কিন্তু সুস্থির সমস্ত ব্যবস্থা করে রেখেছিল। মিছিলটা সোজা জল্পেশের মন্দিরের দিকেই হাঁটে, তার জন্যে সুস্থির বাঘারুকে প্রায় হাত ধরে পথ দেখায়। বাঘারু এর আগেও জল্পেশ্বর মন্দিরে হয়ত এসেছে গয়ানাথের দরকারে কিন্তু সে যে শিবলিঙ্গ পর্যন্ত যেতে পারে এটা তার ধারণাই ছিল না। অথচ তার বাহু ধরে টানতে-টানতে সুস্থির একেবারে মন্দিরের সিঁড়ি পর্যন্ত নিয়ে যায়। মন্দিরের সিঁড়ির গোড়ায় যখন বাঘারু প্রায় পৌঁছে গেছে, তখন তার মনে হতে শুরু করেছে শেষ পর্যন্ত সুস্থির কি তাকে সিঁড়িগুলো দিয়ে ওপরেও তুলবে নাকি? যদি তোলে তা হলে ঝাণ্ডাটা কী করবে, একথাটা যেমন সে ভাবে, তেমনিভাবে, সে উঠবে না। কিন্তু ঐ সিঁড়ির গোড়াতে এসেই সুস্থির তাকে ছেড়ে দেয়, সঙ্গে-সঙ্গে জয় বাবা জল্পেশ্বর আওয়াজ ওঠে। বাঘারু দুই হাতে বাশটা ধরে সেই বাঁশের গোগাড়াতেই নত হয়ে ভক্তিভরে কপাল ঠেকায়। বাঘারুকে হামেশা এমন কপাল ঠেকাতে হয় না বলে সে বোঝেও না কতক্ষণ কপাল ঠেকিয়ে রাখবে। বুঝলেও যে খুব সুবিধে হত তা নয়, কারণ, তার সময়ের বোধ অত সঠিক নয়। কিন্তু এতটা পথ এত বড় মিছিলের আগে-আগে ঝাণ্ডা বয়ে আনার প্রতিক্রিয়াতেই হয়ত তার মনে হতে শুরু করে যে তার বোধহয় একটু বেশি সময়ই প্রণাম করা উচিত। একে বাবা জল্পেশ্বর, তাতে মিছিল, তাতে মিছিলের নিশান। তা ছাড়া জল্পেশ্বর মন্দিরে এমন একটা মাথা নোয়ানোর সুযোগ ত সারা জীবনে তার আর নাও আসতে পারে। বাঘারু যে মাথা নিচু করে তার গত ও আগামী জীবনের পরিপ্রেক্ষিত ভেবে ফেলে তা নয়–সে বেশ অনেকক্ষণ ঝাণ্ডার বাশটা দুই শক্ত হাতে ধরে বাঁশের গোড়ায় মাথাটা নুইয়ে রাখে। যখন সে মাথাটা তোলে তখন পাশাপাশি কাউকে দেখতে পায় না, পেছনেও কাউকে দেখতে পায় না। এতক্ষণ চোখ বুজে থাকায় চোখটা আঠা-আঠা লাগে। সে একটা হাত আলগা করো চোখটা একটু কচলে নেয়। কিন্তু তারপরও পাশে বা পেছনে কাউকে পায় না।
বাঘায়ু এবার তার মিছিলের ঐ অত লম্বা বাঁশের মাথায় নিশান নিয়ে একা-একা, যেন মিছিলটা খোঁজে। পেছনে তোক নেই অথচ নিশানটা এমন পতপত করে উড়ছে এটা খুব বেমানান ঠেকে। বাঘারুর কাছে। এই বাশ আর ঝাঙাটা থাকায় সেও একা-একা হাঁটার মত করে হাঁটতে পারছে না। মিছিলের বাশ আর ঝাণ্ডাখান মোর কাঁধত রাখি কোটত গেইল হে গয়ানাথের মিছিল? মন্দিরের প্রধান এলাকা থেকে বাঘারু বাইরে বেরয়।
বেরতেই দেখে মিছিল বলে আর চেনার উপায় নেই, পুকুরের পাড়ে এমনই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছে সব। বাবারু ত ঐ মিছিলের কারোই মুখ দেখে নি। সে শুধু মিছিলটাকেই দেখেছে। মিছিলে যে-মুখগুলি ছিল সেগুলিকে সে মিছিলের বাইরে চিনবে কী করে? কিন্তু তবু যে বাঘারু আন্দাজ করতে পারে যে পুকুরের পাড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে থাকা এই মানুষগুলি মিছিলেরই লোক তার কারণ মন্দিরের মাঠে মিছিল ছাড়া আর-কোনো লোক ছিল না। . বাঘাক ঐ বাশটা ধরে কোনদিকে যাবে বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে থাকে, বাশটা ধরেই। সেখানে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই সে দেখে ও শোনে একটু দূরে একটা জায়গায় গয়ানাথ, আসিন্দির, আরো সগায় দেউনিয়ার ঘর খাড়ি আছে, আর একদল মেয়ে, বেটিছছায়ার ঘর ঘুরি-ঘুরি গান গাবার ধরিছে। একটু দাঁড়িয়ে শুনতেই বাঘারু বোঝে, তিস্তাবুড়ির পুজো হচ্ছে। ওখানে নিশ্চয়ই পাটকাঠি দিয়ে তিস্তাবুড়িও একটা বানানো হয়েছে। গানগুলো খুব মন দিয়ে যে শোনে বাঘারু তা নয়, কিন্তু জন্ম থেকে শুনতে-শুনতে এ গান এতই জানা যে শুনতে না-চাইলেও শোনা হয়ে যায়।
সঙ্গ হতে নামি তিস্তাবুড়ি
মনচে দিয়া পাওঁ।
মনচ হতে নামি তিস্তাবুড়ি
চ্যাতন করি গাও
কাঁচা দুধ আলোয়া ক্যালো
ভইক্ষণ করো।
দেখতে-দেখতে তিস্তাবুড়ির পুজো শেষ হয়ে যায়। এসব পুজো যেমন চলতেই থাকে, চলতেই থাকে, তেমন কিছুই হয় না। পঞ্চানন মল্লিক উঠে বলেন, তিস্তাবুড়ি আমাদের দেবতা হন। সেই তিস্তাবুড়িকে বান্ধা আমরা সহ্য করিব না। আর এক মাস পরে তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধনের দিন আমরা প্রতিবাদের মিছিল নিয়া ঐ তিস্তা ব্যারেজের কাছে যাইব Fআপনারা সব জায়গা হইতে সেদিন মিছিল লইয়া তিস্তা ব্যারেজে যাইবেন। তিস্তা ব্যারেজে প্রতিবাদ করার জন্যে আপনারা আজি হইতে এক মাস নিজের নিজের টাড়িতে, হাটে, গায়ে, গঞ্জে প্রচার করিবেন ও সেদিন সব জায়গা হইতে মিছিল লইয়া যাইবেন। এখন শপথপত্র পাঠ হইবে। আমি পড়িব, আপনারা সঙ্গে সঙ্গে পড়িবেন। জয় বাবা জল্পেশ্বর। জয় তিস্তাবুড়ির জয়।
এখানে মিটিঙের মত সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়ে নেই। যে যার মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মাইকও নেই। ফলে কী বলা হচ্ছে, কী পড়া হচ্ছে সেটা কেউ একটা খুব খেয়ালও করে না। যেখানে তিস্তাবুড়ির পুজো হচ্ছিল সেখানে নেতারা যে কয়েকজন ছিল, গয়ানাথও ছিল, তারা একসঙ্গে কিছু পড়ে বা বলে। তবে যখনই একটু উঁচু গলায় জয় বাবা জল্পেশ্বর আর জয় তিস্তাবুড়ির জয় ধ্বনি উঠছিল তখন যে যেখানেই থাকুক সাড়া দিচ্ছিল। সে-সাড়া খুব জোরে না উঠলেও, উঠছিল।
উত্তরখণ্ড সম্মিলনের সবাই যে-নাটকীয় পরম্পরায় এই কর্মসূচিটি ভেবেছিল, সেটি ঘটে উঠল না। পরপর ক-দিন সম্মিলন, তাতে নানারকম আলোচনা। পর-পর কদিন অনুষ্ঠান, তাতে নানারকম প্রোগ্রাম। শেষের দিন শ্রীদেবীর নাচে একটা চূড়ান্ত নাটক। তার পরদিন জল্পেশ্বর অভিযানে উত্তরখণ্ডের আরো চূড়ান্ত নাটক।
