সুস্থিররা নানা জায়গা থেকে ছেলেপিলে জোগাড় করে একটা সাইকেল মিছিল নিয়ে আসে। খান পঞ্চাশেক সাইকেল দেখতে বেশ লম্বাই হয়। সেই মিছিলটা চ্যাংমারি হাটের পাকা রাস্তা ধরে, চ্যাংমারি ফরেস্টের পাশ দিয়ে, গোলাবাড়ি আর পশ্চিম দোলাইগাওয়ের মাঝখান দিয়ে, নেওড়াবস্তির ওপর দিয়ে, সোজা ব্যারেজের দিকে যায়।
আর শ-খানেক লোকের একটা মিছিল পায়ে হেঁটে এই দিকেই চলে, কিন্তু তারা পায়ে হেঁটে যাচ্ছে বলে পাকা রাস্তা অনুসরণ করার কোনো বাধ্যতা তাদের নেই। তারা পাকা রাস্তা ছেড়ে মাঠের মধ্যে দিয়ে পশ্চিম দোলাইগাও থেকে বায়ে ঘুরে নেওড়াবস্তিতে গিয়ে ওঠে। নেওড়াবস্তিতে সাইকেল মিছিল আর পায়ে হাঁটা মিছিল মিলে খানিকটা যায়। কিন্তু তার পর সাইকেল মিছিলটাকে সোজাই যেতে হয়, আর পায়ে হাঁটা মিছিলটা ব্যয়ে সোজা তিস্তার দিকে পুরনো সিদাবাড়ির মুখে চলে যায়। সেখান থেকে তিস্তার পাড় দিয়ে-দিয়ে হেঁটে আপলাদের মুখে পৌঁছয়। সেখানে আবার সাইকেল মিছিল আর পায়ে হঁটা মিছিলটা মেলে। তারপর আপলাদের ভেতর দিয়ে একসঙ্গে গাজোলভোবা-তিস্তা ব্যারেজের দিকে চলে।
মিছিলের কাহিনী ত এক কথাতেই শেষ করে দেয়া যায়, কারণ, শেষ পর্যন্ত ত কেউ জানলই না উত্তরখণ্ডের মিছিল একটা এরকম হয়েছে। আর, তা ছাড়া এই মিছিলটা যাচ্ছিলই প্রায় চুরি করে। সারা জেলা আজ মেতে উঠেছে। ন্যাশনাল হাইওয়ে ল্যাটার্যাল রোড, ক্রান্তি মোড়-ওদলাবাড়ির রাস্তা ধরে ট্রাকে-ট্রাকে মানুষ যাচ্ছে। আর এরা সেখানে যেন সবচেয়ে গোপন রাস্তা দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে কোনো রকমে বিক্ষোভ দেখাতে যাচ্ছে। কিন্তু মিছিলপর্বের শেষ অধ্যায়ে আমাদের জানা দরকার বাঘারু কোথায় ছিল? এই মিছিলেও উত্তরখণ্ডের সেই বিরাট তেকোনা ঝাণ্ডা লম্বা বাঁশের মাথায় বাঘারুর কাঁধেই ছিল।
মাত্র শ-খানেক লোককে ঐ নেওড়াবস্তির বরমতলে বা সিদাবাড়ির তিস্তাপাড়ে কী তুচ্ছ মনে হয়। আর তাও ত এরা কোনো লাইন করে যাচ্ছিল না। একমাত্র বাঘারু ও তার সেই লম্বা ঝাণ্ডাটাই ঐ বিশাল ছড়ানো প্রকৃতিতে এই লোকগুলিকে একটা অর্থে গেঁথে দিচ্ছিল।
আপলচাঁদের ভেতরে ঢুকে দুই মিছিল এক হয়ে যায়। এরাও নিজেদের একটু মিছিলের মত সাজিয়ে নেয়। সবচেয়ে আগে বাঘারু ঝাণ্ডাসহ। তারপর পায়েহাটা মিছিল। শেষে সাইকেল। সাইকেলের অনেকে নেমে সাইকেল হটিয়েও নেয়।
আপলচাঁদ বাঘারুর। বাঘারু আপলচাঁদের। তার পায়ের চাপে এর শুকনো পাতা ভেঙে যায়। তার হাত নাড়ালে এ-ফরেস্টের আপাতদুর্ভেদ্য বাধা দূর হয়ে যায়। এই ফরেস্টের ভেতরই কোথাও তার জন্ম হয়েছিল। এই ফরেস্টের ভেতরই কোথাও বাঘ তার পিঠে ও উরুতে সিল মেরে দিয়েছে যে সে আপলচাঁদের। এতগুলো লোক তার পেছনে থাকা সত্ত্বেও বাঘারু আপলচাঁদে যেন একা-একাই হাঁটে। শুধু কাঁধের অত বড় ঝাণ্ডাটার জন্যে তার চলার ছন্দটা একটু আলাদা হয়ে যাচ্ছে।
তিস্তার পাড় দিয়ে দিয়েই ত বাঘারু অনেকটা এল-এখন তিস্তা দুপাড় থেকেই অনেকটা সরে গেছে। বালি চমকায়, জল চমকায়, আর বাতাস তিস্তার মতই ধীরে বয়ে আসে। আপলাদের ভেতর থেকে এক-একটা ফাঁক দিয়ে কখনো কখনো সেই তিস্তাই দেখা যাচ্ছিল। আবার তিস্তা ঢেকে যাচ্ছিল। কিন্তু তিস্তার ওপর দিয়ে বাতাস অব্যাহত বইছিল।
এরকম যেতে-যেতে–বাঘারুর জন্মস্থান, বা দেশ, বা বাঘারুর পৃথিবীই বলা যায় যে-আপলচাঁদকে, তার ভেতর দিয়ে যেতে-যেতে-বাঘারুর চোখে পড়ে যায় তিস্তা ব্যারেজ। বাঘারু আপলাদের সব, দৃশ্যই ত চেনে। কিন্তু এ দৃশ্য তার চেনা নয়। একবার দেখা যাবার পর থেকে সে-দৃশ্যও মাঝে-মধ্যে ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল কিন্তু ক্রমশই বেশি স্পষ্ট হচ্ছিল। তারপর, সেটা চোখের সামনেই থাকে–তিস্তার ভেতরে আড়াআড়ি বিরাট প্রাচীর, তিস্তার নতুন একটা পাড়ই যেন, তাতে নানা রঙের গেট, নানা রঙের নিশানের মত কিছু উড়ছে।
এমন দৃশ্যে বাঘারু থমকায় না। আপলাদের ভেতরে কোনো নতুন দৃশ্যই বাঘারুকে থমকে দিতে পারে না। তার শুধু একটু সময় দরকার–দৃশ্যটাকে আপনাদেরই অংশ হিশেবে গেথে নেয়ার। শরীর.. ছাড়া ত কিছু নেই বাঘারুর। সেই শরীর দিয়ে যে আপলচাঁদ আর ঐ তিস্তা ব্যারেজটাকে মিলিয়ে নিতে চায়। বাঘারুর কাছে কোনো দৃশ্যই আপাদে অসংলগ্ন থাকতে পারে না। সে ব্যারেজকে। আপলাদের ও নিজের সংলগ্ন করে নিতে চায়।
এই প্রক্রিয়াটা কিছুক্ষণ ধরে চলছে আর বাঘারু মিছিলটা নিয়ে ঐ নতুন প্রাচীর, নানা রঙের ঝাতা, নানা রঙের মঞ্চের দিকেই এগচ্ছে। এগতে-এগতে রাস্তাটা প্রায় শেষ হয়ে আসে, সামনে যদিও। ফরেস্টের গাছ-গাছালি আরো একটু ছড়ানো, তবু ওখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায় তিস্তা ব্যারেজ। একটু ডাইনে। পাহাড়ের মত প্রাচীর। তার ওপর প্রায় আকাশের কাছাকাছি মঞ্চ। লাল-নীল কত রং। কত গেট। মানুষজন ততটা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না কারণ এটা ত প্রায় পেছন দিক। নিশ্চয়ই সামনে মানুষজন থৈ থৈ করছে। এত বড় গেট আর মঞ্চ দেখলেই ত বোঝা যায়, তার সামনে কত লোক থাকতে পারে।
সুস্থির পেছন থেকে চেঁচায়, এইঠে খাড়ান। তারপর সাইকেলটাতে দুবার প্যাডল করে মিছিলে সামনে আসতে-আসতে বলে, ভাল করি খাড়িবেন আর শ্লোগানগিলা একটু প্র্যাকটিস করি নেন। সাইকেলটা বা হাতে ধরে সুস্থির ডান হাত আকাশে তুলে শ্লোগান দেয়, উত্তরখণ্ড পাটি, জিন্দাবাদ।
