জল্পেশে যাবার জন্যে যারা তৈরি ছিল তারা ভোর না-হতেই মিছিলের জায়গায় এসে জমা হয়ে গিয়েছিল। সাতটা নাগাদ মিছিল সাজানো শুরু হয়। তখন দেখা যায়, এর মধ্যে অনেকে আবার বাসে জল্পেশে গিয়ে সেখানে মিছিলে যোগ দেয়ার কথা ভাবছে। ময়নাগুড়ি থেকে জল্পেশ বাসে যাওয়ার কথা আগে ভাবাই যেত না, বাসও ছিল না। আজকালও বাস খুব বেশি নয়। কিন্তু একটা লাইনের বাস এই সকালেই ছাড়ে। আর, ময়নাগুড়িতে কালকের ফাংশন উপলক্ষে কিছু মিনিবাস এসে জুটেছিল, তারা দুটো-একটা সাটল ট্রিপের আশায় জল্পেশ-জল্পেশ বলে চেঁচাচ্ছিল।
একটা গেরুয়া ফেস্টুন মাটিতে পোতা ছিল–তাতে লেখা, নিখিল বঙ্গ উত্তরখণ্ড সমিতি। উত্তরখণ্ড দলের একটা বড় তেকোনা নিশান পোতা আছে–একটা বড় বাঁশের মাথায় পতাকাটা দুলছে। আরো কিছু ছোট-ছোট পতাকা আশেপাশে মাটিতে পোঁতা।
মনে হচ্ছিল, সবাই যেন কোনো কিছুর জন্যে অপেক্ষা করছে। সেই আলগা-আলগা জোটের মধ্যে আগের রাতের অনুষ্ঠান নিয়েই কথা হচ্ছিল বেশি। এক জায়গায় একজন বেশ রেগেই ওঠে, আরে তোমরালা না-হয় সিনেমাখান দেখিছেন, মুই ত দেখো নাই, স্যালায় কি করি বুঝিম কোন ফিল্মের কোনখান গান আর কোনখান নাচ!
তোমার খেপিবার কী আছে ভাই! তোমরালা সিনেমা দেখে নাই ত দেখেন নাই, এ্যালায় নাচোখান দেখো।
কী দেখিম? মাটিত পড়ি গড়াগড়ি যাছে, য্যান্ দেও ধরিছে। তোময়ালা কহিছেন–আহা-হা, মুই ত বুঝিবারই পারো না।
যাকে বলা সে হো হো করে হেসে ওঠে, আরে, মাটি পড়ি একখান জোয়ান বেটিছোঁয়া ঐনং আলাংপালাং করিছেন কেনে, বুঝো না ত চুপ করি থাকো কেনে। বুঝিবার কী আছেন হে। দেখিবার জিনিশ দেখো কেনে। কী? দেখিবার কি খারাপ নাগিছে? হ্যাঁ। উত্তরখণ্ড পার্টির এ্যালায় এক্কেরে জয়জয়। কংগ্রেসের ঘর পারো নাই, কমুনিশের ঘর পারো নাই, এই উত্তরখণ্ডটা পারিছে–স্যালায় বম্বাইঠে শ্রীদেবীক এইঠে ময়নাগুড়িত আনিবার। উত্তরখণ্ড পার্টিটা শ্রীদেবীর পার্টি হয়্যা গেইছে। লোকটি হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে চিৎকার করে শ্রীদেবীর পার্টি জিন্দাবাদ।
কেউ সাড়া দেয় না–সাড়া দেয়ার জন্যে কেউ তৈরি ছিল না বলে। কিন্তু সেই অপ্রস্তুতির কারণেই সবাই হেসে ওঠে, হাততালি দেয়, যেন লোকটি আর-একবার চিৎকার করলে সবাই সাড়া দিত।
.
১৮৩. বাঘারুর হাতে ঝাণ্ডা দিতে সুস্থিরের দ্বিধা
একটু পরেই দূর থেকে একটা আওয়াজ ভেসে আসে, সবাই উঠে দাঁড়িয়ে তাকায় আওয়াজটা কোত্থেকে আসছে দেখতে। কয়েকটা মোটর সাইকেল ও সাইকেল নিয়ে সুস্থির এগিয়ে আসছে–উত্তরখণ্ড পার্টি জিন্দাবাদ।
সুস্থিরের দলটা এসে পড়া মাত্রই সাজো-সাজো পড়ে যায়। সুস্থিরে দলে গোটা পঞ্চাশেক সাইকেল, মোটর সাইকেল খানদশেক-মোপেড-স্কুটারসহ। দলটা এসে রাস্তার ওপর দিয়ে চলে গিয়ে সেই ফেস্টুনটা পেরিয়ে থামে, কিন্তু স্টার্ট বন্ধ করে না, থামেও না। একটা মোপেডের পেছন থেকে সুস্থির নেমে চিৎকার করতে করতে আসে, মিছিল সাজান, মিছিল সাজান।
সুস্থির বড় ফ্ল্যাগটা মাটি থেকে তুলে নিয়ে দাঁড়ায়, আসেন আসেন, কায়ো জোয়ান মানষি আসি ধরেন ঝাণ্ডাখান। পঞ্চাননবাবু আর গয়ানাথ জোতদার এসে সুস্থিরের পাশে দাঁড়ান। সুস্থির চেঁচিয়ে ওঠে, হে ই নবীন, ফেস্টুনখান ধরি খাড়া কেনে, মিছিল সাজো, মিছিল সাজো।
নবীন আর তিলক ফেস্টুনটা মাটি থেকে তুলে এনে রাস্তার ওপর আড়াআড়ি দাঁড়ায়। সুস্থির চিৎকার করে, আরে, তোমরালা ধরিলেন কেনে, দুইখান বেটিছোঁয়াক ধরি দেন, এই, দুইখান বেটিছোঁয়াক ডাকেন কেনে। পঞ্চাননবাবু এগিয়ে যান। সুস্থির এবার গয়ানাথকে বলে, আরে একখান জোয়ান মানষিক আসিবার কহেন না, ঝাণ্ডাখান ধরিবে।
গয়ানাথ তাড়াতাড়ি মিছিলের জন্যে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের দিকে গিয়ে চিৎকার করতে থাকে, হে-এ বাঘারু, বাঘারু হে-এ। কিন্তু বাঘারুকে কাছাকাছি কোথাও দেখা যায় না। গয়ানাথকে তখন আরো খানিকটা যেতে হয়, হে-এ বাঘারু, বাঘারু হে-এ।
এখানে বেশির ভাগই এদিককার লোকজন। তারাও গয়ানাথকে চেনে না, নাম হয়ত জানে আর গয়ানাথও এদের মুখ চেনে না। ফলে, গয়ানাথের ডাক শুনেও কেউ বাঘারুকে খুঁজে দিতে এগতে পারে না। গয়ানাথকেই রাস্তাটা ধরে হে-এ বাঘারু, বাঘারু হে-এ ডাকতে-ডাকতে এগিয়ে আবিষ্কার করতে হয় যে বাঘারু সব জায়গাতেই যেমন একা দাঁড়িয়ে থাকে, এখানেও তেমনি বলদের নাখান দাঁড়িয়ে আছে। গয়ানাথের ডাক সে শুনতে পায় না, বা, শুনলেও বুঝতে পারে না তাকে ডাকা হচ্ছে। গতকাল গয়ানাথের বাড়ির লোকজনকে নিয়ে এখানে আসার পর থেকেই বাঘারু খানিকটা অলসভাবে ঘোরাঘুরি করছে। এখানে তার ত কোথাও নির্দিষ্ট কোনো কাজ নেই। তাই সে স্রোতে ফেলে দেয়া কাঠের মত যেখানে-সেখানে পড়ে থাকছে।
বাঘারুকে দেখে গয়ানাথ একটু দূরেই দাঁড়িয়ে পড়ে অভ্যেসে। বাঘারু তার চাইতে এত লম্বা যে সামনে গেলে গয়ানাথকে ঘাড় বেঁকিয়ে কথা বলতে হয়।
হে–এ বাঘারু, এইঠে খাড়ি-খাড়ি কী করিবার ধইচছিস? বাঘারু চমকে তাকাতেই বলে, চলি আয় হিপাখে, গয়ানাথ এবার একেবারে দ্রুত পা ফেলে মিছিলের মাথার দিকে এগিয়ে যায় আর গয়ানাথের ডাকে চমকে বাঘারু গয়ানাথের পেছনে-পেছনে হাঁটতে শুরু করে।
