.
১৮৯. সেই ক্রান্তি হাট, সেই রাধাবল্লভ
এদিকে সারা হাটে মুহূর্তের মধ্যে রটে যায় যে উত্তরখণ্ড মিছিল বের করেছে, এইবার বামফ্রন্ট মিছিল করবে। রটে যাওয়ায় হাটের ঐ চেঁচামেচির ভেতবেও এক-একদিকে দৌড়োদৌড়ি শুরু হয়ে যায়। কিন্তু কেউই ঠিক বুঝে উঠতে পারে না–উত্তরখণ্ডের মিছিলটা কোথায়। সেই অনিশ্চয়তার ভেতরই হাটের এক কোণ থেকে হৃষিকেশ চিৎকার করে, তিস্তা ব্যারেজ জিন্দাবাদ-জিন্দাবাদ আর দেখতে-দেখতে কাছাকাছি জায়গা থেকে অনেক লোক দৌড়ে এসে হৃষিকেশের পেছনে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করে দেয়। বেঁটে একটা লাঠিতে একটা লাল ঝাণ্ডাও কোথা থেকে এসে যায়। রাধাবল্লভ আর আলবিশ ভগৎ রাস্তার পাশে এক পান-সিগারেটের দোকানের বেঞ্চিতে বসে ছিল। একজন দৌড়ে এসে তাদের বলে, মিছিল, মিছিল, উত্তরখণ্ড মিছিল দিবার নাগিছে। রাধাবল্লভ আর আলবিশ চকিতে উঠে দাঁড়িয়ে চার পাশে তাকায়। বামফ্রন্টের আর-একটা ছোট মিছিল সুধন সাহারা বের করে ফেলেছে। রাধাবল্লভ আর আলবিশ প্রায় দৌড়ে সেই মিছিলের সামনে চলে যায়। মিছিলের সামনে গিয়েই রাধাবল্লভ তার ছাতাটা বা বগলে নিয়ে ডান হাতের কনুই ভেঙে আঙুলগুলো মাথার ওপর দিয়ে পেছনে নিয়ে চিৎকার করে বসে, বন্ধুগণ। সুধন সাহা তাকে টেনে মিছিলের ভেতর এনে বলে, বন্ধুগণ পরে, এখন মিছিল তোলেন, মিছিল তোলেন। রাধাবল্লভ মুঠি আকাশে তুলে হাঁক দেয়, ক্রান্তি হাটে উত্তরখণ্ড চলবে না চলবে না। শ্লোগানটা মুহূর্তে ধরে যায়, যেন, মিছিলটা এই মুহূর্তে এরকম একটা কথাই বলতে চাইছিল। রাধাবল্লভ দ্বিতীয় শ্লোগান তোলে, গয়ানাথ জোতদারের বামফ্রন্ট-বিরোধী চক্রান্ত খতম করো, খতম করো।
এর মধ্যে হাটের আরো কয়েকটি জায়গা থেকে চা বাগানের শ্রমিকরা, ফুলবাড়ি বস্তির লোকজন ইত্যাদি আরো সবাই যে যেখানে ছিল বামফ্রন্টের মিছিল বের করে দিয়েছে। সেসব মিছিলের ক্ষিপ্রতা, দক্ষতা ও নিশ্চয়তা এত বেশি, সে-সব মিছিলের শ্লোগানগুলি রাজনৈতিক ভাবে এত নির্দিষ্ট যে অত বড় ক্রান্তি হাট জুড়ে শুধুই বামফ্রন্টের মিছিল উঠেছে, মনে হয়।
উত্তরখণ্ডের মিছিলটাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনিতেই গয়ানাথের চিৎকার-চেঁচামেচিতে যেকটি লোক জুটেছিল, বামফ্রন্টের এতগুলো মিছিলের এত হৈ চৈ-এ তারা ভয় পেয়ে সরে যায়। ভয় পাওয়া সত্ত্বেও তারা হয়ত সরতে পারত না যদি গয়ানাথ তাদের পাশে থাকত। কিন্তু গয়ানাথ তাদের একটু পেছনে ছিল–তার পক্ষে ত আর মিছিলে হাটা সম্ভব না। কিন্তু সে একে-ওকে ডেকে মিছিলে পাঠাচ্ছিল, তারা গিয়ে মিছিলে পাড়াচ্ছিলও। এর মধ্যে বামফ্রন্টের এতগুলো মিছিল যে হাটে নেমে পড়েছে তা গয়ানাথ, তিলক বা তাদের লোকজন টেরও পায় নি। কারণ, তারা এই মিছিলটা নিয়েই ব্যস্ত ছিল–শ্লোগান কী দিতে হবে কেউ জানে না, হাঁটতেও ঠিকমত পারে না, শুধু বাঘারুর ঘাড়ের ঝাণ্ডাটার জন্যে তাও মিছিলটাকে মিছিল বলে তারা নিজেরা চিনতে পারছিল। কিন্তু সেই সরু লম্বা বাঁশের মাথার লম্বা তিনকোনা ঝাণ্ডাটাও কম ঝামেলা করে না। হাটের দোকানগুলোর মাথার প্লাস্টিক যা চটের ছাউনির দড়ি এদিক-ওদিক করে বাধা। তার তলা দিয়ে বস্তা মাথায় মানুষ না-হয় যেতে পারে, কিন্তু এত বড় ঝাণ্ডা কাঁধে কারো পক্ষে যাওয়া অসম্ভব। হাট মিছিলের জন্যে দরকার ছোট ঝাণ্ডা। আর, বাঘারুর কাঁধের ঐ লম্বা ঝাণ্ডা মাঝে-মাঝেই নামিয়ে মাটির সমান্তরালে ঝুলিয়ে এক-একটা বাধা পার হতে হয়। আর, দু-পা ফেলতে না-ফেলতেই ত সেরকম আরো সব বাধা আসে। এই সবের ফলে উত্তরখণ্ডের মিছিল বা গয়ানাথের মিছিল কখন শুরু হয় আর কখন ভেঙে যায় সেটা বোঝাই যায় না। বামফ্রন্টের নানা মিছিল যখন সেই গোহাটা থেকে এই হাড়িয়াহাটা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে আর আত্মবিশ্বাসে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তখন তামাকহাটি আর গামছাহাটির মাঝখানের মোড়টায় বাঘারু একা ঝাণ্ডাটা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যেমন সে নিমগাছের তলায় ছিল। এখানে ঝাণ্ডাটা অবিশ্যি খাড়াই ছিল। তার একটু দূরে তিলক দাঁড়িয়ে। আরো একটু দূরে গয়ানাথ দাঁড়িয়ে। এই তিনজনের দাঁড়ানোর মধ্যে কেনো যোগসূত্রও থাকে না–এটুকু ছাড়া যে তিনজনের দাঁড়ানোর জায়গা একটু অদ্ভুত। বামফ্রন্টের কোনো-কোনো মিছিল উত্তরখণ্ডের ঝাণ্ডাটার দিকে প্রায় ছুটতে-ছুটতে এসে দেখে-কোমরে দেড়হাতি ত্যানা জড়ানো একটা লোক ঝাণ্ডা নিয়ে খাড়া দাঁড়িয়ে। যেন, কোনো বটগাছের উঁচু ডালে কেউ মানতের ঝাণ্ডা বেঁধে গিয়েছে। দু-একজন যে বাঘারুকে দুটো-একটা ধাক্কা দেয় না, তা নয়, কিন্তু বাঘারু দৃশ্যতই এত অবান্তর যে সে-ধাক্কাতেও কোনো জোর ছিল না। তার চাইতে গয়ানাথ জোতদারকে, দেখে সেদিকে মিছিলটা নিয়ে যাওয়া অনেক লোভনীয় ঠেকে। গয়ানাথ কিন্তু দাঁড়িয়েই থাকে।
.
১৯০. বাঘারুর মিছিলমুক্তি ও মিছিলপর্বের শেষঅধ্যায়
তিস্তা ব্যারেজ উদ্বোধনের দিন উত্তরখণ্ড চ্যাংমারি ব্যারেজের রাস্তাটাই বেছে নেয়, কারণ, ক্রান্তি হাটের পাকা রাস্তা সেদিন বামফ্রন্ট ও সরকারের দখলে। গয়ানাথের যা লোজন তা ত প্রধানত এই রাস্তাটারই এদিক-ওদিক। এর বাইরে দূরে-দূরে গয়ানাথের জোতজমির লোকজনের সঙ্গে ত আর তার রোজ দেখা হয় না, তাই, সেসব লোক আর গয়ানাথের মানষি নেই।
