বাঘারু ঐখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শ্রীদেবীকে দেখতে-দেখতে ভুলে যায় তাকে খুঁটির মত দাঁড় করিয়ে রেখে একদল ছেলে নাচছে–যেন ঐখানে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে তার শ্রীদেবীর ঐ আক্ষেপ দেখারই কথা। বাঘারু ও-রকম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকে ঘিরে ছেলেদের নাচ ভেদ করে মঞ্চে শ্রীদেবীকেই যেন শুধু দেখে। দেখে, বেটিছোয়াখান ক্যানং তলপ্যাটখান উঠাছে-নামাছে, উঠাছে-নামাছে। এই ভঙ্গির একটা অর্থ যেন বাঘারুর আপাদমস্তক প্রায় নগ্ন রাজবংশী শরীরে ঢুকতে চায় কিন্তু মঞ্চের ঐ শরীরের ওপর আলোর খেলা, মাইকে আরো চাপা ও আরো দ্রুত শীৎকার আর চারপাশে নীরব শরীরমন্থন সেই অর্থটা তার শরীরে সঞ্চারিত হতে বাধা দিচ্ছে। তাই বাঘারু মেয়েটির শরীরের আর্তনাদ দেখতে-দেখতে কেমন বিমূঢ় বোধ করতে থাকে। সেই বিমূঢ়তায় সে তার শরীরের ভেতর যেন এমন-কি ঐ মঞ্চের আহ্বানও বোধ করে ফেলতে চায়। বাঘারুর ঐ শালপ্রাংশু রাজবংশী শরীরের নগ্নতার সঙ্গে মঞ্চে বম্বে ফিল্মের যৌন প্রতীক নায়িকা শ্রীদেবীর জ্যান্ত শরীরের একটা অর্থগত সংযোগ প্রতিষ্ঠা হওয়ার মুহূর্তে গানটা হঠাৎ থেমে যায়, অনেকক্ষণ আগেও যেমন থামতে পারত। শ্রীদেবী এতক্ষণে মঞ্চের ওপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, হেঁটে মঞ্চ থেকে চলে যান, মঞ্চের আলো জ্বলে ওঠে, একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দর্শকরা উত্তেজনা মোচন করে অথচ বাঘারু যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। এখন মঞ্চের আলোতে ও প্যান্ডেলের বাইরে থেকে আসা আলোতে দেখা যায়-বাঘারু প্যান্ডেলে ঐ লক্ষ লোকের মাঝখানে তার উদোম শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে, পরনের নেংটিটুকু যেন থেকেও নেই। বাঘারুই যখন দৃশ্য হয়ে ওঠে, তখন অনেকে তাকে দেখেও দেখে না। কিন্তু দেখেও না দেখে থাকার সময়টা পেরিয়ে যায়–সকলে বসে আছে যেখানে সেখানে নিজের নগ্নতা নিয়ে বাঘারু এমনই বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। যে-কোনো মুহূর্তে পরের কর্মসূচি ঘোষিত হবে, তখন বাঘারু অবান্তর হয়ে যাবে–এই সময়টাও পার হয়ে যায়। তখন শ্রীদেবীহীন মঞ্চের শূন্যতাটাও যেন বাঘারুর এই নির্লজ্জ নগ্নতায় অপমানিত হতে শুরু করে। এই মাত্র যে-নাচটি শেষ হল, সেনাচে ত পুরো প্যান্ডেলটাই মঞ্চ হয়ে উঠেছিল। বাঘারুর ঐ নগ্নতা যেন তাই দর্শকদেরও অপমান। বাঘারু নিজের ঐ নগ্নতা নিয়ে মঞ্চের দিকে এমনই অনড়, যেন ঐ দাঁড়িয়ে থাকাটাই একটা বিদ্রোহ। শেষ পর্যন্ত যখন মনে হতে শুরু করে যে ঐ নির্লজ্জ রাজবংশী নগ্নতার জন্যেই মঞ্চটা এমন শূন্য পড়ে আছে, শ্রীদেবী ঢুকছেন না, যেন ঐ নগ্নতার সামনে শ্রীদেবীর পক্ষে মঞ্চে প্রবেশ সম্ভব নয়–তখন ডি-এস-পি সাহেব পেছন থেকে এসে বাঘারুর কাঁধে দূর থেকেই তার ব্যাটনটা ছুঁইয়ে বলেন, বসসা, বসো। কিন্তু বাঘারু সে-ইঙ্গিতও না বোঝয় ডি-এস-পি সাহেবকে অগত্যা হাত ধরে বাঘারুকে টেনে আনতে হয়, পেছনে। টুপি থেকে বুট পর্যন্ত পুরো ইউনিফর্মের ডি-এস-পি সাহেবের পাশে-পাশে হাঁটতে হাঁটতে ঐ চিড়ের ভেতর দিয়ে বাঘারু প্যান্ডেলের বাইরে চলে যায়।
মাইকে শোনা যায়, এইবার আজকের সন্ধ্যার শেষ অনুষ্ঠান পরিবেশন করবেন বম্বের প্রখ্যাত চিত্রতারকা শ্রীদেবী। তার সঙ্গে-সঙ্গে আমাদের উত্তরখণ্ড সম্মিলনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও শেষ হবে। আগামীকাল সকালে জল্পেশ্বর শিবমন্দির অভিযান। আপনাদের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ যে আপনারা এই শোভাযাত্রায় দলেদলে যোগ দিয়ে উত্তরবঙ্গের পবিত্রতম তীর্থ জমেশ্বর মন্দিরে যাবেন ও জলের শিবের পূজা দিবেন। আমাদের অনুরোধে শ্রীদেবী তার এই শেষ অনুষ্ঠানে নাগিনা সিনেমার শেষ দৃশ্যে তিনি শিবলিঙ্গের সামনে যে-নৃত্য পরিবেষন, করেছিলেন সেই নৃত্যটি পরিবেষন করবেন। পুলিশ কর্তৃপক্ষ অনুরোধ করেছেন যে-ভাবে আপনারা প্যান্ডেলে ঢুকেছেন সেভাবেই লাইন করে অনুষ্ঠানের শেষে বাইরে যাবেন।
ঘোষণার সঙ্গে-সঙ্গেই মাইকে গান বেজে ওঠে, ম্যায় তেরি দুষমন, দুষমন তু মেরা। ম্যায় হ্যায় নাগিন, তু সাপেরা। গানের মুখটা দুবার হয়ে যাওয়ার পর শ্রীদেবী মঞ্চে ঢোকেন। এখন মঞ্চভর্তি আলো। শ্রীদেবীর পরনে ফিল্মের সেই সাপের খোলশের মত টাইট পোশাক নেই–একটা আলখাল্লা-মত পরা, তাতে খোপ-খোপ ঘর আঁকা। শ্রীদেবী ফিল্মের নাচটাও পুরো নাচেন না, বরং একটু ভজনের মত নাচতে থাকেন। মাঝে-মাঝে হাততালি দিয়ে ওঠেন। মাঝে-মাঝে দুলে-দুলে গান। এই গানটির সুরের ভেতরও সেই উপাদান ছিল। মঞ্চে কিছুক্ষণ এ রকম ঘোরাফেরা করার পর শ্রীদেবী সামনের দিকে মাঝামাঝি বসেই পড়েন–জোড়াসনে, তারপর মাথা দুলিয়ে গানের তালে-তালে শুধু হাততালিই দিয়ে যান। সেই সময়ই একটি মেয়ে মাথায় একটা থালা নিয়ে ঢোকে। শ্রীদেবীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে সে-থালাটা খুব ভক্তিভরে তার সামনে নামিয়ে রাখে। তখন দেখা যায়, থালাটির ওপর একটি বড় শিবলিঙ্গ, একটি সাপ শিবলিঙ্গের ওপর ফনা মেলে আছে। সম্ভবত টিন বা ও-রকম কিছু কেটে করা। নগিনা ফিল্মটিতেও শিবলিঙ্গ ছিল। মেয়েটি আবার প্রণাম করে উঠে যেতেই ধীর গম্ভীর একটি আওয়াজ ওঠে, জয় বাবা জল্পেশ্বর। দর্শকরা করজোড় কপালে তোলে। এর মধ্যেও গানটা হয়ে যেতে থাকে–ম্যায় তেরি দুষমন দুষমন তু মেরা। ম্যায় হ্যায় নাগিন তু, সাপেরা। সেই গানের তালে-তালে শিবলিঙ্গের সামনে শ্রীদেবী হাততালি দিয়ে যান, চোখ বুজে, মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে, যেন ঐ গানটি জল্পেশ্বরের ভজন–এরকম ভাবে দর্শকরাও চোখ বুজে হাততালি দিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু গানটার সঙ্গে তেমন কেউ গলা মেলাতে পারে না। গানের নিয়মে গান শেষ হয়। কিন্তু শ্রীদেবী মঞ্চ ছেড়ে যান না। তিনি শিবলিঙ্গের সামনে নত হয়ে প্রণাম করেন, তারপর উঠে দাঁড়ান। একটু কৃতজ্ঞ হাসি ঠোঁটে রেখে শ্রীদেবী দাঁড়িয়ে বায়ে, ডাইনে, সামনে, আবার বায়ে, আবার ডাইনে নমস্কার করেন। দর্শকরা তুমুল হাততালি দিয়ে ওঠে। শ্রীদেবী আবার ঘুরে-ঘুরে নমস্কার করেন। দর্শকরা আবার হাততালি দিতে-দিতে উঠে দাঁড়ায়। শ্রীদেবী এবার নত হয়ে শিবলিঙ্গটা মাথায় তুলে উইঙের দিকে হাঁটা দিতেই জয় বাবা জল্পেশ্বর ধ্বনিতে প্যান্ডেল ভরে যায়। শূন্য, আলোকিত মঞ্চের ওপর পর্দা নেমে আসে।
