কিন্তু ময়নাগুড়ির বাইরে জল্পেশের দিকের এখনকার পাকা রাস্তায় মিছিলটাকে অতটা টুকরো-টুকরো দেখায়ও না যেন। রাস্তার দুপাশে খেতবাড়ি, মাঠ, চাষের কাজ একটু-আধটু শুরু হয়েছে, কিন্তু বেশির ভাগ জমিই ফাঁকা। রাস্তাটা একেবেঁকে যেভাবে গেছে তাতে বহুদূর পর্যন্ত ফাঁকা রাস্তাটা একসঙ্গে দেখা যায়। যদি বা কোথাও কোনো টাড়ির বাড়িঘরে বা গাছপালায় রাস্তাটা আড়ালে পড়ে তা হলেও, সেটুকু বাদ দিয়ে তার পরের অংশটা দেখা যায়। এই এত দীর্ঘ, প্রায় পুরো রাস্তাটা একবারে দেখা যায় এই মিছিলের গোটাটাসহই। এতবড় রাস্তাটা একসঙ্গে যে দেখা যাচ্ছে তাতেই মিছিলের টুকরোগুলো জোড়া লেগে যায় কারণ রাস্তায় আর-কোনো গাড়ি নেই, আর-কোনো লোকও নেই। এতগুলো মোটর সাইকেলের আওয়াজে কোথাও-কোথাও কিছু-কিছু লোক বেরিয়ে আসে কিন্তু তারা রাস্তায় ওঠে না। নানা পাড়ার কুকুরগুলো মোটরসাইকেলের আওয়াজে সেই আওয়াজ ছাপিয়ে চিৎকার করতে করতে ছোটে তাদের স্বনির্ধারিত সীমানা পর্যন্ত। কিন্তু তারপর নতুন এলাকার কুকুর চেঁচাতে শুরু করে। পুরনো এলাকার কুকুর তখন ফিরে আসতে-আসতে সাইকেলওয়ালাদের দিকেই ঘাড় উঁচু করে চেঁচায়। কিন্তু সাইকেলওয়ালারা এতটা রাস্তা জুড়ে এতটাই ছড়ানো যে কুকুরগুলো ঘাড় নিচু করে ফেলে দাঁড়িয়ে পড়ে, মূল মিছিলটা পৌঁছুবার আগেই পাড়ায় ফিরে যায়।
মূল মিছিলটা কিন্তু ভাঙে না। ঠিক যেভাবে ময়নাগুড়ি থেকে বেরিয়ে জল্পেশের রাস্তায় উঠেছে, সেভাবেই জল্পেশের রাস্তা ধরে এগিয়ে যায়। মিছিলের হাঁটার যেন একটাই ছন্দ তৈরি হয়ে যায়। সে-ছন্দটা কেউ ভাঙে না। এরকম ছন্দ অবিশ্যি দূরের রাস্তার মানুষদের ভেতর তৈরি হয়ে যায় রাস্তার নিয়মে বা হাঁটার নিয়মে। হাট বা মেলায় যাওয়ার সময় বা হাট বা মেলা থেকে ফেরার সময় বড় আলপথে মানুষের চলার এই ছন্দ দেখা যায় প্রত্যেকেই নিজের মত করে হাঁটছে কিন্তু মনে হয় সবই মিলে হাঁটছে। ময়নাগুড়ি থেকে জল্পেশের এই রাস্তাটাও প্রায় বড় একটা আলের মতই। এই রাস্তাটা বাধানো-আলের সঙ্গে এইটুকু তফাত। কিন্তু আলের ওপর দিয়ে যেমন গাড়িঘোড় গিয়ে মানুষের চলমান সারিকে ভাঙতে পারে না, এই রাস্তাতেও কোনো গাড়ি ত আর মিছিলের ভেতর দিয়ে যায় না। অনেক মানুষ অনেক দূরের পথ একসঙ্গে বাধাহীন পার হতে পারলে এরকম মিছিলেরই মত দেখায়।
এই রাস্তাটাতে মিছিলটা কীরকম মানিয়েও যায়।
পুরো রাস্তাটা না-হলেও তার অনেকখানিই যে দেখা যায় তাতেই এই এতগুলো মানুষের একসঙ্গে হেঁটে আসার যেন একটা মানে আসে। এরা কতটা দূরত্ব হবে তা সকলে দেখতে পায়। যে-বেটিছোঁয়া-দুজন ফেস্টুন ধরেছিল তারা ফেস্টুনটা টান-টান রাখতে পারে না। কিছুক্ষণ পরই তাদের হাত পরস্পরের দিকে নেতিয়ে যায়। কেউ কিছু না বলায় হাত দুটো আরো নেতিয়ে পড়ে। ফেস্টুনের কাপড়টা পেছনের দুই সারির মাঝখানে প্রায় গড়িয়েই পড়ে কিন্তু বাতাসের জন্যে পুরো গড়িয়ে যায় না। ফেস্টুনটা ওভাবেই চলে। তাতেও একটা দৃশ্য তৈরি হয়। ফেস্টুনটা যদি ঝাণ্ডার মত একজনের হাতে থাকত তাহলে এতটা বাতাসে সেটা সেই একজনের হাত থেকে পুরো মিছিলের মাথার হাতখানেক উঁচুতে স্রোতের মত উড়ত।
বাঘারুর হাতেই ঝাণ্ডাটা শুরুতে যেমন, শেষেও তেমন। ঐ লম্বা বাঁশের মাথায় তেকোনা ঝাণ্ডা আর বাঘারু বাঁশের গোড়াটা ধরে আছে দুই হাতে, কাঁধের ঠেকনো দিয়ে। যেরকম বাতাস, এমন খোলা মাঠে এমনই বাতাস ওঠে অবিশ্যি, তাতে বাঘারুর চাইতে কম জোরালো কেউ ঝাণ্ডাটা এমনি সোজা রেখে ময়নাগুড়ি থেকে জল্পেশ নিয়ে আসতে পারত না। এই মিছিলটার কাজ ত হেঁটে-হেঁটে জল্পেশ পৌঁছানো। এক বাঘারুরই কাজ এই বাঁশটাকে এত বাতাসের মুখে খাড়া রাখা। ফলে মিছিলের মাথায় তার নেংটিপরা শরীরটা এমনই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে যে সেই সূত্রে বাকি মিছিলটা অর্থ পায়। বাঘারুর শরীরের এই অর্থটা বুঝে ওঠা, অন্তত দেখে ওঠাও, সুস্থিরের হয় না, কারণ, সুস্থির মোটর সাইকেলে আগে জল্পেশে চলে গেছে–শপথ গ্রহণ ও তিস্তাবুড়ির পূজা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাদির জন্যে। মিছিলটা বাঘারুর শরীর থেকেই বেরচ্ছিল। বাঘারুর পেছনে আর ফেস্টুনের সামনে ছিলেন পঞ্চানন মল্লিক, বীরেন বসুনিয়া, গয়ানাথ জোতদার, দেবমোহনবাবু, নবীন, তিলক, ধৈৰ্যমোহনবাবু, সম্পৎ রায়। এরা ছাড়াও আরো জনা ছয়-সাত। এদের সঙ্গে মিছিলের বাকি অংশের তফাতটা পোশাকেই ধরা পড়ছিল। জামা-পরা বা জুতা-পরা আরো অনেক ছিল বটে কিন্তু যাদের জামা আছে তাদের অনেকেরই ধুতি নেই, যাদের ধুতি আছে তাদের অনেকেরই জামা নেই। ময়নাগুড়ি ছাড়িয়ে এই রাস্তায় পড়তেই মিছিলটার পোশাক অনুযায়ী এই দুই ভাগ ধরা পড়ে যায়।
বাঘারুটা মিছিলের মাথায় থাকে বলে ও তার পেছনে-পেছনে এমন-কি এই জোতদার-দেউনিয়া। লোকজনও যাচ্ছে বলে মিছিলটাকে যেন রীতিনীতি মেনে চলা একটা পুজোটুজোর মতই ঠেকে। নইলে বাঘারু অতটা আগে থাকে কী করে? বাঁশের ওজনটা আন্দাজ করলে এর একটা সহজ জবাব পাওয়া যায় বটে, কিন্তু ঐ অত জন জোতদার আর দেউনিয়া যেরকম পায়ে-পায়ে বাঘারুর নেতৃত্ব মেনে নেয় তাতে ঐ সঙ্গে জবাবটাও জটিল হয়ে যায়। কোনো-কোনো পূজা যেমন শুধুই মেয়েদের–মেচেনি খেলা বা হুমার নাচ, কোনো-কোনো পূজা যেমন শুধু চ্যাংড়াদের-দোলখেলার দ্বিতীয় দিন কাদাখেলা, তেমনি যেন এই মিছিলের আচারই এই যে বাঘারুর তার বাহু, কব্জি, বুকপিঠের পেশিগুলোকে এই রকম স্পষ্ট করে এই ঝাণ্ডা বইবে আর তার পেছনে-পেছনে এই বড় বড় মানষির ঘর চলে।
