চেয়ারখান মুছি দে।
সুহাসকে আবার সেই হাফশার্ট-পরা লোকটার দিকে তাকাতে হয়।
ঠিক আছে, বলে সুহাস চেয়ারটায় বসে পড়ে-চেয়ারটা তা হলে এই লোকটিই আনিয়ে রেখেছে–আর দুই হাঁটুর ওপর ম্যাপটা মেলে ধরে। তখন সুহাস টের পায়, সে বসে পড়া সত্ত্বেও ঐ রিলিফ মত লোকটি চেয়ারের মাথা, পেছন দিকটা, পায়াগুলো হাত দিয়ে দিয়ে মুছে যাচ্ছে। শুকনো কাঠের সঙ্গে তার শুকনো হাতের ঘর্ষণে খসখস আওয়াজ উঠছে।
তাই স্যার এই টেবিল শিকল এসকল স্যার আমার লোকজন নিয়ে ঠিক জায়গায় গোছ করি রাখি। দিবে। আর রোজ-রোজ আনি দিবে। আর এই খাতাগুলা আনার জন্য একটা মানষিক সকালে আপনার ক্যাম্পত পাঠাম।
সুহাস আর মুখ তুলে তাকায় না। সে একটা পেন্সিল দিয়ে তিস্তার পাড়টার যে-অংশটুকু আজকের ব্যাপার, তাকে চিহ্নিত করে।
স্যার, এই স্থানে আমাদের একোটা সুনাম-খ্যাতি আছে, কিম-অফিসার-নেতাগণকে আমরা সেবা করিয়া থাকি। স্যালায় আপোনাকে এই নিবেদন।
গয়ানাথ থামার পরে সুহাস বোঝে সে থেমেছে, সুহাস চোখ তোলে না।কিন্তু চোখ না তুলে বুঝতে পারে না লোকটি আছে না চলে গেছে।
একটু পরেই সুহাস বুঝতে পারে যে লোকটি যায় নি। সে একবার সোজা: তাকিয়ে দেখে নেয়–দূরের লোজন আর তার মধ্যে এই লোকটিই একমাত্র দাঁড়িয়ে। সুহাসের একবার ইচ্ছে হয়, লোকটিকে চলে যেতে বলে। কিন্তু বলতে গিয়েও থেমে যায়। সুহাস যেন একটু রেগে থাকতে চাইছে–এটা বুঝে সুহাসের নিজেরই ভাল লাগে না। লোকটি ত এখন পর্যন্ত আপত্তিকর কিছু বলে নি, সে মিছিমিছি বিরক্ত হচ্ছে কেন? সুহাস আবার ম্যাপের ওপর ঝোঁকে।
স্যার–লোকটির গলা। কিছুক্ষণ কেটে যায়। লোকটি আবার ডাকে, স্যার।
সুহাস ঘাড় না তুলে বলে, বলুন না, বলে যান, শুনতে পাচ্ছি।
হ্যাঁ স্যার, আমাদের উচিত নয় আপনাকে বাধা দেয়া।
সুহাস ঝোলানো ঘাড়টাই দোলায়। কিন্তু থামে না, দুলিয়েই যায়। লোকটি আর-কোনো কথা বলছে না দেখে সুহাস মাথাটা দুলিয়েই যায়। আর ম্যাপটার দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে সে ম্যাপটাকে এতটাই আত্মসাৎ করতে চায় যেন এর পর সে ম্যাপ না দেখে জমি চিনে নিতে পারে।
আপনার সুবিধার জন্যে স্যার, এইটুকু সুযোগ আমাদের দিবা নাগিবেই
একটু নীরবতার পর লোকটির গলা যেন অভিমানী হয়ে ওঠে, ই ত স্যার, আমাদের অঞ্চলের অপমান।
সুহাস মনে-মনে কৌতুক বোধ করে–হাকিম এমনই জিনিশ যার সঙ্গে মাতৃভাষায় কথা পর্যন্ত বলা চলে না। সুহাস চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে, নদীর পাড়ে অনাথবাবু শেকলের একদিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে, আর-একদিক নিশ্চয়ই তিস্তার পাড় ধরে বনের মধ্যে গেছে। বিনোদবাবু বোধহয় ঐ দিকেই।
সে চেয়ার থেকে ওঠে। ঐ লোকটি এখনো বসে বসে চেয়ারের পায়া মুছে যাচ্ছে। সুহাস নদীর পাড়ের দিকে যায়।
১.৩ গাছের ডগায় মৌজা ম্যাপ
অনাথকে ছাড়িয়ে নদীর আরো কাছে সুহাস তিস্তার পাড় ধরে সোজা উত্তরে তাকায়। এখন এই পাড়টা রাইট এ্যাঙ্গেলে উত্তরে গেছে। সুহাস যেখানে দাঁড়িয়ে সেই ফরেস্টটা মৌজা ম্যাপে জে-এল নাম্বার ৮৭ আর ৮৮র সিদাবাড়ি-গোচাবাড়ি বর্ডার লাইন থেকে উত্তরে, একটু পুবে সরে আসা। এখানেই এখন নদী। এর সরাসরি পশ্চিমে ছিল–এই সিদাবাড়ি-গোচাবাড়িরই একটা অংশ আর আপলাদের একটা ছোট ছিট। আর তার উত্তরে এই সার্কেলের সবচেয়ে বড় জে-এল ৮৪ নম্বর আপলাদ ফরেস্ট।
তার পশ্চিমে ৮৫ নম্বর গাজোলডোবা, ও তারও উত্তরে মৌজা হাঁসখালিরই ২১ নম্বর জে-এল। এই ২১ নম্বর জে-এল থেকে ৮৪-নম্বরের পশ্চিম সীমা, ৮৫ নম্বর গাজোলডোবা ও সে যেখানে দাঁড়িয়ে তারও বায়ের, পশ্চিমের, সিদাবাড়ি গোচাবাড়ি–সবটাই এখন তিস্তার ভেতরে। এর তলায় ৮৬ নম্বরে আপলাদের একটা ছিট ছিল, সেটুকুও ম্যাপ থেকে বোঝা যাচ্ছে–যদিও সেটা অন্য মৌজার। কিন্তু তারও নীচে এই ৮৪রই আরো একটা একটুখানি ছিট ছিল। তা হলে এখন যেটা ৮২ নম্বর উত্তর আর ৮৩ নম্বর দক্ষিণ হাঁসখালি তারও উত্তরে, আপলাদেরও উত্তরে ছিল আসল হাঁসখালি। আবার এখনকার এই সব জোতের নীচ পর্যন্ত ছিল আপলাদ। নইলে একই জেএল নম্বরের মাঝখানে এত জোত এসে যায় কেমন করে? মৌজা ম্যাপটা মাটির ওপরই মেলে ধরে তার ওপর উবু হয়ে বসে সুহাস বড় হাঁসখালির ২১ নম্বরে, ৮৫ নম্বরে, ৮৬ নম্বরে ৮৭ ও ৮৮ নম্বরের পশ্চিম অংশে একটা করে ঢেরা, মারে। ৮৭ ও ৮৮ নম্বরের পুবে একটা লম্বা দাগ দেয়। এর পর একটা রাস্তা আছে–সোজা আপলাদের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে। এই গ্রামগুলো যদি বাতিল হয় তা হলেই একটা নতুন আউটলাইন বেরিয়ে আসে। কিন্তু নদী ত আর জেএল নম্বর ধরেধরে ভাঙে নি। তাই ৮০ নম্বরের পশ্চিম সীমাটা তাকে সাব্যস্ত করতে হবে।
এক-একটা ঢেরায় এক-একটা গ্রামের হিশেব চুকিয়ে, সুহাস ম্যাপটা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই তিস্তার ভেতর থেকে এক হাওয়াপ্রপাত ঘটে যায় যেন, আর তার হাত থেকে অত বড় ও ভারী মৌজা ম্যাপটা একটা ছেঁড়া কাগজের মত উড়ে যায়। হে-এ-এ বলে একটা চিৎকার করে উঠে ম্যাপটার পেছনে সুহাস ছোটে। মাপটা তখন লাট খেয়ে মাটিতে পড়েছে। অনাথ শিকল ফেলে দিয়ে ম্যাপটা ধরতে ছোটে। কিন্তু সে ম্যাপটার ওপর পড়ার আগেই আবার ম্যাপটা উড়াল দেয়, এবার আর সোজা নয়, কোনাকুনি ভাবে ওপরে গাছের মাথার দিকে, প্লেনের আকাশে ওড়ার মত। তখন সুহাস দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু অনাথ হাত তুলে ধরতে চেষ্টা করছে। ম্যাপটা যেন কোনো ওস্তাদের লাটাইয়ের সুতোয় বাধা ঘুড়ি, এমন নিশ্চয়তায় আরো ওপরে উঠল ও একটা মাঝারি সাইজের ডালের খাজে সেঁদিয়ে ঝুলতে লাগল। এতক্ষণের অলস ভিড়টা যেন মুহূর্তে প্রাণ পেয়ে সবাই মিলে ঐ ম্যাপের পেছনে ছুটছে। সুহাসও ভেবেছিল, বাতাসের দমকাটা চলে গেলেই ম্যাপটা ঝুপ করে পড়বে। কিন্তু পড়ল না। সুতরাং আর-একটা দমকায় গাছ থেকে ওটাকে ফেলে দেবে এই আশাই অগত্যা করতে হয়।
