গয়ানাথের বাড়ির এই মিটিঙে সুস্থির ছিল। শেষ পর্যন্ত তার কথামতই ঠিক হয় প্রথম কয়েক দিন তিলক রায়বর্মন গয়ানাথের বাড়িতে থেকে কয়েকটা হাটে মিছিল তুলবে, তারপর সুস্থির নিজেই এসে থাকবে, সঙ্গে আরো দু-একজন আসতে পারে–একেবারে উদ্বোধনের দিন বিক্ষোভ মিছিল তোলার পর সুস্থির ফিরে যাবে, তার আগে নয়।
তিস্তা ব্যারেজের বিক্ষোভ মিছিলে লোক প্রধানত গয়ানাথের এলাকা থেকেই জড়ো করতে হবে–এটা সুস্থির ও তার দলবল বুঝে গিয়েছিল।
তারপর থেকেই শুরু হল তিলক রায়বর্মনের নেতৃত্বে কাছাকাছি সব হাটে গয়ানাথের মানষিলার মিছিল তোলা।
আর গয়ানাথের মানষিলা মানেই ত সর্বপ্রথম বাঘারু। নেওড়াবস্তির হাটের দিন তিলক তার সাইকেল নিয়ে আর বাঘারু তার ঝাণ্ডা নিয়ে গয়ানাথের বাড়ি থেকে বেরয় বেলা একটা নাগাদ। গয়ানাথের নির্দেশ অনুযায়ী বাঘারু তিলককে এক-এক পাড়ার ভেতর দিয়ে-দিয়ে নিয়ে যায়। সে-সব পাড়ায়, টাড়িতে বাঘারু সরু বাঁশের, বা মোটা কঞ্চি বলাই ভাল, মাথায় তিনকোনা এক লম্বা নিশান ধরে দাঁড়িয়ে থাকে আর তিলক সাইকেলটা এক জায়গায় হেলান দিয়ে রেখে এক-এক ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডাকে। নতুন গলার এরকম ডাকাডাকিতে সবই বেরিয়ে আসে। তখন তিলক তাদের প্রায় নির্দেশের মত করেই বলে, যে, হাটে গিয়ে সবাই যেন বাঘারুর হাতে ধরা ঝাণ্ডাটার কাছে জড়ো হয়। তারপর, হাটমিছিল হবে।
তিলককে প্রায় কেউই চেনে না কিন্তু বাঘারুকে ত সবাই চেনে। সুতরাং গয়ানাথের নির্দেশ বুঝতে কারো কোনো অসুবিধে হয় না। বাচ্চারা ত চলবে না, চলবে না শুরুই করে দেয়। কিন্তু হাটে বাঘারুর ঝাণ্ডার কাছে কেউ জড়ো হয়ে থাকে না, তিলকও কাউকে চেনে না যে হাট ঘুরে ডেকে-ডেকে আনবে। তাই খানিকক্ষণ অপেক্ষার পর তিলককে তার সাইকেল নিয়ে বাঘারুর সঙ্গে হেঁটে-হেঁটেই হাটে ঘুরতে হয়।
বাঘারুর কাঁধে ঝাণ্ডা। সুতরাং তাকে আগে যেতে হয়। আর, তার পেছনে-পেছনে সাইকেল ঠেলতে-ঠেলতে তিলক। তিলক শ্লোগান দেয়–তিস্তা ব্যারেজ চালু করা, কিন্তু বাঘারু তার জবাবে কিছু বলে না। প্রথম হাটে দু-একবার বাঘারুকে বলা সত্ত্বেও বাঘারু বলতে না-পারায় তিলক একাই পুরো শ্লোগান দিতে থাকে–তিস্তা ব্যারেজ চালু করা চলবে না, চলবে না, তিস্তা ব্যারেজ উদ্বোধনের বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেন, যোগ দেন। এরকম ঝাণ্ডাসহ একজনের মিছিল বেরলেও হাটে লোক জুটে যায়। সে রকম লোক তিলক বাঘারুর যুগ্ম মিছিলেও জোটে। সন্ধ্যা হওয়ার মুখে বাঘারু ও তিলকের এই গোটা মিছিলটাই একা-একা গয়ানাথের বাড়িতে ফেরে। বেলা একটা-দেড়টায় বাঘারুর হাতে যে ঝাণ্ডাটা জ্বলজ্বল ও পতপত করে, সন্ধ্যার পর সেটা কলাপাতার মত নেতিয়ে যায়। কিন্তু আলে-আলে বহুদূর পর্যন্ত দেখা যায়–সেই ঝাণ্ডাটা আরো দূরে চলে যাচ্ছে। গোলাবাড়ির ঢাল বৈয়ে ওপরের বরমতলে ওরা উঠলে তিলকের সাইকেলের স্পোকগুলোও ছায়ার মত দেখায়, বাঘারুর পুরো শরীরটাকে আকাশে খোদাই করা মনে হয়।
এরকম প্রথম দু-চারটি হাট থেকে ফিরতে-ফিরতে তিলক ও বাঘারুর কিছু কথাবার্তা হয়। কোনো এক সন্ধ্যাতেই যে সামান্য এই কটি কথা হয়েছিল তা নয়। ঐ–চার সন্ধ্যা জুড়েই নানা সময়ে কথাগুলি হয়ে থাকবে। কিন্তু সেরকম টুকরো-টুকরো উপলক্ষের মধ্যে কথাগুলি ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ এখন আর এ বৃত্তান্তের নেই। তাই একসঙ্গেই সবটুকু দেয়া হল। তাতে এই কথোপকথনের মধ্যে থেকে কোনো নতুন অর্থ তৈরি হয়ে উঠবে না, আশা করা যায়। এই কথোপকথন বাদ দিলেও হত, কিন্তু তা হলে, এই দু-চার হাটের অভিজ্ঞতার পর গয়ানাথ ক্রান্তিহাটে কী করল বোঝা যেত না।
.
১৮৭. বাঘারুর তৃতীয় সংলাপ
তোমরালার মানষিলা আসিছেন না কেনে হে? তিলক জিজ্ঞাসা করে।
হামরালার কুনো মানষি নাই, বাঘারু জবাব দেয়।
এই জিজ্ঞাসা ও জাবাবের ভেতর কোনো নাটকীয় অবস্থান নেই। আলপথে-পথেই তাদের ফিরতে হয়। আলপথে একবার যে আগে যায় তাকে আগেই যেতে হয়। বাঘারুর হাতে ঝাণ্ডা আছে বলেই হয়ত বেশির ভাগ সময় বাঘারুকে আগেই থাকতে হয়। তাছাড়া, তিলক ত এই জায়গার নোক নয়, তাই কোন-কোন আল দিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি হবে সেটা বাঘারুই ভাল জানে। কথাবার্তা যখন হয় তখন সব সময় প্রশ্নোত্তরের ভঙ্গিতেই হয়, তাও নয়। একজনের কথার জবাবে আর-একজন হয়ত নীরবই থাকে। পরস্পর কথাবার্তা বলতে বলতে যে এরা প্রায় একটা আলোচনা করে ফেলে, তাও নয়। অনেক সময়ই কথাগুলো পরস্পর নিরপেক্ষ ও স্বাধীন।
এইঠেকার মানষিলা গয়ানাথবাবুর কথা না-শোনে?
হামরালার কুনো মানষি নাই।
গয়ানাথবাবুর ত মানষি আছে? এ্যানং বড় জোতদার!
আছে, গয়ানাথের মানষি আছে।
তোমরালা ত গয়ানাথের মানষি।
হয়। হামরালা গয়ানাথের মানষি।
তোমরালা একা-একা ঝাণ্ডাখান খাড়ি করি এ্যালায় টারিঠে বাহির হবা ধরছু, আর এ্যালায় হাট শেষ করি টারিত ফিরিবার ধই একা-একা। তোমরালার আর কুনো মানষি নাই?
মোর আর কুনো মানষি নাই। মোর একেলা মুই আছো।
তোমরালা কি উত্তরখণ্ডিত জয়েন দিছেন?
হামরালার কুনো খণ্ড নাই, কুনো জয়েন নাই।
না, না, কহিছু, তোমরালার জোতদারখান ত জয়েন দিবার ধইচছে।
না জানো।
না জানোত ঝাণ্ডাখান কান্ধত করি একেলা-একেলা হাট-হাট ঘুরিবার ধরিছেন কেনে?
