কিন্তু জল্পেশ্বর অভিযান, শপথগ্রহণ, তিস্তাবুড়ির পূজা, এসব কথা কাগজে ছাপার হরফে যেরকম দেখায় বা বক্তৃতায় মুখের কথায় যেরকম শোনায়, বাস্তবে সে-রকম দেখায় না বা শোনায় না। শ্রীদেবীর নাচটুকু ছিল বলে, তাতে এদিক থেকে এত লোক গিয়েছিল বলে, আর তাদের প্যান্ডেলে থাকার জায়গা দেয়া হয়েছিল বলে–এই মিছিলটা ময়নাগুড়ি থেকে জল্পেশ পর্যন্ত হেঁটে আসতে পারল। নইলে তাও হত না। তাহলে সুস্থিরের সাইকেল বা মোটর সাইকেল মিছিল পর্যন্ত হয়ত হত। কিন্তু সাইকেল বা মোটর সাইকেলে মিছিল করে এসে ত আর তিস্তাবুড়ির পূজা, জল্পেশ্বরের পূজা, শপথবাক্য পাঠ এসব করা যায় না। করা যাবে না কেন, যায়, কিন্তু সেটা যারা করল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর-দশজনের মধ্যে প্রচারিত হবে না। কিন্তু এখানে এই জল্পেশ্বর অভিযান আর তিস্তাবুড়ির পূজা আর শপথবাক্য পাঠ যাই হোক না কেন, খবরের কাগজের রিপোর্টারদের কাছে এগুলো বললে এর চেহারাই অন্যরকম হয়ে যাবে।
উত্তরখণ্ডের নেতারা এখানে জল্পেশ্বর মন্দিরের নিভৃতিতে খবরের কাগজের জন্যে একটি খবর তৈরি করছিলেন মাত্র।
সব যখন শেষ হয়ে যায় তখন বাঘারু বোঝে না যে এখন এই বঁশ ও বাঁশের মাথায় ঝাণ্ডা নিয়ে কী করে। নিজের ভেতর সে একটা যুক্তি পায়–মিছিল না থাকিলে ঝাণ্ডাখান কেনে থাকিবে? মিছিল নাই ত ঝাণ্ডা নাই। সে জল্পেশ মন্দিরের একটা গাছের গায়ে ঐ বাশটা হেলান দিয়ে রেখে দেয়।
.
১৮৬. উত্তরখণ্ডের হাটমিছিল
বাঘারু যদিও জল্পেশ মন্দিরের গায়ে উত্তরখণ্ডের লম্বা ঝাণ্ডাটা রেখে দিয়েছিল কিন্তু পরের এক মাস ঐ ঝাণ্ডা তাকে ছাড়ে না।
তিস্তা ব্যারেজ উদ্বোধন উপলক্ষে বিক্ষোভ দেখানোর জন্যে উত্তরখণ্ড দলের মিছিল সাজামোর সব দায়দায়িত্ব যেন গয়ানাথ আর আসিন্দিরের ওপরই এসে পড়ে। অথবা, তারা নিজেরাই সে দায় মেনে নেয়। অন্যদের কাছে তিস্তা ব্যারেজ ত খবর, বিক্ষোভ দেখাতে এসেও নদীর ভেতরে অত বড় কাণ্ডকারখানার দিকে হা করে তাকিয়ে না-থেকে পারবে না। কিন্তু গয়ানাথ-আসিন্দিরের কাছে ত তিস্তা ব্যারেজ সেরকম ব্যাপার না–সেই বছর দশ-বারর আগের সেটলমেন্ট থেকে শুরু করে এই বছর দশ বারর নানা মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত এই ব্যারেজটা ত তাদের চোখের সামনেই ঘটে গেছে আর যত ঘটে গেছে ততই যেন সেটা তাদের উল্টো দিকে ঠেলে দিয়েছে। সেই উল্টো ঠেলায় এতদিন পর্যন্ত মামলা-মোকদ্দমাই চলছিল, এখন এই উত্তরখণ্ডের সুযোগে আর তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধনের উপলক্ষে তারা যেন হাতের কাছে নতুন একটা উপায়ই পেয়ে যায় তিস্তা ব্যারেজকে ঠেকানোর জন্যে। তিস্তা ব্যারেজ যে ঠেকানো যাবে না, সেটা গয়ানাথ-আসিন্দির তাদের নিজেদের বৈষয়িক বুদ্ধিতেই বুঝে ফেলে। তিস্তা ব্যারেজ যে ঠেকানো গেল না, এটা ত তারা নিজেদের চোখেই দেখতে পায়। তিস্তা ব্যারেজ ঠেকিয়ে যে মামলাগুলি জেতা যায় না–সেটা বুঝতে ত আর বেশি বুদ্ধির দরকার হয় না। তবু তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধন নিয়ে গয়ানাথ আর আসিন্দির যে এতটাই মেতে ওঠে তার একটা কারণ হয়ত এই যে উত্তরখণ্ড সম্মিলনে এই প্রথম তারা, বিশেষত গয়ানাথ, একটা স্বাদ পেল যে অনেক মানুষকে জড়ো করতে পারলে একটা কাজ আদায় করে নেয়া যায়।
এতদিন এই মানুষকে একসঙ্গে মেলানোর ব্যাপারটাকে গয়ানাথ সন্দেহ করেই এসেছে। এমন-কি, কংগ্রেস ছাড়া ভোট দেয়ার কেউ না-থাকলেও গয়ানাথ এই মানুষজনকে নিয়ে হৈ-হৈ করার ব্যাপারে কংগ্রেসকেও বিশ্বাস করে না, অন্য পাটিদের ত করেই না। কিন্তু এখন, এই মানুষগুলোকে একসঙ্গে করে আন্দোলনের ব্যাপারটা সে বুঝে ফেলে নতুন ধরনের পদ্মা, আই আর এইসব বিছন দিয়ে ধান চাষ করার নিয়মে। গয়ানাথ ত আর সরকারের হাতে তামাক খেতে যায় নি। সে যখন চোখের সামনে দেখেছে যে এই সব হাইইল চাষে সময় কম লাগে, ফলন বেশি হয়, তখন সে তার জমিতে এই বিছানে; চাষ লাগিয়েছে। সে যখন বুঝেছে মানুষ ছাড়া তার উপায় নেই তখনই উত্তরখণ্ডে যোগ দিয়েছে আর তিস্তা ব্যারেজ বন্ধ করো, বন্ধ করো, শুরু করেছে।
কিন্তু শুরু করলেও এই সব মিছিল-মিটিঙের নিয়মকানুন ত আর গয়ানাথের জানা নেই। উত্তরখণ্ডের চ্যাংড়া নেতারা তার এই বাড়িতে বসে মিটিঙ করে তাকে বলে গেছে, অন্তত কাছাকাছি প্রত্যেকটা হাটে হাটের দিন যেন মিছিল ভোলা হয়। তার একটা লিস্টিও করা হয়। আজকাল যেখানে-সেখানে হাট, বসে যাচ্ছে। কোন হাটে মিছিল তোলা যাবে আর কোন হাটে যাবে না তা ঠিক করতেই সময় যায়। গোচিমারির হাটটা পুরনো আবার কুমারপাড়ার হাটটা নতুন হলেও বড়। শেষ পর্যন্ত দেখা যায় সবসুদ্ধ প্রায় বিশটা হাটে মিছিল তুলতে হবে।
মিছিল ত তুলিবেন, নেকচার করিবেন কায়? গয়ানাথের এমন প্রশ্নের জবাবে সেই চ্যাংড়া নেতারা কথাবার্তা বলে ঠিক করে যে অন্তত সাতটা হাটে তারা কেউ এসে বক্তব্য রাখিবেন। আখিবেন ত আখিবেন আর তেরডা হাটত কি বলদ দিয়া হাম্বা ডাকাম? গয়ানাথের এমন চড়া প্রশ্নে আবার এক দফা আলাপ-আলোচনার পর ঠিক হয় যে এই এলাকার দু-জনকে জোগাড় করা হবে। কিন্তু তাতেও গয়ানাথের প্রশ্ন ছিল-ঐ সব কাথা তিস্তাপাড়ত্ ফেলান! একখান মাস্টার মানষি দ্যাও, সাইকেলআলা। স্যালায় এই দিন গিলা হাটত মিছিল তুলিবেন, নেকচার করিবেন আর স্যালায় ঐ মিটিঙের দিন মিছিল নিগাবেন। হামরালা তোমা মানষি দিবা পারি, সেই মানষিগিলার মিছিল বানিবার না পারি। মোর মানষি নিয়া মিছিল, বানিবার নাগিবে তোমরালাক।
