.
১৮২. জল্পেশ অভিযানের কিছু অসুবিধে
পরদিন শুক্রবার সকালে জল্পেশ অভিযানের জন্যে জনসমাবেশ শুরু হয়ে যায় সকাল সাতটা নাগাদ। বৃহস্পতিবার রাতে শ্রীদেবীর অনুষ্ঠান শুনতে স্থানীয় যারা এসেছিল তাদের একটা অংশ এই দুটো কার্যসূচিই মাথায় রেখে এসেছিল, বা, এই দুটো কাৰ্যসূচির জন্যেই তাদের অনেককে আনা হয়েছিল। তারা অনুষ্ঠানের শেষে বাইরে এসে খাওয়া-দাওয়া সেরে আবার ঐ প্যান্ডেলে গিয়েই ঘুমিয়ে থাকে। সকালে উঠে এখন জমা হচ্ছে জল্পেশ অভিযানের জন্যে।
জল্পেশ অভিযানের জন্যে যারা থেকে গেছে তাদের প্রায় সবাই উত্তরখণ্ডের নেতাদের প্রভাবিত এলাকার লোকজন। উত্তরখণ্ডের নেতাদের প্রায় প্রত্যেকেই কিছু-কিছু জমি-জিরেতের মালিককারোকারো ত এক-এক অঞ্চলে জোতদার বলে প্রতিষ্ঠাই আছে। বিশেষত গয়ানাথ জোতদার ও তার জামাই আসিন্দির উত্তরখণ্ডে যোগ দেয়ায় সম্মিলনের ঠিক মুখেমুখে ডুয়ার্সে উত্তরখণ্ডীদের প্রতিপত্তি বেশ বেড়ে যায়। কিন্তু ফালাকাটা, আলিপুরদুয়ার, সাঁওতালপুর ব কোচবিহার পর্যন্ত নানা জায়গাতে উত্তরখণ্ডের বড় বড় নেতারা যতই থাকুন, সেখান থেকে ত তার জলেশ অভিযানের জন্যে বেশি লোক নিয়ে আসা সম্ভব নয়। নকশালবাড়ির সম্পৎ রায় ত বড় নেতা, কিন্তু জল্পেশ অভিযানের জন্যে নকশালবাড়ি থেকে সব মিলিয়ে জনা পঁচিশ-তিরিশের বেশি আসে নি। তাও আসত না–যদি কাল শ্রীদেবীর অনুষ্ঠান না থাকত।
এটা অবিশ্যি উত্তরখণ্ড নেতাদের খানিকটা জানাই ছিল। তাই তারা বিশেষ জোর দিয়েছিলেন ময়নাগুড়ি, বাকালি, পদমতী, জোড়পাকুড়ি, বানেশ এই সব জায়গা থেকে এই অভিযানের লোকসংগ্রহ করতে। সাংগঠনিক দিক থেকেও ময়নাগুড়িই উত্তরখণ্ড আন্দোলনের কেন্দ্র। ময়নাগুড়িকে কেন্দ্র করে লোকসংগ্রহ করা তাই সহজও।
প্রচারের সময়ও এই কথাই বেশি বলা হয়েছিল–শ্রীদেবীর নাচ দেখি প্যান্ডেলত থাকি যাবেন, জল্পেশ করি ঘরত ঘুরিবেন। কথাটা ধরেওছিল ভাল। এই পাশাপাশি এলাকার লোকজনের পক্ষে আজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাল দুপুরে ফিরে আসা বেশ লোভনীয়, বিশেষত, ময়নাগুড়িতে থাকার জন্যে প্যান্ডেলটা যখন পাওয়াই যাচ্ছে।
শুধু যে সুবিধে তাই নয়। যদি পরদিন জল্পেশ অভিযান নাও হত তা হলেও এরা সবাই ত আর রাত্রিতেই ফিরতে পারত না রাতটুকু তাদের ময়নাগুড়িতে কাটাতেই হত। জল্পেশ অভিযানের কর্মসূচি ঘোষিত থাকায়–প্যান্ডেলটাতে রাত কাটানো, তারপর দল বেঁধে জল্পেশে যাওয়া এটা ব্যবস্থার মধ্যেই চলে আসে। কে আর এখানে এমন আছে যে জল্পেশ যাওয়ার সুযোগ পেলে যাবে না।
উত্তরখণ্ডের নেতারা চেষ্টা করলে যে দূর-দূর জায়গা থেকেও কিছু-কিছু লোক আনতে পারতেন না, তা নয়। প্রথম দিকে তারা হয়ত সেরকম ভেবেও থাকবেন। কিন্তু গয়ানাথ জোতদার যোগ দেয়ার পর তিস্তা ব্যারেজ উদ্বোধনের দিন বিক্ষোভ মিছিল সংগঠনের দায়দায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়। জল্পেশ অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল-উত্তরবঙ্গের প্রাচীনতম ও পবিত্রতম তীর্থের নাম আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে উত্তরখণ্ডের দিকে সবাইকে টেনে আনা। সেই প্রচারের জন্যে শ্রীদেবীকেও আনা। যদিও শ্রীদেবীকে আনাটা ব্যবসার মত করেই হয়েছে কিন্তু উত্তরখণ্ড সম্মিলনের সঙ্গে যুক্ত করেই ত তাকে আনা। মাসখানেকের মাথায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তিস্তা ব্যারেজ যখন উদ্বোধন করবেন, তখন নানা জায়গা থেকে ট্রাকে করে, বাসে করে মিছিল নিয়ে আসা হবে–এটা স্থির হয়ে যাওয়ার পর জল্পেশ অভিযানের জন্যেও বাইরে থেকে তোক নিয়ে আসার কথা আর-কেউ ভাবে না। মাত্র মাসখানেকের মধ্যে দু-দুটো মিছিল ত আর করা সম্ভব নয়।
সরকারি মিটিঙে উত্তরখণ্ডের পক্ষ থেকে যুক্তি হিশেবে যেটা বলা হয়েছিল, পুলিশ সেটা অক্ষরে-অক্ষরে পালন করে। অর্থাৎ অনুষ্ঠান শেষ হওয়ামাত্র বাইরের সমস্ত ট্রাক ও বাসকে ময়নাগুড়ি ছাড়তে হয়। তাদের রাখাই ত হয়েছিল এমনভাবে যাতে উত্তরখণ্ড সম্মিলমের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক তৈরি না হয়। শ্রীদেবীর নাচের জন্যে এসেছ, শ্রীদেবীর নাচ দেখে চলে যাও। রাত তিনটের মধ্যে ময়নাগুড়ি প্রায় খালি করে দেয়া হয়। উত্তরখণ্ড সম্মিলনের নেতারা আশা করেছিল যে আসাম ও বিহারের দিক থেকে যারা এসেছে, তাদের একটা অংশ এই সুযোগে জল্পেশ পুজো দেয়ার জন্যে জল্পেশ অভিযানে যোগ দিতে শ্রীদেবীর নাচের পর থেকে যাবে। থাকতও হয়ত। কিন্তু জল্পেশ অভিযানের প্রচারের সেরকম কোনো সুযোগ বৃহস্পতিবার উত্তরখণ্ড পেলই না।
সবটা যে পুলিশের দোষ তাও নয়। শ্রীদেবীর অনুষ্ঠানে হাজার-হাজার লোক আসবে–এটা জানা কথাই। কিন্তু কথাটা জানা এক ব্যাপার আর সেই হাজার-হাজার লোক দেখা আর-এক ব্যাপার। বৃহস্পতিবার সারাদিন ও সারা রাত ময়নাগুড়ির মত ছোট শহরের যে-অবস্থা তাতে উত্তরখণ্ডের নেতারাও পরস্পরের সঙ্গে তেমন কথাবার্তা বলতে পারে নি। বরং অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর, প্যান্ডেলের ভেতর ও বাইরে নেতারা নিজেদের মধ্যে কিছুটা কথা বলতে পেরেছে। তারা যদি প্যান্ডেলের ভেতরে বা রাস্তায় জল্পেশ্বর অভিযানের কথা বলতে চাইত তা হলে নিশ্চয়ই পুলিশ বাধা দিতে আসত না। আসলে, এই জনসমুদ্র দেখে নেতারাও এমন অভিভূত হয়ে পড়ে যে তারা আর-কোনো কথা মনে করতেই পারে নি।
