বাঘারু ত কোনদিন মিছিলে চলে নি। কিন্তু তাকে ডেকে এনে তার গিরি জোতদার এই বাশটা তার হাতে ধরিয়ে দিতেই সে মিছিলের লোক হয়ে যায়। এখন দুপাশে এই নাড়া খেতের মাঝখান দিয়ে পড়ে থাকা এই রাস্তাটায় বাঘারু মিছিলের পরিচালক। পরিচালনার জন্যে তার কোনো বিশেষ ভূমিকা নেই–যদি না এই ঝাণ্ডা ধরে রাখাঁটি বিশেষ ভূমিকা হয়। কিন্তু এই মিছিলের পরিচালক হওয়ার জন্যে তার কোনো বিশেষ ভূমিকার তত প্রয়োজনও ছিল না–প্রয়োজন ছিল, যারা তার পেছন-পেছন আসছে তাদের বিশেষ বিশেষ ভূমিকা। বাঘারুর ঠিক পেছন-পেছন যারা আসছে তারা ঠিক করেছে বলেই বাঘারু তাদের সামনে হাঁটছে, বাঘারু এই মিছিলের পরিচালকই হয়ে উঠেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে, একজনও যদি ইচ্ছে করে তাহলে যে-কোনো মুহূর্তে সে বা তারা বাঘারুর আগে এসে দাঁড়াতে পারে। সেই এগিয়ে দাঁড়ানোর জন্যে তাদের এক পাও নড়তে হবে না। বাঘারুকে পেছনে চলে যেতে বললেই তারা সামনে পড়ে যাবে।
কিন্তু তা ত এখন আর বলা যায় না। এখন এই মিছিল যে-অর্থে নিজেকে অর্থবান করে তুলতে চায় তার সঙ্গে বাঘারুর এই সবার আগে থাকাটা মিশে গেছে। সেই মিশ্রণটা এই মিছিলের পক্ষে খুব দরকারি। সেই মিশ্রণটাকে এখন আর নষ্ট করা যায় না। তাই, বাঘারু না-জেনেও এই মিছিলের প্রতীক হয়ে ওঠে, প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। জল্পেশ পর্যন্ত দূরত্বটুকু সেই প্রতীক ও প্রতিনিধিকে রক্ষা করতে হয়।
বাঘারুর হাঁটার মধ্যে কোনো নতুনত্ব ছিল না। তাকে যে এরকম মিছিলে জীবনে কখনো হাঁটতে হয় নি; মিছিলের একেবারে মাথায় হাঁটা ত দূরের কথা, তা তার হাঁটার স্বাচ্ছন্দ্য থেকে বোঝা যায় না। একটু অসুবিধে তার হয় না, তা নয়। পিচ রাস্তার ওপর দিয়ে হাঁটা ত তার অভ্যেস নেই, ফলে পায়ের তলায় লাগছিল। মাইল-মাইল বিস্তার যে এক-একদিনে পায়ে হাঁটে তার পায়ের তলায় ঐ কাকর, ছোটখাট পাথর, ফুটে যাচ্ছিল। কিন্তু বাঘারুকে বাঁচিয়ে দেয় ঐ নিশানের বাশটাই। শুধু তার নিজের শরীরটার ভার বইতে হত যদি বাঘারুকে এখানে এই আলের মত ফাঁকা পিচ রাস্তায়, তা হলে অনেক বেশি পাথর ফুটত তার পায়ে। একে অনভ্যস্ত বাধানো রাস্তা, তায় অনভ্যস্ত ভারহীনতা। বাঁশের ভারটা থাকায় ও এত লম্বা বাশটাকে সোজা রাখতে বলপ্রয়োগ করতে হয় বলে, বাঘারু কিছুক্ষণের মধ্যেই এই পথটাকে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে দলতে পারে, এই নিশানও অভ্যস্ত ভঙ্গিতে ওড়াতে পারে। তার মানে, এমন মিছিলের নেতৃত্ব দেয়ার অভূতপূর্ব ব্যাপারটাকেও বাঘারু তার অভ্যাসের মধ্যে নিয়ে নিতে পারে। তার পেছনে যে তারই জোতদার, আর অনেক জোতদারের সঙ্গে তাকে অনুসরণ করে আসছে–এটা তার মগজেই ঢোকে না।
বাঘারুকে নেতা সাজিয়ে যে-নেতারা তাকে অনুসরণের ভঙ্গিতে হাটছিল তারাও কেউ হাঁটায় কম যায় না। তাদের প্রায় প্রত্যেককেই মাইল-মাইল হাঁটতে হয় রোজ। তাদেরও বরং অসুবিধে এই পিচের রাস্তা বলেই। তাদের সবারই পায়ে এখন জুতোক্যামবিসের, রবারের, চায়নিজ। একটু কমবয়েসিদের পায়ে স্যান্ডেলও আছে। তাই কাকর লাগে না। কিন্তু তারা মাঠ দিয়ে, আল দিয়ে মাইল-মাইল হাটে যখন, তখন মাটিতে পা ফেললে বোঝা যায় মাটিতে পা ফেলছে। মাটিটা একটু দেবে যায়, বা বালিটা একটু সরে যায়, বা ঘাসগুলো নুয়ে পড়ে। কিন্তু এই পিচের রাস্তায় পা ফেললে পা-টা সেরকম কোনো সাড়া পায় না। নিজের পায়ের আন্দাজে বোঝা যায় না–তারা হাঁটছে। ……
তবু ত হাটছেই। হাঁটছে বাঘারুর পেছনে-পেছনে, বা বাঘারুবাহিত নিশানের নির্দেশ অনুসারে। বাঘারুর নিশানটা যে কত উঁচুতে উঠে আকাশে পতপত করে সেটা এই নেতারা খুব ভাল দেখতে পায় ও দেখে। তাতে তাদের একটা বেশ গর্বও হয়। রাজবংশী সমাজের ভেতরে কয়েক শ বছর ধরে জমা হয়ে আছে বর্ণহিন্দু সমাজের সঙ্গে তুলনা থেকে আসা এক হীনম্মন্যতা। এখন এই বাঘারুর হাতে ধরা নিশানাটার পেছনে সেই তরাইয়ের সম্পৎ রায় থেকে পুণ্ডিবাড়ির কালিপ্রসন্নর বড় ছেলে পর্যন্ত যে এমন ফাঁকা মাঠের ভেতর দিয়ে এমন একসঙ্গে হেঁটে যাচ্ছে তাতেই যেন তাদের অভীষ্ট অনেকটা সিদ্ধ হয়ে যায়। অন্তত এখানে ত তাদের রাজবংশী পরিচয় ছাড়া আর কোনো পরিচয় নেই। এই পরিচয়টুকু নিয়ে ত তারা গত কয়েকদিন ধরে সম্মিলন করে আসতে পারল, কাল রাত্রিতে ঐ রকম এক শ্রীদেবীকে এনে এমন অনুষ্ঠান করে ফেলতে পারল ও এখন এতটা রাস্তায় মিছিল করে জমেশে যেতে পারছে।
.
১৮৫. মিছিলহারা ঝাণ্ডা নিয়ে তিস্তাবুড়ির পূজা দেখতে-দেখতে বিব্রত বাঘারু
কিন্তু জল্পেশে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ও তিস্তাবুড়ির পুজো তেমন জমল না।
মিছিলে বেশির ভাগই ছিল এদিককার লোক। যাদের গা বা টাড়ি রাস্তায় পড়েছে তারা মিছিল থেকে সরে গেছে। গা টাড়িপিছু হয়ত দু-একজন করে থেকে গেছে। জল্পেশ পার হয়ে যে-সব গা বা টাড়িতে যেতে হয় সে-সবের লোকজন অবিশ্যি জল্পেশ মন্দিরে বসে, চলে যায় না। সুস্থিরের মোটর সাইকেলের দলটারও অনেকে মোটর সাইকেল চালানোর আনন্দে জল্পেশ ছাড়িয়ে আরো দূরে চলে গেছে। তাদের কেউ-কেউ ফিরে আসে বটে কিন্তু তাদের সঙ্গে ত এই মিছিল বা অনুষ্ঠানের কোনো সম্পর্কই তৈরি হয় না। এক সাইকেলওয়ালারা সবাই এতটা এসে হাঁফিয়ে পড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিশ্রাম নেয়। যখন মূল মিছিলটা বাঘারু ও নেতৃবৃন্দসহ জল্পেশ পৌঁছয় তখন মনে হয় এখানে এসে পড়াটাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল, এর পর আর-কোনো অনুষ্ঠান নেই।
