আসে না? শালো বলদের দল! গয়ানাথ এসে পড়ায় ও চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করায় ছোট একটা ভিড় জমে যায়। সেদিকে তাকিয়ে গয়ানাথ চিৎকার করে একজনকে ডাকে, এই কানকাটু, যা কেনে, হাটত য্যায়লা আসিছে সগাক ডাকি নিয়া আয়, শালো বলদের দল!
কানকাটু হাটের দিকে দৌড়ায়। গয়ানাথ বলতে চেয়েছে, তার যে সব লোক হাটে আছে তাদের ডেকে আনতে। কিন্তু পেছন থেকে একজন মুখ লুকিয়ে চিৎকার করে ওঠে, হাট ভাঙি সগায় চলি আইসেন, ভটভটি জোতদারের মিছিল নাগিবে।
শালো, তোর বাপের বলহরির মিছিল নাগিবে, গয়ানাথ ভিড়টার দিকে চিৎকার করে বলে।
তিলক বাঘারুকে হাত ধরে এগিয়ে এনে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেয়, তারপর ভিড়টার দিকে তাকিয়ে বলে, লাইন নাগান, লাইন নাগান, মিছিল করিবার নাগিবে।
তিলক একটা ভুল করেছিল। সে ভেবেছে এই ভিড়টার সবাই মিছিলে যাবে। কিন্তু ভিড়টা জমা হয়েছিল গয়ানাথকে দেখে, গয়ানাথের চেঁচামেচিতে। তা ছাড়া ক্রান্তি হাটে উত্তরখণ্ডের মিছিল উঠবে–এর ভেতর একটা উত্তেজনাও ছিল। সেই ভিড়ের দু-একজন এসে বাঘারুর পেছনে দাঁড়ায় বটে, কিন্তু বাকিরা একটু-আধটু সরে যায়। তা ছাড়া, যারা ছিল তাদের তিলক যখন আবার ডাকে, আসেন আসেন, মিছিল করিবার নাগিবে, তখন তাদের একজন ঠাণ্ডা গলায় বলে দেয়, হামলা উত্তরখণ্ড না হই। বামফ্রন্ট।
গয়ানাথ ভিড়টার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে, শালো, ফন্ট? কাম নাই কুত্তার নহরে সার। বামফ্রন্ট। ত এইঠে কী? শালো, বাম? পাছাত বাশ সিন্ধাইছে–স্যালায় বান?
যে নিজেকে বামফ্রন্ট বলে পরিচয় দিয়েছিল সে একই রকম ঠাণ্ডা গলায় বলে, এ্যাল্যাং-প্যাল্যাং কথা না কহেন দেউনিয়া। তার এই প্রতিবাদে দৃঢ়তা ছিল বটে কিন্তু একটু যেন দ্বিধাও ছিল, গয়ানাথ জোতদারের একেবারে মুখোমুখি তাকে অপমানকর কিছু বলার দ্বিধা।
এর মধ্যে হাটের ভেতর থেকে কিছু লোক বেরিয়ে গয়ানাথের দিকে আসতে শুরু করেছে। তাদের প্রায় প্রত্যেকের হাতেই বাজারের থলি বা ঝুড়ি। তারা আসে বটে, কিন্তু কেউই এসে বাঘারুর পেছনে লাইনে দাঁড়ায় না, একটু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। কেউ-কেউ বসে পড়ে।গয়ানাথ বা থেকে ডাইনে মাথাটা ঘুরিয়ে তাদের সবাইকেই বলে, শালো, বলদের ঘর, সব এইঠে আসিছেন বাপের বিয়া দেখিবার তানে? লাগা কেনে, মিছিল লাগা, লাগা। গয়ানাথ একদিকে মারমুখো হয়ে এগিয়েই যায় কিন্তু লোজন ছড়িয়ে ছিল বলে দিকটা ঠিক করতে পারে না।
গয়ানাথের এ-চিৎকারে যারা বসেছিল তারা শুধু উঠে দাঁড়ায়, আর যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা মুখটা ঘুরিয়ে বাঘারুর দিকে দু-এক পা আসে কি আসে না।
গয়ানাথ এবার তিলককে বলে, এইঠে খাড়ি-খাড়ি করিছেনটা কী? সগাক দাড়ি করি ধরেন মিছিল।
তিলক আগে একবার অপ্রস্তুত হয়েছে। কিছুটা সঙ্কোচের সঙ্গেই একজন আলগা দাঁড়ানো লোককে গিয়ে বলে, খাড়ি যান, লাইন নাগান। সে লোকটি তিলকের নির্দেশ অনুযায়ী গিয়ে লাইনে দাঁড়ালে, আরো কয়েকজন তার পাশে ও পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
হেই ভাদই, হেই কাতুরা, ঐঠে কি বাংকুয়াখান ধরি, তোর ধোকর বাপের সম্পত্তি বেচিবার ধরিছিস? ভাদই ও কাতুরা একটু অন্যমনস্ক পায়ে এসে লাইনে দাঁড়ায়। তাদের হাতে বাক। হয়ত কিছু বেচার জন্যে বাকে করে নিয়ে এসেছিল–নয়ত কিছু কিনে বঁকে বয়ে নিয়ে যাবে। এখন বাকটা তারা হাতে ঝুলিয়েই রাখে।
গয়ানাথ হুকুম দেয়, চিৎকার ধরেন, মিছিল শুরু করি দেন, আর য্যালায় আছে স্যালায় সব হাটের ভিতর যোগদান দিবে।
তিলক খুব জোরে শ্লোগান দেয়, উত্তরখণ্ড পার্টি। তার উত্তরে কেউ কোনো সাড়া দেয় না। গয়ানাথ চিৎকার করে লাইনাধা ঐ কটি মানুষের মধ্যে ঢুকে পড়ে, শালো, বামের নামে ত জিন্দাবাদ করিবার ধরিস, এ্যালায় মূক-উঁদরার (বোবার মত) নাখান চুপ করি আছিস। গয়ানাথের এই পুরো বাক্যটাই যেন শ্লোগানের প্রথমাংশ, এমন ভাবে এই লোকগুলি ক্ষীণ এক সমবেত স্বর তোলে–জিন্দাবাদ।
তিলক আবার চিৎকার করে, উত্তরখণ্ড পার্টি। কিন্তু যেন তারই জবাবে যে-ভিড়টা এতক্ষণ এই মিছিলের প্রস্তুতির পাশে জমা হয়ে উঠেছে তার ভেতর থেকে একজন দক্ষ উঁচু নিশ্চিত গলায় হেঁকে ওঠে, বামফ্রন্ট জিন্দাবাদ। সেই জিন্দাবাদ-এর সঙ্গে আরো দু-একটি গলা মিশে যায়।
গয়ানাথ তিলককে বলে, মিছিল হাটের ভিতর নিগান। হে-ই বাঘারু হেট, হেট– বামফ্রন্ট জিন্দাবাদ, চিৎকারে মিছিলটা তাড়াতাড়ি চলতে শুরু করতেই পেছনের সেই ভিড়টা থেকে নেতৃত্বের আত্মবিশ্বাসে কেউ আহ্বান দেয়, হে-ই সগায় বামফ্রন্টের মিছিল সাজাও, মিছিল সাজাও। উত্তরখণ্ড পার্টির মিছিল চলিবে না, চলিবে না। সেই আহ্বানের সঙ্গে সঙ্গে ঐ ভিড়টার অনেকে দৌড়ে সেই মিষ্টির দোকান আর মুদির দোকানের মাঝখানে, হাটের পাকা রাস্তাটার দিকে ছোটে।
গয়ানাথ মিছিলটা থেকে একটু দূরে মিছিলের পেছনে হাটে ঢোকে। মিছিলটাতে আরো কিছু লোক ঢুকিয়ে সে কোনো দোকানে বসবে। কিন্তু হাটের ভেতরে ঢোকার পর মিছিলটার গলা যেন শোনাই যায় না-এক বাঘারুর লম্বা ঝাণ্ডাটার জন্যে এটা যে মিছিল সেটা তাকিয়ে অনুমান করতে হয়। উত্তরখণ্ড পার্টি জিন্দাবাদ, তিস্তা ব্যারেজ বন্ধ করো, ব্যারেজ বিরোধী মিছিলে যোগ দিন–এ সমস্ত নির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত শ্লোগান মিছিলটা থেকে কেমন অর্থহীন হয়ে ঝরে যায়।
