এতক্ষণে মিছিলের মাথায় সুস্থিরের মোটর সাইকেল বাহিনী রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে একটু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে। সামনে দুইটি ফোতাপরা মেয়ে ফেস্টুনটা ধরে আছে–সেই দুজনের পেছনে-পেছনে সবাইকে লাইন করে দাঁড় করাচ্ছে নবীন আর তিলক। মেয়েরা প্রথমে, ছেলেরা তার পরে।
সুস্থির বড় ঝাণ্ডাটি তুলে, মাটিতে দাঁড় করিয়ে ডান হাতে ধরে রেখেছিল। তার সামনে গিয়ে গয়ানাথ আঙুল দিয়ে বাঘারুকে দেখিয়ে বলে, ইমরাক নিশানখান দেন। সুস্থির তখন ডাইনে ঘাড় ঘুরিয়ে কথা বলছিল। গয়ানাথের কথা শুনতে পায় না। গয়ানাথকে দাঁড়াতে হয় সুস্থিরের কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত। সুস্থির ঘাড় সোজা করলে বলে, ইমরাক দিয়া দেন নিশানখান।
.
হ্যাঁ? বলে সুস্থির বাঘারুর নেংটিপরা বিশাল চেহারাটা দেখে। দেখবার জন্যে তাকে বাঘারুর মাথা থেকে পা আর পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বোলাতে হয়। সে রকম দেখার পরও সুস্থির ঝাণ্ডাটা দেয়, যেন কিছু ভাবে। বাঘারুর এমন লম্বা পেশল নগ্ন চেহারা রাজবংশী সমাজে এত দুর্লভ নয় যে সুস্থিরকে এমন দেখে যেতে হবে। এই রাজবংশী মিছিলটা রাজবংশী সমাজে এখন নতুন। রাজবংশী বলেই এই মিছিলটাতে এরা এসেছে এবং এখানে এসে এমন কিছু শ্লোগান দেবে যা অন্য মিছিলে দেয়া যায় না। সুতরাং রাজবংশী সমাজের এমন নিজস্ব মিছিলটাকেও সুস্থির সাজাতে চায় শহরের অন্যান্য পার্টির বড় বড় মিছিলের মত করে। অন্যান্য পার্টির মত মিছিল সাজাতে পারলেই উত্তরখণ্ড একটা পার্টি হয়ে উঠতে পারবে যেন। অন্য কোনো পার্টি কি এই রকম মিছিলে বাঘারুর সাইজের নেংটিপরা একটা লোককে মিছিলের শুরুতে প্রধান ঝাণ্ডা দিয়ে দাঁড় করাত? বাঘারু নেংটিপরা বলে সুস্থিরের কিছু মনেই হয় নি। বাঘারুর এত বড় শরীরটা দেখেও সুস্থিরের কিছু মনে হয় না। কিন্তু মিছিলের শুরুতে বাঘারুকে কতটা মানাবে এটা নিয়ে আরো যেন একটা গোপন বিচার করতে হয়। যদি উত্তরখণ্ড পার্টির এরকম মিছিল করা অভ্যেস থাকত তাহলে সুস্থির ভাবত না। কিন্তু সেই অভ্যেসটা এই মিছিলগুলি থেকে তৈরি হবে বলেই সুস্থিরের ভাবনা। সুস্থির যতক্ষণ ভাবে, তার মধ্যে মিছিলটা বেশ তাড়াতাড়ি সাজানো হয়ে যায়। সবাই যখন বোঝে কী ভাবে দাঁড়াতে হবে, তখন সবাই নিজের মত করে দাঁড়িয়ে যায়।
গয়ানাথ বলে, নিশানখান ইমরাক দেন কেনে, এ ধবিবার পারিবে। সুস্থির বাশটা বাঘারুর দিকে এগিয়ে দেয়। বাঘারু ধরে না। সুস্থির বলে, ধরেন কেনে। বাঘারু যেখানে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে থেকেই বাশটা ডান হাতে ধরে। সে ঘাড় তুলে দেখেও না সেই বাঁশের মাথায় কোন ঝাণ্ডা ঝুলছে।
বাঘারুকে বাঁশটা ধরিয়ে সুহির নেতাদের ডাকতে শুরু করে, এই কাকা, কাকা, অমনী কাকা, এইঠে আসেন। সুস্থিরকে গিয়ে হাত ধরে নেতাদের টেনে-টেনে এনে সেই ফেস্টুনের সামনে দাঁড় করাতে হয়। নেতারাও লাইন দিয়ে দাঁড়ান। তখন মিছিলের একটা চেহারা এসে যায়। সামনে মোটর সাইকেল বাহিনী। তার পর নেতারা। তারপর ফেস্টুন। তারপর মেয়েরা। তারপর পুরুষরা। সুস্থির যেন এখানো ঠিক করতে পারে না, ঐ অত উঁচু বাঁশের মাথায় নিশানটা কোথায় থাকবে, নিশানটা বাঘারুর হাতেই থাকবে কিনা, যদি থাকেই তা হলেই বা বাঘারু কোথায় দাঁড়াবে। সুস্থির চিৎকার করে বলে, মোটর সাইকেল সগায় খানিকখন আস্তে-আস্তে চলিবে। তার বাদে-সাইকেল মিছিলখান আগত চলি যাবে শ্লোগান তুলি-তুলি আর হাঁটা মিছিলখান পাছত-পাছত যাবা ধরিবে। জল্পেশত হামরালা শপথ নিম আর তিস্তাবুড়ির একখান পূজা করিম। থেমে সুস্থির মিছিলটা একবার দেখে ও কিছুটা অন্যমনস্ক ভাবেই বাঘারুকে হাত ধরে টেনে মিছিলের সামনে, নেতাদেরও সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। নিশানটির ত ঐখানেই থাকার কথা, মিছিলের মাথায়। মোটর সাইকেলগুলো চলে গেলে বাঘারুই থাকবে এই এত বড় ঝাণ্ডা হাতে মিছিলের শুরুতে, তারপর নেতারা, তারপর ফেস্টুন, তারপর মেয়েরা, তারপর পুরুষরা।
সুস্থির আওয়াজ তোলে–উত্তরখণ্ড পার্টি জিন্দাবাদ। কোন শ্লোগানের কী উত্তর হবে সেটা যারা, জানে তারা মিছিলের নানা জায়গায় ছড়িয়ে আছে বলে মিছিল থেকে শ্লোগানটা তত জোরে ওঠে না। কিন্তু সাইকেল আর মোটর সাইকেলের লোকজন শ্লোগান খুব ভাল জানে। তারা চিৎকারে-চিৎকারে শ্লোগানগুলো জমিয়ে দেয়। কামতাপুর রাজ্য, কায়েম করো, কায়েম করো। উত্তরখণ্ড দিচ্ছে ডাক, ভোটের বাক্স খালি যাক। কৃষকের জমি কাড়ি তিস্তা ব্যারেজ চলিবে না। তিস্তা ব্যারেজের মিছিলে, যোগ দিন, যোগ দিন।
.
১৮৪. মিছিলের মাথায় বাঘারু
ময়নাগুড়ি ছাড়াতে না-ছাড়াতেই মিছিলটা তিন টুকরো হয়ে যায়। শ্লোগান দিতে-দিতে মোটর সাইকেলওয়ালারা আগে-আগে ছুটে যায়। সাইকেলওয়ালারা প্রাণপণে সাইকেল চালিয়ে মোটর সাইকেলওয়ালাদের সঙ্গে থাকতে চায়। কিন্তু তাদের সবার পক্ষে অত জোরে সাইকেল চালানো সম্ভব হয় না। ফলে তারা মোটর সাইকেল আর পায়ে হাঁটা মিছিলের মধ্যে ভাঙা সাঁকোর মত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকার অনেক জায়গায় বর্ষার শুরুতে এরকম ভাঙা সঁকো দেখা যায়। কনট্রাক্টারদের ভাষায় যাকে বলে ফেয়ার ওয়েদার ব্রিজ, বর্ষার প্রথম চোটেই তা ভেঙে নদীর বুক জুড়ে এরকমই ছড়িয়ে থাকে।
