সুস্থির বলে ওঠে, দেখিলেন না ক্যানং বড় মিটিং হবা ধরিছে? আরো বড় করি কহেন–উত্তরখণ্ড। ঐ মঞ্চ, নিশান এইসব এদের উৎসাহিত করে থাকবে। বেশ জোর গলায় তারা জবাব দেয়, জিন্দাবাদ।
তিস্তা ব্যারেজ বন্ধ করো, বন্ধ করো।
বামফ্রন্টের পৌষ মাস, রাজবংশীদের সর্বনাশ।
তিস্তা ব্যারেজের জলে ভাসিবে কায়, রাজবংশী সমাজ হায়-হায়।
তোমার আমার সর্বনাশ, তিস্তা ব্যারেজ নিপাত যাক।
সবগুলো শ্লোগান যখন তারা বেশ রপ্ত করে নিচ্ছে এরকম ভাবে, তখন ঐ মঞ্চের দিক থেকে একটা জিপ ছুটে আসে। এরা নিজেদের শ্লোগানের আওয়াজ শুনছিল বলে হয়ত গাড়ির আওয়াজ শুনতে পায়নি। তিস্তার এমন আরণ্যক পাড়ে গাড়ির আওয়াজ-টাওয়াজ তেমন বোঝাও যায় না।
গাড়িটা একেবারে বাঘারুর সামনে এসে দাঁড়ায়। সুস্থির বাঘারুর একটু পেছনে দাঁড়িয়ে মিছিলকে শ্লোগান দেয়াচ্ছিল। গাড়িটা থামামাত্রই গাড়ির পেছন থেকে লাঠি ও বন্দুক হাতে কয়েকজন পুলিশ নেমে এগিয়ে আসে আর ড্রাইভারের পাশ থেকে এক অফিসার নেমে ড্রাইভারকে পেছিয়ে খোলা জায়গায় গিয়ে দাঁড়াতে বলে ব্যারেজের দিকে আঙুল তুলে। জিপগাড়িটা পেছিয়ে গিয়ে তিস্তার পাড়ে ডাইনে ঘোরে, ঘুরে আবার একটু পেছিয়ে তিস্তা ব্যারেজের দিকে মুখ করে দাঁড়ায়, স্টার্ট বন্ধ করে কিনা বোঝা যায় না। আর, সেই অফিসার এসে বাঘারুর সামনে কিন্তু একটু বয়ে সরে দাঁড়িয়ে সুস্থিরকে বলে, মিছিল এখনই ভেঙে দিন, শ্লোগান দেবেন না।
এমন আচমকা পুলিশ, লাঠি, বন্দুক দেখে মিছিলটা কেমন নড়ে ওঠে। সুস্থির পুলিশ অফিসারের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে মুঠো পাকানো ডান হাত তুলে চিৎকার করে ওঠে, উত্তরখণ্ড পাটি। মিছিলের মাত্র কয়েকজন যেন অভ্যেসে জিন্দাবাদ বলতেই পুলিশ অফিসার দুপা পেছিয়ে গিয়ে বা হাতের আঙুল নেড়ে পুলিশদের নির্দেশ দেয়। বন্দুক হাতে পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকে কিন্তু দুপা এগিয়ে আসে। আর লাঠি হাতে পুলিশ দুটে আসে–লাঠি উঁচিয়ে নয়, বরং লাঠি নামিয়ে। মিছিলের দু-এক জন দৌড়ে পালাতে হবে বুঝতে না বুঝতেই পুলিশরা মিছিলের দুপাশে দাঁড়িয়ে পড়ে লাঠি মাথার ওপর তুলে মিছিলের দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোকে পিটুতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে মিছিলটা ছত্রখান হয়ে যায়–যে যেদিকে পারে দৌড়ায়, সাইকেলওয়ালারা সাইকেল ফেলে দৌড়য়। আর, পুলিশরা বেশি ছোটাছুটি করে না বটে কিন্তু প্রায় সবাইকেই লাঠির নাগালে টেনে আনে আর এক-এক মারে মাটিতে শুইয়ে দেয়। সেই অফিসার এক পুলিশকে ডেকে সুস্থিরকে দেখায়। সে বেশ তাগ করে সুস্থিরের পিঠের মাঝখানে লাঠিটা মারে। সুস্থির উপুড় হয়ে পড়ে গেলে পুলিশটা লাঠি দিয়েই তাকে চিৎ করে নিয়ে লাঠিটা মাথার ওপর তুলে সুস্থিরের হাঁটুটাতে প্রচণ্ড জোরে মারে। মাত্র মিনিট কয়েকের মধ্যে ফরেস্টের ঐ জায়গায়, তিস্তা ব্যারেজের অত কাছে, উদ্বোধন মঞ্চের পেছনে অতগুলো মানুষ কেমন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে। কোনো চিৎকার চেঁচামেচি পর্যন্ত হয় না। একটা জিপে আর কটা পুলিশ আঁটে? সেকটাও ছিল কিনা সন্দেহ! তারা মাত্র কয়েক মিনিটে উত্তরখণ্ডের স্বতন্ত্র রাজ্যের দাবি আপলৰ্চাদের এক টুকরো জমির ওপর মেরে, ভেঙে, থেঁতলে ফেলে দিয়ে চলে যায়।
.
বাঘারু যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। ঝাণ্ডাটা তার কাঁধেই থাকে। সে পালাতে পারে না, বা, পালাতে পারেনি, বা, পালায়নি, বা, পুলিশের সামনে তার শরীরের পালানোর প্রতিক্রিয়া ঘটেনি। জিপটা তার একেবারে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। অফিসারও তার সামনে তার একটু বায়ে দাঁড়িয়েছিল। পুলিশ তাকে এড়িয়ে পেছনের মিছিলটাকে ধরেছে, যেমন, পেছনের মিছিলটাকে ধরতে একটা বা দুটো গাছও এড়াতে হয়েছে। এড়িয়ে যেতে-যেতেও তারা বাঘারুকে লাঠি দিয়ে মেরে গেছে। কিন্তু কখনোই বাঘারুকে প্রধান লক্ষ্য করে নি। হয়ত, বাঘারু, অত লম্বা বলেই পুলিশদের লাঠি তার শরীরের তেমন কোনো লোভনীয় অংশকে লাঠির আওতায় আনতে পারে নি। হয়ত, বাঘারু, তার ঐ অত লম্বা একটা ন্যাংটো শরীরে, এমনকি পুলিশের পক্ষেও অযোগ্য ঠেকেছে। মিছিল উপলক্ষে গয়ানাথ তাকে অন্তত একটা জামা আর খাটো ধুতি দিলেও পুলিশ হয়ত, তাকে চিনে নিতে পারত।
পুলিশ বাঘারুকে মারেনি বা মারের প্রধান লক্ষ্য করেনি। বাঘারুও পুলিশের লাঠিবন্দুক-গাড়ি দেখে পালায়নি। হয়ত এটা আপলচাঁদ বলেই পালায়নি। এই আপলাদের, এই জংলাজমির, এই গাছ-গাছালির সবটুকু তার এত বেশি চেনা যে সে বুঝেই উঠতে পারে না এখানে সে কোথার আত্মগোপন করতে পারে। একটা মানুষ ত তার বাড়িতেই লুকনোর কোনো জায়গা পায় না–সমস্তটাই তার কাছে এত প্রকাশ্য। তাই তাকে পুলিশ আর মিছিল সব মিশিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। গয়ানাথ তাকে ঝাণ্ডা দিয়ে দাঁড় করিয়েছে। ঝাণ্ডার পেছনে মিছিল। সে-মিছিল এমন তছনছ হয়ে গেলেও বাঘারু দাঁড়িয়েই থাকে।
মিছিলপর্ব এখানেই শেষ হোক। এর পরের পর্বে পুলিশদের পেছন-পেছন যাওয়া যাবে–পুলিশ কেন আসে, কোত্থেকে আসে।
মিছিলের লোকজন যে-যার মত ফিরে গিয়েছে। সাইকেলওয়ালারা সাইকেল নিয়েই ফিরে গেছে। কেউ বাঘারুকে কিছু জিজ্ঞাসা করে নি। কিন্তু এই সব প্রস্থান ঘটে যাওয়ার পর এই আপলচাঁদ, গাছ-গাছালি, জংলাজমি, সামনের তিস্তা আবার বাঘারুর কাছে পুরোপুরি ফিরে আসে। শুধু তিস্তার ভেতরে ঐ বিরাট প্রাচীর, প্রাচীরের ওপর অত গেট আর মঞ্চ, গেটে আর মঞ্চে এত ঝাণ্ডা–এই সব ঐ তার স্বদেশের সঙ্গে ঠিক মেলে না।
