বোধ হয়, এ-ধরনের অনুষ্ঠান নানা জায়গায় নানা ধরনের সমাবেশে করতে করতে অনুষ্ঠানের প্রধান শিল্পী, যিনি পয়লা নম্বরের ফিল্মস্টার ও হিন্দি ফিল্মে যাকে যৌন বিষয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়, একটা পদ্ধতি-প্রক্রিয়া তৈরি করে ফেলতে পেরেছেন। তাই তার প্রথম চেষ্টা হয়, তাকে ঘিরে দর্শকদের মধ্যে যদি কোনো জ্বরের মত তাপ তৈরি হয়ে থাকে, সেটাকে নষ্ট করা।
স্টেজটার পর্দা খুলে যাওয়ার পর ধীরে-ধীরে খুব কম আলো দর্শকদের বাঁ দিক থেকে স্টেজের পেছনে দর্শকদের ডান দিকে পড়ে। পুরো স্টেজটা কিছুক্ষণ খালি পড়ে থাকে শুধু এই গবাক্ষ পথে আসা আলোটুকু নিয়ে। সেই সময়টুকু জুড়ে দর্শকরা ধীরে-ধীরে চুপ করতে থাকে ও যে যার দেখার রাস্তা ঠিক করে নেয়। ঠিক যখন মনে হতে শুরু করেছে যে স্টেজে দেখার কিছু নেই তখনই একটি ঘুঙুরের আওয়াজ শোনা যায়। তারপর একটি মেয়ের প্রবেশ অনুসরণ করতে করতে বোঝা যায় স্টেজে এতক্ষণে আবছা একটা আলোও ফুটে উঠেছে যে-আলোতে মেয়েটি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। মেয়েটিকে দেখেই প্যান্ডেলে শ্বাসপতনের আওয়াজ হয়। কিন্তু এই দর্শকদের ভেতর ত এমন কয়েক হাজার আছে। যারা শ্রীদেবীর দৈর্ঘ্য জানে, শ্রীদেবীর হাটার ছন্দ চেনে। তাদের প্রতিক্রিয়াতে বাকি সবাই মুহূর্তে বুঝে যায়, এ মেয়েটি শ্রীদেবী নয়। কিন্তু সেই জানাটুকুসহই সবাই দেখে মেয়েটি সেইখানে হাঁটু গেড়ে বসে যেখানে এতক্ষণ আলো ফেলে রাখা হয়েছিল। সে একটা দেশলাই কাঠি জ্বালে, তাতে একটি প্রদীপ জ্বলে ওঠে, স্টেজের আলো একটু বেড়ে যায় আর দেখা যায় মেয়েটি নটরাজের ছোট মূর্তির সামনে প্রদীপ জ্বালাচ্ছে। প্রণাম সেরে মেয়েটি প্রায় পূর্ণ আলোকিত মঞ্চ ছেড়ে চলে যায়, ঘুঙুরের আওয়াজ তুলতে-তুলতেই। আর, সে-আওয়াজ মিলিয়ে যেতে দেয়া হয়। কিন্তু সম্পূর্ণ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আর-একটা ঘুঙুরের আওয়াজ স্পষ্ট হতে থাকে–কেউ হেঁটে আসছে। দর্শকদের বা দিক থেকে স্টেজের একেবারে সামনে দিয়ে ঢুকে শ্রীদেবী দর্শকদের দিকে একবারও না তাকিয়ে কোনাকুনি স্টেজটা হেঁটে পার হয়ে গেলেন স্টেজের পেছনে দর্শকদের ডান হাতি কোণে, যেখানে প্রথমে আলো পড়ে ছিল অনেকক্ষণ, পরে, প্রদীপ জ্বালানো হয়েছিল। সেখানে শ্রীদেবী হাটু গেড়ে বসে কোমর থেকে মাথা মাটির ওপর হেলিয়ে নটরাজকে প্রণাম করেন। তাঁর প্রণামের ভঙ্গি জুড়ে, স্টেজের আলো কমে আসে কিনা বোঝা যায় না, কিন্তু তার লম্বা পিঠটুকু জুড়ে একটা অতিরিক্ত আলো মাথা দিয়ে গলে হাতটুকু দিয়ে মাটিতে মিশে যায়। লম্বা বেণীটা তার গলা থেকে ডাইনে দর্শকদের দিকেই পড়ে থাকে।
ফিল্মে-ফিল্মে যারা শ্রীদেবীকে চেনে, তারা তার এই হাঁটার ভঙ্গি, তার ডান হাতটা হাঁটার সময় কনুইয়ের কাছে একটু ভাজ ফেলে যে শরীরের বাইরে থাকে, তার শরীরের উর্ধাঙ্গ যে হাঁটার তালে-তালে একটু-একটু দোলে, তিনি প্রণাম করার সময় যে এরকম বেণী লুটিয়েই প্রণাম করেন–এ-সবই চেনে। ফলে শ্রীদেবী ঢোকামাত্র তারা শ্বাস বন্ধ করে প্রায় মিলিয়ে নেয় ফিল্মের প্রাণহীন শরীরের চলাফেরা এই প্রাণময় শরীরে সবটুকুই উপস্থিত।
প্রণাম সেরে উঠে শ্রীদেবী স্টেজের মাঝখানে এসে দাঁড়াতে-দাঁড়াতে ঘাড়ের একটা ভঙ্গিতে লম্বা বেণীকে পিঠে ফেলেন–এ ভঙ্গিটাও কতবার চেনা। তখন স্টেজের সব আলো জ্বলে উঠেছে, একটুও ছায়া নেই। শ্রীদেবী দুই হাতে নমস্কার করে একটু হাসেন। সেই হাসিটা সহই তিনি দর্শকদের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে তাকানবায়ে, ডাইনে, বায়ে, ডাইনে ও নমস্কার করেন। শ্রীদেবীর দিঘল চেহারার ওপর ছোট মুখটাতে ছোট ঠোঁটে হাসিটা খুব খোলামেলা নয়। কিন্তু এই যে-হাসিতে মুখটা ছড়িয়ে যায় না, সেই হাসিটাতেই তিনি তার দর্শকদের এত পরিচিত। সেই পরিচয়ের কথা মনে পড়িয়ে দিতেই শ্রীদেবী তার খুব পরিচিত আর-একটা ভঙ্গিতে মাথাটাকে একটু হেলান, কপালে কয়েকটা ভাজ ফেলেন, যেন ঐ ভঙ্গি দিয়ে দর্শকদের জানাতে চাইছেন, আরে, আমিই, আমিই। দর্শকরা হাততালি দিয়ে ওঠেন, হাততালি যেন থামতে চায় না। শ্রীদেবী দুই হাত ওপরে তুলে থামাতে বললে হাততালি আরো বেড়ে যায়। তখন তিনি দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে ছোট্ট একটা কাধঝাঁকুনি দেন—-মিস্টার ইন্ডিয়াতে এরকম কাঁধঝাঁকুনি তিনি প্রায়ই দিয়েছেন। দর্শকদের হাততালি বেড়ে ত যায়ই, তার সঙ্গে হাসি মেশে, বেশ উচ্চকিত হাসি। যেন তারা এতক্ষণে পেয়ে গেছে, ছবিতে-ছবিতে তাদের এত পরিচিত নায়িকাটিকে পেয়ে গেছে। আর এটাই যেন শ্রীদেবীর প্রাথমিক দায় ছিল–দর্শকদের চেনা ফিল্মের শ্রীদেবীর সঙ্গে নিজেকে মেলানো। তারপরই তিনি স্টেজ থেকে চলে যান। হাততালিও ধীরে ধীরে কমে আসে। সম্পূর্ণ থেমে যাবার আগেই মাইকে একটু গম্ভীর গলায় ঘোষণা করা হয় যে শ্রীদেবী প্রথমে আপনাদের সামনে ভরতনাট্যম পেশ করবেন। এই ঘোষণার সঙ্গে-সঙ্গেই মাইকে সংস্কৃত শ্লোক আবৃত্তি শুরু হয় আর শ্রীদেবী মাথায় মুকুট পরে পোশাক সামান্য বদলে মঞ্চে ঢোকেন।
শ্রীদেবী প্রথম প্রবেশ, নটরাজ প্রণাম ও নমস্কারের নানা ভঙ্গির মধ্যে দিয়ে দর্শকদের স্মৃতি জাগিয়ে দিয়েছিলেন, এবার ভরতনাট্যমের নানা ভঙ্গি দিয়ে স্মৃতির সেই পরিচয় নষ্ট করতে লাগলেন। কোনো-কোনো ফিল্মে শ্রীদেবী ভরতনাট্যম নেচেছেন হয়ত, কিন্তু দর্শকদের সঙ্গে তিনি তার ভরতনাট্যম দিয়ে বাধা নন, যেমন ছিলেন একসময় বৈজয়ন্তীমালা, বা তার পরে এমনকি হেমামালিনীও। ফলে ভরতনাট্যমের নান্দীমুখ থেকেই যতই তিনি অভিনয়ের প্রবলতার মধ্যে ঢুকছিলেন ও মাইকের তবলা-মৃদঙ্গবাদ্য ও বোলের সঙ্গে-সঙ্গে নিজের ক্ষমতার জোর দেখাচ্ছিলেন, ততই এই দর্শকদের মধ্যে তার সম্পর্কে সম্ভ্রম তৈরি হচ্ছিল। প্রথম পরিচয়ে নিজেকে দর্শকদের কাছে তাদের পরিচিত নায়িকা হিশেবে প্রতিষ্ঠিত করে প্রথম কর্মসূচিতেই তিনি নিজেকে আলাদা করে নেন। সিনেমায় তাকে একই নাচের রকমফেরে বারবার দেখে-দেখে, তার শরীরের নানা প্যাঁচঘোচ বারবার দেখে-দেখে যে-দর্শক তার যৌনতাকেই প্রধানত বা একমাত্র চিনে নিয়েছে, সেই দর্শক এই ভরতনাট্যম দেখে হতাশ হবে। ভরতনাট্যমটা বেশ খানিকক্ষণ ধরেই হয়। কিন্তু কোনো সময়ই একঘেয়ে হয় না–শ্রীদেবী এতই পরাক্রমে আলোময় স্টেজটাকে দখল করে রাখেন। সেই পরাক্রম দেখানোর সময় তিনি যেন প্রতিশোধের মত করে দর্শকের মধ্যে তার সম্পর্কে যা কিছু স্মৃতি আছে সব কিছুকে মুছে দেন-যে-শ্রীদেবীকে তোমরা দেখো আমি সে শ্রীদেবী নই।
