এই অবকাশে পুলিশের লোকজন আর উদ্যোক্তারা মিলে প্যান্ডেলের একেবারে পেছনের টিনের বেড়াটা দ্রুত খুলতে শুরু করে। তাতে আওয়াজও হতে থাকে–টিন থেকে পেরেক খোলার আওয়াজ। দর্শকদের নাচগান তাতে থেমে যায়। দর্শকরা নিজের জায়গা থেকে নড়তেও চায় না অথচ এরকম অদ্ভুত আওয়াজের ব্যাপারটা জানতেও চায়। সামনের দুদিকে কোনাকুনি চেয়ারে জেলার সব অফিসারদের আর হর্তাকর্তা লোকদের বসে থাকতে দেখে দর্শকরা কিছুটা আশ্বস্তও হয়। এর মধ্যেই সবাই জেনে যায়–পেছনের বেড়াটা পুলিশ সাহেবের নির্দেশে খুলে দেয়া হচ্ছে! সেজন্যেই স্টেজও খালি।
টিকিট কেনা দর্শক ছাড়াও নতুন দর্শনার্থীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে বাড়তে এমন একটা অবস্থা হয়েছে যে তাদের দেখার ব্যবস্থা করাটা অনিবার্য হয়ে ওঠে। ডি-এস-পি সাহেব উদ্যোক্তাদের বলেন–টিকিট বিক্রি করা চলবে না, কারণ প্যান্ডেলে একটুও জায়গা নেই। তখন ঠিক হয় অনুষ্ঠান মাঝামাঝি হয়ে গেলে পেছনের বেড়াটা খুলে দেয়া হবে। শ্রীদেবীর লোকজনকেও তাই জানানো হয়।
.
১৮১. সমবেত রমণনৃত্য
অঘোষিত ঐটুকু বিরতির পর শ্রীদেবীর অনুষ্ঠান আবার শুরু হয়। আর চলতেও থাকে সেই খানিকটা ঠাণ্ডা খানিকটা গরম–এই ছন্দে। দুটো-একটা নাচগানের পর শ্রীদেবী তার সুপারহিট ফিল্ম নগিনার একটা গানের সঙ্গে স্টেজে কিছুটা হাঁটেন–ভুল যায়ে তুম এক কহানী। ফিল্মে এই জায়গাটিতে ভাঙা শিবমন্দিরের প্রাসাদের সিঁড়ি দিয়ে, অলিন্দ দিয়ে, মাঠ দিয়ে শ্রীদেবী কখনো পুঁতে রঙের, কখনো গোলাপি রঙের পোশাকে আপাদমস্তক নিজেকে ঢেকে, শুধু মুখটুকু বের করে রেখে গেয়ে-গেয়ে যান ঈষৎ বিলম্বিত লয়ে, ভুল যায়ে তুম এক কহানী। এ যেন জন্মান্তরের কাহিনী মনে পড়িয়ে দেয়া। ফিল্মে এই দৃশ্যে শ্রীদেবীর পাশে-পাশে ঋষিকাপুর ছুটে-ছুটে যান। আর শ্রীদেবী কখনো আধো ঘোমটা খুলে, কখনো বা না-খুলে, তাকে জন্মান্তরের কাহিনী শুনিয়ে যান। এখানে মঞ্চে শ্রীদেবী একা–শিবমন্দিরের অলিন্দ নেই, প্রাসাদ নেই, ঋষিকাপুরও নেই। কিন্তু শ্রীদেবী এমন ভাবে টেন আর হাঁটাটাই এমন নাচ হয়ে ওঠে, আধো ঘোমটা খোলেন বা খোলেন না যে দর্শকদের মনে হতে শুরু করে যে তারাই ঋষিকাপুর। এ গানটিতে সেই উল্লাস নেই, বরং যেন বিষণ্ণতা আছে।
এরকম আরো দুটো-একটা নাচগানের পর স্টেজের আলো কমে আসে। ফলে প্যান্ডেলটাতেও আবছায়া ছড়িয়ে পড়ে। দর্শকদের অনেকের জানাই আছে যে শ্রীদেবী, মোট কত ঘণ্টার অনুষ্ঠান করবেন, সব মিলিয়ে রাত নটা থেকে সাড়ে এগারটা, তার মানে আর বড় জোর দুটো-তিনটে নাচগান হবে। দর্শকরা এর মধ্যে হিশেব-নিকেশও একটা করে ফেলেছে যে অনুষ্ঠানটিতে যা তারা চেয়েছিল, তা পেয়েছে কি না। এখন যেন সেই প্রত্যাশাটা চরমের দিকে যাচ্ছে–আলো কমে আসায় ও সেই আধা-আলোর স্টেজ খালি ও নীরব থাকায় প্রত্যাশাটা এমনই পর্যায়ে ওঠে যে দর্শকরা কোনো কথা পর্যন্ত বলে না। হঠাৎ খুব চাপা স্বরে মাইকে অত্যন্ত দ্রুত লয়ে একটা বাজনা বেজে ওঠে। একটু পরে তার সঙ্গে আরো চাপা গলায়, যেন ফিসফিসিয়ে গাওয়া হচ্ছে–থাকা থাকা ট্রি-ই-ম, থাকা থাকা দ্রি-ই-ম। মাইকে কানে কানে কথা বলার মত করে এই আওয়াজটা ছড়িয়ে পড়ে। চাপা আলো, চাপা স্বর আর ঐ ছন্দিত দ্রুত লয়ে দর্শকদের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে যেন-থাকা থাকা ট্রি-ই-ম, থাকা থাকা দি-ই-ম। কেউ-কেউ হিসিয়ে ওঠে–হিম্মৎ ঔর মেহনৎ। শ্রীদেবী সেই আধো আলোর সঙ্গে মিশে মঞ্চে একটা বিড়ালীর মত উঁচু লাফে ঢোকেন। তার গলা থেকে হাঁটুর ওপর পর্যন্ত টাইট একটা পোশাক রংটা ঐ ধোয়াটে আলোয় বোঝা যায় না। বিড়ালীর মত দুটো-একটা লাফ মেরেই শ্রীদেবী হাঁটুতে আর কোমরে বিপরীত মোচড় দিয়ে নিজেকে গানের তালে-তালে কাঁপাতে থাকেন।
আলো বাড়ে না, গানের আওয়াজটাও বাড়ে না। শ্রীদেবী মঞ্চের এক জায়গা থেকে আর-এক জায়গায় যান এক-একটা লাফ দিয়ে। তারপর আবার সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে কোমরে মোচড় দিয়ে নিজের সারা শরীরকে কাঁপাতে থাকেন। স্টেজের একটু পেছন দিকেই এখনো তিনি লাফালাফি করেন। দর্শকরা খুব একটা স্পষ্ট দেখতেও পায় না। কিন্তু তার জন্যে কোনো আওয়াজ দিয়ে ওঠে না। যেন দর্শকরা জানেই–এটা তত স্পষ্ট দেখা যাবে না। জানে বলেই দর্শকদের ভেতর যতখানি দেখা সম্ভব ততখানি দেখে নেয়ার জন্যে একটা টানটান উত্তেজনা সঞ্চারিত হয়। আলো একটু হয়ত বাড়ে কিংবা হয়ত দর্শকরাই একটু বেশি দেখতে পায়–তখন দেখা যায় শ্রীদেবী স্টেজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, কোমরে সেই একই মোচড়, কিন্তু শরীরের সেই কম্পনের ফলে কখনো তার স্তন দুটি শরীর থেকে আলাদা হয়ে কাঁপছে–কিছুটা ছায়ায় স্তনের রেখা এত খোদাই হয়ে ওঠে যেন সে-স্তনের কোনো আবরণ নেই। আবার, কখনো থাকা-থাকা দ্রিইম-এর তালে-তালে শ্রীদেবীর নিতম্ব ছায়াতে খোদাই হয় ওঠে। সেই নিতম্বের কম্পনে মনে হয় ঐ শরীরে কোনো আবরণ নেই। অত বড় প্যান্ডেলে ঐ প্রায় লক্ষ লোকের মধ্যে নীরবে একটা চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, যেন, এইটির প্রত্যাশাতেই তারা এতক্ষণ ছিল। আলো একটু বাড়ে অথবা দর্শকরাই আরো একটু বেশি দেখতে পায়। শ্রীদেবী হাত দুটো মাথার ওপরে সোজা তুলে ফেলেন, তার শরীরের সব রেখা দর্শকদের চোখের সামনে খোদিত হয়ে যায়। তারপর দর্শকদের মুখোমুখি সেই শরীরটা যেন এক অনন্ত রমণের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই নিজেকে মোচড়ায়। শ্রীদেবীর কোমর থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সেই রমণে আবর্তিত হতে থাকে, আবর্তিত হতে থাকে। এর যেন আর শেষ নেই। মাইকের সেই চাপা স্বর শীৎকারের মত শোনায়–থাকা থাকা ট্রি-ই-ম, থাকা থাকা দি-ই-ম।
