মোর গয়ানাথ কহিছে তাই ঘুরিবার ধরিছু। মোক ত আগতও ঝাণ্ডা দিচ্ছে গয়ানাথ।
আগতও ঝাণ্ডা দিছে? কোটত?
স্যালায় জল্পেশত—
তোমরালা জল্পেশত গেইছু হে? স্যালায় ত তোমরালা পুরাপরি উত্তরখণ্ড পার্টি হে।
নাই রো। মোর খণ্ডটণ্ড নাই, মোর পার্টি-টার্টি নাই।
নাই, ত ধরিলেন কেন ঝাণ্ডা জল্পেশত?
গয়ানাথ দিছে।
আরে, গয়ানাথ ত দিছে, ধরিছেন ত আপনি, স্যালায় ঝাণ্ডাখান ত আপনার।
না-হয়। মোর ঝাণ্ডা নাই।
ত ছাড়ি দে ঝাণ্ডার কাথা। ক কেনে, চ্যানং করি মানষি জুটাবার যায়। মিছিল তুলিবার নাগে। তিস্তা ব্যারেজ খুলিবার দিন মিছিল নিগিবার নাগে।
গয়ানাথক কহেন। মিছিল নিগিবার কহিলে গয়ানাথ নিগাবে।
ত গয়ানাথ তোমাক ছাড়ি আর কাহাকও কহে না?
না জানো।
গয়ানাথ কহিলে সব মানুষ মিছিল ধরিবে–হাটত?
ধরিবে।
গয়ানাথ কহিলে সব মানুষ মিছিল ধরিবেতিস্তা ব্যারেজের দিন?
ধরিবে।
এর বাদে কুন হাট বড় হাট?
ক্রান্তির হাট।
মুই কম গয়ানাথক ঐ হাটত থাকিবার?
কহেন।
গয়ানাথ ঐ তিস্তা ব্যারেজের দিন মিছিলত থাকিলে মানষিলা আসিবে?
আসিবা পারে।
ত কহিম গয়ানাথক। কিন্তু তোমরালা জয়েন দিবেন না উত্তরখণ্ড পার্টিত?
মোর জয়েন নাই।
আরে তোমরালাও ত একটা আলাদা মানষি। রাজবংশী মানষি।
মুই রাজবংশী না হও।
ধূৎ বোকা! এইঠে হামরালা যত মানষি আছি, এইঠেকার আদিবাসী আছি
মুই এইঠেকার না হয়।
ধুৎ বোকা। তুই এইঠেকার না হন, কি বিলাতের মানষি হবার ধরিছেন?
না হই, মুই বিলাতের না হয়।
বিলাতের না হন ত এইঠেকার হন ত? এইঠেকার রাজবংশী?
মুই রাজবংশী না হও।
ধুৎ বোকা, রাজবংশী না হবি ত তুই কি ভাটিয়া হবা ধইচছিস?
না হও। মুই ভাটিয়া না হও।
ধুৎ বোকা–একখান ত তোর হবা নাগিবেই, হয় রাজবংশী, না-হয় ভাটিয়ার ঘর।
না হও। মুই রাজবংশী না হও। মুই ভাটিয়া না হও।
হয়, হয়। তুই একো একো পার্টি? রাজবংশী না হন, ভাটিয়া না হন! আর ঘাড় করি। উত্তরখণ্ডের ঝাণ্ডাখান ধরি জল্পেশ যাবার ধরিছেন! ঝাণ্ডাখান ধরি ধরি হাট-হাট ঘূরিবার ধরিছেন। এইঠে ত সগায় জানে তোমরালাই উত্তরখণ্ড পার্টি!
না জানে। মোর কুনো পাটি নাই। মোর কুনো মানষি নাই।
হ-অ-য়। ঠিকেই কহছেন, তোর শুধু একখান ঝাণ্ডা আছে হে।
না হয়। মোর কুনো ঝাণ্ডা নাই।
হ-অ-য়! ঠিকেই কহছেন, তোর শুধু একখান ঝাণ্ডা আছে হে।
না হয়! মোর কুনো ঝাণ্ডা নাই।
হ-অ-য়! ঝাণ্ডাখানের তুই আছিস।
এ-সংলাপ এভাবে আরো কিছু নিশ্চয় হয়ে চলতে পারে। কিন্তু, এটুকুতেই ত তিলক আর বাঘারুর নানা হাটে ঘোরাফেরার ঘটনা বোঝা যাচ্ছে। সে-বোঝার চাইতেও বেশিবাঘারুকে গত দশ বার বছরে মাত্র এই তৃতীয়বার আত্মপরিচয় সংক্রান্ত সংলাপে বাধ্যত অংশ নিতে হল। দশবার বছর আগে এক এম-এল-একে নদী পার করাবার সূত্রে বাঘারু স্বেচ্ছাপ্রণোদিত এক দীর্ঘ-দীর্ঘ আত্মপরিচয় দিয়েছিল। তখন তার একটা ছোট দাবিও ছিল, এম-এল-এ যেন তার নামটা ছোট করে দেয়। কিন্তু এম এল-এ সে-বিষয়ে কিছু করতে পারে নি। আর বাঘারুর নামটা আরো-আরো বদলেছে। তিস্তার এক বন্যার সময় চার-চারটে গাছ নিয়ে বাঘারু যখন রংধামালির কাছে বাধে গিয়ে ওঠেন, তখন তাকে এক অফিসারের সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদে ঢুকতে হয়। সেখানে অফিসার শুধু তার নাম-ঠিকানা জানতে চেয়েছিল। কিন্তু বাঘারু সেটুকুও দিতে পারে না। আবার এখন উত্তরখণ্ড পার্টির সময় উত্তরখণ্ডের নেতাদের সঙ্গে তাকে এরকম একটা কথাবার্তায় ঢুকতে হয়। এবার বাঘারু যেন তার নিজের সম্পর্কে কিছু আরো বলতে পারে না। এখন সে শুধু বলতে পারে সে কী কী নয়, তার কী কী নেই। দশবার বছরে মাত্র তিন-তিনটি সংলাপ–তাও ক্রমসংক্ষিপ্ত! দশ বার বছরে মাত্র তিন-তিনটি সংলাপ-তাও ক্রমেই নেতিবাচক। বাঘারু কি তার জীবনে ক্রমেই নিজের কাছে নিজে অবান্তর হয়ে পড়ছে–ধারাবাহিকভাবে?
.
১৮৮. আবার ক্রান্তিহাট, আবার গয়ানাথ
ক্রান্তিহাটে গয়ানাথ নিজে হাজির ছিল। সে আসার আগেই ঝাণ্ডা কাঁধে বাঘারুকে হাটের নিমগাছতলায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। পরে, তিলকও এসে সেখানে দাঁড়ায়। হাট শুরু হয়ে যায় অনেকক্ষণ আগে–বাঘারু দাঁড়িয়েই থাকে, তিলকও। নিমগাছটা হাটের একদিকে–সেই হাট কমিটির ঘরের লাগোয়া মাঠ আর হাটের সীমান্তে–যেখানে হাড়িয়া বিক্রি হয়। বাঘারুর দিকে তাকিয়ে হাটের লোকজন হাটে চলে যায়। এমন-কি, তিলকও মুদিখানা দোকানের পাশে তার সাইকেলটা তালা আটকে রেখে বাঘারু থেকে অনেক দূরে মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। বাঘারুর সঙ্গে যেন এই হাটের, এই হাটের মানুষজনের কোনো সম্পর্ক নেই। সে নিমগাছের তলায় আর-একটা গাছের মতই দাঁড়িয়ে থাকে। তার ঝাণ্ডা নারকেল গাছের ডালের মত বাতাসে দুলতে থাকে।
গয়ানাথ ঐ মিষ্টির দোকানের সামনের রাস্তা দিয়ে হনহন করে এগিয়ে এসে বাঘারুকে বলে, মানষিলা কই, যেইলা মিছিল তুলিবে?
বাঘারু তার ভঙ্গি অপরিবর্তিত রেখে বলে, কায়ও না আসে।
কায়ও না আসে? শালো বলদের দল! তোর সেই উত্তরখণ্ডের চ্যাংড়াখান কোটৎ!
গয়ানাথকে দেখে তিলক ততক্ষণে এগিয়ে এসেছে। তাকে দেখে গয়ানাথ চিৎকার করে, এইঠে আসিছেন কি খাড়ি থাকিবার তানে? মিছিল তুলিবে কায়? মুই? আর আপনি লিডার হবার ধরিবেন?
তিলক বলে, আমি ত কাউকে চিনি না। কায়ও ত আসে না!
