গল থেকে একটা বাঘ, লাফিয়ে পড়তে পারে, বা, হাতির একটা শুড় এগিয়ে আসতে পারে, বা, গণ্ডার ঠিক ঐ মুহূর্তেই ছুট লাগাতে পারে। এমন গা ছমছম অবস্থা থেকে একটু স্বস্তি জোটে মাদারির মার ঘরের সামনেই, এই জায়গাটিতে। মনে হয়, বা, ভুল হয়, ফরেস্টের হাত থেকে বাঁচা গেল। কিন্তু এই ঢালটা পেরিয়ে একটু উঁচুতে উঠে খানিকটা এগলেই ফরেস্ট আবার রাস্তায় উঠে আসে।
এই ঢালের জন্যেই বোধহয় এই ফাঁকাটা তৈরি হয়েছে। জমির ঢাল ত বোঝা যায় না, রাস্তার ঢাল বোঝা যায়। ঠিক ঐ-জায়গাটিতেই রাস্তাটা বেশ ঢালু হয়ে অনেকখানি নেমে আবার অনেকখানি উঠে, রাস্তার স্বাভাবিক উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই জায়গার পুরো জমির ঢালটাই রাস্তায় ধরা পড়েছে। জমি-জঙ্গল, শালগাছ-খয়েরগাছসহ পুরো জমিটাই এখানে ঢালে নেমে গেছে। তার একটা কারণও আছে। ফরেস্টের ভেতর থেকে একটা ছোট ঝোরা বয়ে এসে এখানে রাস্তা পেরিয়েছে। সারা বছর ঝোরার খাত থাকে, শুধু বর্ষাকালে জল থাকে, বা জল আসে। রাস্তাটা তাই এমন করা যাতে বর্ষার জল ফরেস্টের ভেতর দিয়ে বয়ে এসে রাস্তার ওপর দিয়ে চলে যেতে পারে। রাস্তার অপর দিকে আবার ঝোরার খাত, তাই রাস্তার ওপর কোনো সময়ই জল জমে থাকে না, কিন্তু রাস্তাটা সব সময়ই ভেজা থাকে, শুধু ভেজাই নয়, রাস্তার ওপর দিয়ে সারাটা বর্ষাই তিরতির করে স্রোত বয়ে যায়। ফরেস্টের ভেতর দিয়ে কিছু রোদ মাটিতে এসে পড়লে, বা, রাতে ট্রাকের হেডলাইটে, সেই স্রোতের ছোট-ছোট রেখা বেশ দূর থেকে দেখা যায়। বেশ লোভনীয় দেখা যায়। রাস্তাটাও এই জায়গায় চওড়া, বেশ চওড়া। একটা ট্রাক সাইড করে রাখলেও বাকি রাস্তাটায় দুটো ট্রাক পরস্পরকে সাইড দিতে পারে। অনেক সময় অনেক ড্রাইভার সেরকম করেও। গাড়ি থামায়। গাড়িতে একটু জল ভরে। নিজেরাও নেমে ঝোরার জল একটু চোখেমুখে দেয়, তারপর চলে যায়। স্টার্ট বন্ধ করার মত বেশি সময় নয়, ঐ একটুখানি দাঁড়ানো, তাও ক্কচিৎ।
তবে, শুধু বর্ষাকাল মানেই ত ছমাস থেকে আটমাস। আসলে, জল থাকে না, বা রাস্তাটা ভেজা থাকে না–খুব শীতের ঐ মাস চার-পাঁচ মাত্র। মাদারির মা, রাস্তার ঠিক পাশে, ঝোরার ভেতর থেকে ওঠা একটা শ্যাওড়া গাছের তলায় কয়েকটা পাথর বসিয়ে একটা বেদিমত বানিয়েছে। গাছটা উঠেছে ঝোরাটা যেখানে ফরেস্টের জমি ছেড়ে রাস্তায় পড়েছে ঠিক সেই জায়গাটায়। সাধারণভাবে গাছটা ওখানে থাকার কথা নয়, বা, মাটি ক্ষয়ে গিয়ে অমন সীমান্তে গাছটার চলে যাওয়ার কথা নয়। এমন হতে পারে, ওখানে হয়েছে বলেই গাছটা ওখানে আছে, এর বেশি কোনো কারণ নেই। আর-এক হতে পারে রাস্তা তৈরির সময়ই গাছটা ওখানে ছিল; যারা রাস্তা তৈরি করেছে, তারা ওর গায়ে হাত দেয়নি। শ্যাওড়া গাছ কাটতে নেই। আর, এখানে, রাস্তাটাকে এতটা ঢালু করতে এতটা চওড়া করতে, ঝোরার মুখ আর ঐদিকে ঝোরা যেখানে নতুন ঢালুতে গেছে রাস্তার সেই মুখটিকে, সিমেন্ট বাধাই করতে–রাস্তা-তৈরির লোকজনকে বেশ কিছু দিন এখানে থাকতে হয়েছে। হয়ত সেই কারণেই সামনে এতটা জমি ফাঁকা–হয়ত ওখানে রাস্তা-তৈরির লোকজনের তাবু গাড়া হয়েছিল। এত পোড়া গাছের গুঁড়িও হয়ত সে কারণেই–জ্বালিয়ে রাখা হত, রাতে, হাতির দল যাতে না আসে। রাস্তার উল্টোদিকে পিচ গলানোর জন্যে দুদিকে হাড়িকাঠের মত পোতা দুটো গাছের পোড়া ডাল এখনো পোতাই আছে, তাদের মাঝখানে গর্তের মধ্যে এককালে জ্বালানো আগুনের ভস্মাবশেষ, বা অঙ্গারাবশেষ, চিরকালীন।
