জায়গাটিতে এই পার্টি একটা ধাপ ভেঙে উঠল। তার আগে বিনোদবাবু আর জ্যোৎস্নাবাবু ওদের বোঝাটা মাটির ওপর নামিয়ে দিয়েছেন, সার্ভে টেবিলটার কাছে। ওপরে উঠে, জ্যোৎস্নাবাবু আর বোঝায় হাত দিলেন না, নিজের ঝোলানো ব্যাগটা নিয়ে ভিড়ের ঐ দিকেই চলে গেলেন, চায়ের দোকানটা যে-দিকে। হাফশার্ট গায়ে, ধুতি পরা, ক্যাষিশের পাম্পসু পায়ে গয়ানাথ এগিয়ে এসে নমস্কার করল, আসেন স্যার, আসেন। তারপর সেই চেয়ারটা দেখিয়ে বলল, বসেন স্যার। বসতে একটু ইচ্ছে করছিল সুহাসের। উনি বলা মাত্র ঐ খালি চেয়ারটায় গিয়ে বসলে মনে হবে, সুহাস এখানে অতিথি, বেশিক্ষণ থাকবে না, এই ভদ্রলোকই গৃহকর্তা। কিন্তু সার্ভে পার্টিটা ত সুহাসেরই। তার ওপর দ্বিতীয় আর-একটি চেয়ার নেই। বসার প্রয়োজন হলেও, একটু সময় নেয়া ভাল।
বিনোদবাবুর হাত প্রায় যন্ত্রের মত নিশ্চিত ও ব্যস্ততাহীন। তিনি সুহাসের কাছে কিছু জিজ্ঞাসাও করলেন না। লাল সালুর বস্তা খুলে মৌজা ম্যাপটা সুহাসকে দিলেন। তারপর এখানকার খানাপুরী টেকনিক্যাল ম্যানুয়াল খুলে, তার ভেতর এই সেটেলমেন্টের খশড়া ফর্মটা ঢুকিয়ে নিলেন। মৌজার এক নম্বর দাগ থেকে টুকে যাবেন। আর এই জায়গাটাতে ম্যাপিং-এর একটা ঝামেলা আছে। সেই জন্যই কেজি ওয়ান এখান থেকেই কাজ শুরু করছেন। খাতা আর কম্পাস হাতে বিনোদবাবু দাঁড়িয়ে অনাথ আর প্রিয়নাথকে খুঁজলেন। অনাথকে দেখেই বললেন, প্রিয়নাথকে ডাকো, তাড়াতাড়ি শিকল ধরো, এখন রোদ আছে, যতটা পার সেরে রাখো, ঐ, নদীর পাড় বরাবর চেন ফেলল। বিনোদবাবু সুহাসের কাছে এসে বললেন, আপনি ত ম্যাপটা দেখেছেন। এখানেই ফ্লাডের জন্য একটা নতুন ম্যাপিং করতে হবে। আমি চেইন ফেলছি।
বিনোদবাবু নদীর দিকে পা ফেললে অনাথ এসে বলল, প্রিয়নাথকে ত দেখছি না। বিনোদবাবু তার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে বললেন, তাকে কি এর মধ্যেই বাঘে খেল? তাড়াতাড়ি চেইন ধরতে বলল। বৃষ্টি হলে ত তোমাকে-আমাকে আবার একদিন এখানকার কাজের জন্যেই আসতে হবে। দিন বেশি লাগালে তোমার-আমার কোনো লাভ নেই, অফিসার না হয় অ্যালাউন্স পাবে।
বিনোদবাবু জানেন প্রিয়নাথ ঐ ভিড়ের মধ্যে মলে ধরতে গেছে। বস্তি বা বড় জোতের কাজে বেশ সময় লাগে, অংশের মামলা থাকে, মক্কেলই প্রিয়নাথকে খুঁজে বের করবে। এখানে তিস্তা নদীর ভাঙন আর শাল গাছের ফরেস্টের মাপামাপি দেখতে ত এসেছে দুনিয়ার বনুয়ার দল–সে রাজবংশীই হোক, আর মদেশিয়াই হোক, আর নেপালিই হোক। সারা তল্লাটে যাদের এক চিলতে জমির কাজ জোটে নি, আর, এমন-কি ফরেস্টের জমি বেআইনি চাষ করতেও যাদের আসতে হয়েছে এই গাজোলডোবা-সিদাবাড়ির তিস্তার গড় পর্যন্ত, তাদের ভেতর আর মক্কেল পাবে কোথায়? এক গয়ানাথ জোতদার। কিন্তু সে তআর ভিড়ের মধ্যে মিশে থাকা খুচরো মক্কেল নয়। মৌজ-মৌজা জমিতে তার কারবার। কাজকর্ম ঠিকমত শেষ হলে সবাইকে থোক কিছু দেবে হয়ত। এখানকার কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করে দিতে পারলেই লাভ। প্রিয়নাথ এর ভেতর কোনো দেউনিয়ার কোনো মামলা আছে কি না, সেটাই ঠাহর করতে গেছে। নদীর কাছাকাছি থেকে পেছন ফিরে বিনোদবাবু কেন, প্রিয়-না-থ। তার আওয়াজটা তিস্তার হওয়ার আওয়াজে ঢাকা পড়ে যায় বটে, কিন্তু তাতেও সুহাস পর্যন্ত একটু চমকে যায়, বিনোদবাবুর গলার এতটা জোর দেখে। মৌজা ম্যাপটা খুলে সুহাস চেয়ারটার দিকে এগয়।
স্যার, একটা কথা ছিল স্যার, কথা না হয়, অনুরোধ, অনুরোধ ছিল স্যার–সেই ভদ্রলোক
এই স্যার, জরিপ মানে সার্ভে ত আপনার স্যার রোজই হওয়া লাগিবে। অনেক টাইম ত লাগিবেই স্যার কিন্তু এই রোজ-বোজ কি এই টেবিল আর খাতাপত্র স্যার আপনাদের পক্ষে, আপনার না স্যার, কিন্তু উনাদের পক্ষেও টানাটুনি করা উচিত স্যার?
সে আর কী করা যাবে, সার্ভে করতে হলে ত এ-সব লাগেই, ম্যাপটার দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে সুহাস চেয়ারটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
সেটা বিষয়েই আমার স্যার একটা অনুরোধ রাখার ছিল। সেটা আমাদের ত এইটা কাজ এটা ত আপনাকে মানিতেই লাগে স্যার, সুহাস যখন চেয়ারটায় বসতে যাচ্ছে গয়ানাথ বাধা দিয়ে বলল, বসিবেন না স্যার, কনে থামেন।
সুহাস ম্যাপটা বেশ মন দিয়ে যাচাই করছিল। এর পর এই ম্যাপের ওপরই নতুন ম্যাপের লাইন কোথা দিয়ে টানা হবে সেটা বের করার আগে আউটলাইনটা দেখে নিচ্ছিল। খুব সুবিধে হত, যদি ঠিক এই সেকশনটার একটা এনলার্জড আউটলাইন আঁকা থাকত। লোকটার কথায় সে একটু চমকে চোখ তুলতেই চিৎকার উঠল, হে-ই বাঘারু। যে-ভিড়টা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল, তার ভতর থেকে একজন এসে দাঁড়ায়। সুহাসের দুই হাতে ম্যাপ মেলাহীল কাগজের ওপর শাদা রেখার। আর এই লোকটিই যেন আর-একটা ম্যাপ রিলিফে আঁকা, এমন নিষ্প্রাণ বস্তুর মত সামনে এসে দাঁড়ায়। তার মাথা থেকে পা শাল-সেগুনের দীর্ঘ কাণ্ডের মত অনিয়মিত, বর্ণশূন্য ও রুক্ষ। চোখদুটো কোন গভীরে-মণি দেখা যায় না। নাকটা থ্যাবড়া। পরনে একটি নেংটি–তার রংও গায়ের রংয়ের সঙ্গে মিশে আছে। গয়ানাথ এত জোরে চিৎকার করে উঠেছিল, যেন ফরেস্টের ভেতর থেকে বনমোরগের ডাক। আর এই লোকটি এল দাঁড়িয়ে পড়ার পর, দাঁড়িয়ে থাকার পর, বোঝা যায় তাকেই ডাকা হয়েছে।
