কিন্তু শ্রীদেবী নাচতে নাচতে স্টেজের বাইরে চলে যান না। নাচটা তিনি স্টেজের ওপরই থামান। থামান, স্টেজের পেছন দিকে। তারপর, সেখান থেকে হাঁফাতে-হাফাতে হাঁটতে-হাঁটতে আসেন স্টেজের একেবারে সামনে। একটু দাঁড়িয়ে থাকেন। সবাই দেখে, যেমন অনেক ফিল্মেই দেখেছে, বড় চেনা শ্রীদেবীকে–ঘামছেন, বুক ওঠানামা করছে, ঠোঁটটা একটু ফাঁক, কপালে চূর্ণ চুল। ভরতনাট্যমের বাধা ভেঙে ফেলে দর্শকদের শ্রীদেবীসংক্রান্ত স্মৃতি হুহু করে ফিরিয়ে এনে নমস্কার করে শ্রীদেবী স্টেজ থেকে চলে যান।
.
১৭৯. শ্রীদেবী কতটা দেখান
এত-এত টাকার টিকিট কিনে এত কাছ ও দূর থেকে যারা শ্রীদেবীর নাচ বা শ্রীদেবীকেই দেখতে এসেছে, আর এত টাকা খাঁটিয়ে যারা শ্রীদেবীকে দেখানোর অনুষ্ঠান করছে তারা ত আর মাত্র কিছু সময়ের এই কার্যসূচিতে আসল শ্রীদেবী তাদের চেনা শ্রীদেবী থেকে কত আলাদা তা দেখতে বা দেখাতে চায় না–তারা ছবির শ্রীদেবীকে রক্তমাংসের হিশেবে মিলিয়ে নিতে চায়। সেই মিলিয়ে নেয়া কতটা সম্ভব তা জানা নেই, জানা নেই বলে ইচ্ছেটাই প্রবল। শ্রীদেবীরও নিশ্চয় এ হিশেবটা খুব ভাল জানা। তিনি যদি নিজেকে ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দিতে না পারেন তা হলে ছবির বাইরে এই লাখ-লাখ টাকার অনুষ্ঠানের অর্ডার তিনি পাবেন কেন? কিন্তু ছবির পর্দায় যা দেখানো যায় তা ত আর স্টেজে সকলের চোখের সামনে দেখানো যায় না। তারও কখন কোন নাচটি নাচবেন, তার হিশেব আছে। সেই হিশেব হল দর্শককে একটু চিনিয়ে দেয়া, আর একটু অচেনা রাখা। মাত্র এইটুকু সময়ের একটা অনুষ্ঠানে দর্শক তার নিজের মত করে বুঝে নেবে–ক্যামেরার লেন্স দিয়ে শ্রীদেবীর যতটা দেখা যায়, ফিরে-ফিরে দেখা যায়, নিজের দুটো চোখ দিয়ে ততটা দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু দর্শককে ত সেই লোভের জায়গা পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে যাতে তারা বোঝে ফিল্মের শ্রীদেবী আরো কত লোভনীয়। তাতে শ্রীদেবীর ফিল্মগুলো হিট। হবে, সুপার হিট হবে, সুপার-সুপার হিট হবে। ফিল্মের পর্দা থেকে মঞ্চে দেখার লোভ জাগানো, আর মঞ্চ থেকে ফিল্মের পর্দায় দেখার লোভ জাগানো–এর ভেতরেই শ্রীদেবীর নিজেকে দেখানোর হিশেব-নিকেশ কাজ করে।
ভরতনাট্যমের পর একটু বিরতি যায়, পর্দা অবিশ্যি পড়ে না। তারপরেই স্টেজের নিজস্ব মাইক্রোফোনে গান বেজে ওঠে, হাওয়া খাওয়া ই। বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই হাততালি, চিৎকার, দু-চারটে সিটি–মিস্টার ইন্ডিয়ার গান। দর্শকদের চোখের সামনে মিস্টার ইন্ডিয়া শ্রীদেবীর সেই দৃশ্যটি ভেসে ওঠে যাতে মনে হচ্ছিল শ্রীদেবী কাল একটা ব্রার ওপর দিয়ে গোলাপি একটা ওড়না ফেলে পর্দা জুড়ে ওড়াচ্ছিলেন। ছবির গানটিতে শ্রীদেবীর কথার পর বাচ্চারা কোরাসে উই উই উই উই উই আওয়াজ করে ওঠে। মাইক্রোফোনের গানটিতে সেই জায়গাটি আসতেই, তখনো শ্রীদেবী মঞ্চে ঢোকেন নি, দর্শকরা কোরাসে গেয়ে ওঠে, উই উই উই উই উই। আর, সঙ্গে সঙ্গে স্টেজের একেবারে সামনে দিয়ে শ্রীদেবী গোলাপি ওড়না উড়িয়ে নেচে যান-হাওয়া খাওয়া ই। আবার হাততালি, চিৎকার ও সিটি। সেটা শেষ হতে না-হতে শ্রীদেবীর স্টেজে দু-চক্কর ঘোরা হয়ে যায়। দর্শকরা একটু ঠাণ্ডা হয়ে যেন তাড়াতাড়ি দেখে নিতে চায় ফিল্মের মতই মঞ্চেও শ্রীদেবীর কাল ব্রাটা দেখা যাচ্ছে কিনা। কিন্তু নানা জায়গায় বসে নানা দর্শক একই ব্রা একই রকম ভাবে দেখবে কী করে? অথচ যে যার জায়গায় বসে ঐ ব্রাটুকুই খুঁজতে চায়–তার ওড়নার আড়াল থেকে কাল কাপড়ের সীমানায় তার গলাটুকু যে দেখা যায়। কিন্তু এ-নাচটি ত ছোটাছুটির নাচ। শ্রীদেবীর সারা স্টেজ জুড়েই ছুটছেন। ফিল্মে যেমন মনে হয়েছিল সেই হলঘর, বাগান সব কিছুর ওপর দিয়েই শ্রীদেবী উড়ে বেড়াচ্ছেন–হাওয়া খাওয়া-ই, আর তার সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চারাও সমবেত স্বরে উই-উই-উই করে উঠছে, এখানে তেমনি শ্রীদেবী পুরো মঞ্চটা জুড়ে ছুটছেন, উড়ছেন। মঞ্চের ওপরের অংশটাতে তার গোলাপি ওড়না উড়তে থাকে, উড়তে-উড়তে আবার তার কাছে চলে আসে। ফিল্মে শ্রীদেবীর ছোটাছুটিটাকে এত স্পর্শগ্রাহ্য মনে হয় নি, যদিও তার কাল ব্রাটি অনেক বেশি দৃশ্য ছিল। দর্শকরা সমবেত স্বরে বাচ্চাদের উই উই উই করে ওঠে আর শ্রীদেবী দর্শকদের দিকে ঘাড় বেঁকিয়ে বাহবা দিয়েই পরের লাইনকটি নাচেন।
ঐ দ্রুততাতেই নাচটা শেষ করে দিয়ে শ্রীদেবী মঞ্চ থেকে চলে যাওয়া মাত্রই আবার হাততালি, চিৎকার, সিটি। দর্শকরা গরম হয়ে উঠছে। চিৎকার থামে না। নানা জায়গা থেকে আওয়াজ ওঠে, সোলভা সঁওন, নগিনা, মিস্টার ইন্ডিয়া। সে সব চিৎকার থামতে না-থামতেই স্টেজের মাইক্রোফোনে একটা গানের মুখ যন্ত্রে বেজে ওঠে। একটু হতচকিত বিশৃঙ্খলা হাততালি পড়তে-পড়তেই গানের মুখটার সঙ্গে-সঙ্গে ঘাঘরা পরা শ্রীদেবী মঞ্চে লাফিয়ে ঢুকে একটা চক্কর মেরে দেন–ঘাঘরা ফুলে ওঠে, শ্রীদেবীর গায়ের চুমকি বসানো জামা ঝলসায় আর ঘোমটা হিশেবে চুলের সঙ্গে ঝোলানো ওড়না বাতাসে ওড়ে। আউলাদ আউলাদ–চিৎকার করে দর্শকরা জানিয়ে দেন যে তারা চিনতে পেরেছেন। শ্রীদেবী একটা ছোট্ট লাফে দর্শকদের দিকে মুখ করে দাঁড়ান, বা পাটা এগিয়ে দেন, ঘাঘরাটা ঘের খায়, আর শ্রীদেবী বা হাতের তালুর ওপর ডান হাতের তালু রেখেই আবার একটা পাল্টা পাক খান। আউলাদ ফিল্মের প্রথম দিকে রাস্তায় নেচে-নেচে সওদাবেচার দৃশ্য আছে। মঞ্চে রাস্তা নেই, সওদা নেই কিন্তু শ্রীদেবীর পোশাকটা এবার অবিকল ফিল্মের মতই। চুমকি বসানো জামায় আলো ঠিকরে পড়ছে। শ্রীদেবী যখন স্টেজের উইঙ থেকে উইঙে যাচ্ছেন দর্শকদের দিকে নিজের শরীরের পার্শ্বরেখাঁটিকে ধরে রেখে আর মুখটা কখনো শরীরের রেখার সঙ্গে মিলিয়ে, কখনো মুখটাকে শরীর থেকে সমকোণে দর্শকদের দিকে ঘুরিয়ে, তখন, বুকের ওপর থেকে চুমকি চমকায়, সেই চমকে সেই বুকের দোলন বোঝা যায়। দর্শকরা প্রবল হাততালিতে ফেটে পড়ে। দর্শকদের হাততালি দেওয়ার ক্ষমতা শেষ করে দিতেই যেন শ্রীদেবী আবার বিপরীত উইঙ থেকে ঘুরে আসতে শুরু করেন। দর্শকরা যেন তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী দেখে নিতে পারে, যতটা ইচ্ছে ততটা! সেই হাঁটাটুকু শেষ হয়ে গেলেই শ্রীদেবী একলাফে পেছন থেকে এগিয়ে আসেন, তার পর দুটো পাক খেয়ে স্টেজের একেবারে সামনে এসে দর্শকদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়েন। তখন সেই ফেরিওয়ালির গানের দ্রুত লয়ের সঙ্গে তাল রেখে শ্রীদেবীর বুকদুটো দর্শকদের সামনে ওঠে, নামে। দর্শকরা যেন এতটা আশাই করে নি। তারা ভুলে যায়–ফিল্মটাতে এতটাই ছিল কিনা, এ যেন ফিল্ম থেকেও বেশি। শ্রীদেবী তার নমনীয় দীর্ঘ শরীরকে আনত করে গানের তালে-তালে তালি দিতে-দিতেই উইঙ দিয়ে বেরিয়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের বেশির ভাগই উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে উঠে হাততালি দিতে দিতে প্রায় যেন নেচেই ওঠে। কেউ-কেউ চিৎকার করে শ্রীদেবীর গানটাই হাততালি দিয়ে দিয়ে গেয়ে ওঠে, কেউ-কেউ আবার সেই হাততালির সঙ্গে মিলিয়ে নেচে ওঠে। সেখানে নাচের সঙ্গে-সঙ্গে আবার হাততালি পড়তে থাকে। মনে হয়, অনুষ্ঠান যেন ভেঙেই গেল। কিন্তু এই সবই হতে থাকে প্যান্ডেলের ভেতরে, প্যান্ডেল থেকে কেউ বাইরে যায় না। রাজবংশী মেয়েদের ভেতর কেউ-কেউ খানিকটা বিহ্বল হয়ে দর্শকদের এই হাততালি, গান আর নাচ দেখতে থাকে। তাদের চোখেমুখে, ভয় যদি নাও হয়, একটু অনিশ্চয়তা দেখা যায় যেন। মঞ্চে আলোেগান, নাচ–এটা তারা বুঝতে পারে। কিন্তু দর্শকদের নাচ-গান বুঝতে পারে না। বরং চা বাগানের মদেশিয়া মেয়েরা দর্শকদের নাচ দেখে খিলখিল হেসে এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ে; তাদের মধ্যে কেউ-কেউ হাততালিও দিয়ে ফেলে।
