পুলিশের নাম শুনেই লোকজন ঠেলাঠেলিটা বন্ধ করেছিল। টিকিট তাড়াতাড়ি দেখে দেয়ার নির্দেশে লোজন যেন আশ্বস্ত হয় যে পুলিশ তাদের তাড়াতাড়ি প্যান্ডেলের ভেতরে ঢোকাতেই ব্যস্ত।
ডি-এস-পি সাহেব পুলিশের গাড়ি থেকে নেমে আবার সেই জটলার কাছে আসেন–ব্লক অফিসের ক্যালভার্টের ওপরে যেখানে তিন দিক থেকে আসা লোকজন মিলছে। সেখানে ইতিমধ্যে আরো দু-জন সেকেন্ড অফিসার এসে গেছেন। তারা তিনদিকের লোকজনকে একটা লাইনে ফেলে ছাড়ছেন আর মাঝে-মাঝে এক-একদিকের লোক আটকাচ্ছেন। ডি-এস-পিকে দেখে একজন বলে ওঠেন, স্যার, স্যার, এখনো এত লোক বাইরে, যদি তাড়াতাড়ি না ছাড়ে তা হলে ত এখানে আটকে যাবে।
ডি-এস-পি বলেন, দাঁড়াও, আমি গেছে দেখছি, দাঁড়াও, আমি এসে বলছি। ডি-এস-পি ঐ লাইনের পাশ দিয়ে, ভেতর দিয়ে, মাঠের মধ্যে পৌঁছে যান। তিনি সবচেয়ে শেষের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতে গেলে গেটের ছেলেটি তাকে না দেখে আটকায় আর গেটের কনস্টেবলটি ছেলেটির হাত তুলে দেয়। ছেলেটি দেখেই সরি স্যার জিভ কাটে। তাড়াতাড়ি করুন, তাড়াতাড়ি করুন, বলে ডি-এস-পি ভেতরে ঢোকেন জায়গার অবস্থা দেখতে। তাকে দেখে নকুল রায়, বটুক বর্মন ছুটে আসে।
শুনুন, আপনারা আমাদের যা একাউন্ট দিয়েছেন তার বাইরে কোনো টিকিট বাজারে ছাড়েন নি ত? ডি-এস-পি জিজ্ঞাসা করেন।
না, স্যার। একথা জিগেস করছেন কেন স্যার? নকুল বলে।
না, না, অন্য কারণে না। বাইরে লোক ত দেখেছেন, এ্যাকমোডেশন হয়ে যাবে ত?
হ্যাঁ, স্যার এখনো ত অর্ধেক প্যান্ডেল খালি স্যার। আমরা ত স্যার আপনাদের স্কোয়ার ফুটের হিশেব দিয়েছি স্যার, প্ল্যান জমা দিয়েছি স্যার।
আরে মশাই, সে-সব আপনাদের কে জিগেস করছে। বাইরে লোকজন একটু ইমপেশেস্ট হয়ে পড়তে পারে, কত দূর-দূর থেকে এসেছে, তাই বলছিলাম আপনারা জায়গার তুলনায় যদি আমাদের গোপন করে বেশি টিকিট ছেড়ে থাকেন তবে কিন্তু কেলেংকারি হবে। আপনাদের ত সিট নাম্বার নেই? ডি-এস-পি বলেন।
না স্যার, আপনাকে সত্যি বলছি স্যার আপনাদের যা বলেছি সেই টিকিট ছেড়েছি স্যার। এ রিস্ক স্যার কে নেবে? নকুল প্রায় ডি-এস-পির হাত ধরে। ডি-এস-পি বলেন, তা হলে টিকিট পাঞ্চ করছেন কেন? প্রত্যেককে টিকিট হাতে তুলে দেখিয়ে ঢুকে যেতে বলুন–তা হলে দেখবেন বাইরের প্রেসারটা কমে যাবে।
নকুল বটুকের দিকে তাকায়। বটুক বলে, স্যার, ভেতরে ঢুকে যদি টিকিট বাইরে পাঠিয়ে দেয়?
আরে, কেউ ঢুকতেই পারছে না মশাই আর টিকিট বাইরে পাঠিয়ে দেবে? আমরা এ্যানাউন্স করে দিচ্ছি কাউকে বাইরে বেরতে দেয়া হবে না। আপনারাও এ্যানাউন্স করে দিন।
আপনারাই যা করার করেন স্যার। আমাদের ত স্যার স্টেজে উঠতেই দেবে না। নকুল বলে।
কে দেবে না?
স্টেজ ত এখন স্যার শ্রীদেবীর কন্ট্রোলে, কাউকে ঢুকতে দেবে না স্যার, বটুক বোঝায়। ডি-এস-পি হেসে বলেন, আপনাদের এখান থেকে শ্রীদেবীর কী দেখা যাবে আর?
থার্ড ক্লাশ থেকে স্যার এর বেশি দেখা যায় না, নকুল হে-হে করে হাসে। ডি-এস-পি বলেন, তা হলে গেটকে বলে দিন শুধু টিকিটটা তাকিয়ে দেখে ছাড়তে, আমরা বাইরে মাইকে বলে দিচ্ছি।
নকুল, বটুক আর ডি-এস-পি বাইরে বেরিয়ে যান। ডি-এস-পি আবার লোকজনের ভেতর দিয়ে-দিয়ে পথ করে নিয়ে রাস্তায় উঠে যান। তারপরই মাইকে শোনা যায়, পুলিশের পক্ষ থেকে বলছি। যারা গেটে টিকিট পাঞ্চ করছেন তারা টিকিট পাঞ্চ করবেন না। দর্শকদের হাতে টিকিট দেখে ছেড়ে দিন। এই ঘোষণার সঙ্গে-সঙ্গে একটা আওয়াজ ওঠে। সেটা থেমে গেলে মাইকে আবার শোনা যায়, দর্শকদের কাছে অনুরোধ। আপনারা আপনাদের হাতে টিকিটটা উঁচু করে ধরে নির্দিষ্ট গেট দিয়ে প্রবেশ করুন যাতে যারা টিকিট দেখছেন, তারা দেখতে পান। এই ঘোষণার সঙ্গে-সঙ্গে আবার একটা সমবেত আওয়াজ ওঠে–সমর্থনের। মাইকে শোনা যায়, লাইন ভাঙবেন না, হুড়োহুড়ি করবেন না, নিজের টিকিট নিজের হাতে উঁচু করে ধরে নির্দিষ্ট গেট দিয়ে প্যান্ডেলে ঢুকুন। প্যান্ডেলে ঢোকার পর কাউকে বেরতে দেয়া হবে না। মনোযোগ দিয়ে শুনবেন, প্যান্ডেলে ঢোকার পর কাউকে বেরতে দেয়া হবে না।
এই ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই লাইনটি বেশ তাড়াতাড়ি এগতে থাকে। ঘোষণার পর লোকজনের মধ্যে দু-ধরনের ব্যস্ততা দেখা যায়। বড়বড় দলে যারা এসেছে বা শুধু বাড়ির লোকজন নিয়েও যারা এসেছে, তারা সব টিকিট একজনের কাছে জমা রেখেছিল। এই ঘোষণা শুনে যার-যার টিকিট তার-তার হাতে দেয়া শুরু হয়ে যায়। এত হাজার-হাজার লোকের হাতে টিকিট বিলি একটা ঘটনা ত বটেই। আর, প্যান্ডেলে ঢুকলে আর বেরতে দেয়া হবে না শুনে হঠাৎ-হঠাৎ লাইন ভেঙে পেচ্ছাব করতে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পড়া বা বসে পড়া শুরু হয়। এত হাজার-হাজার মানুষের মধ্যে এ-হিড়িক পড়লে সেটাও একটা ঘটনা বটে।
.
১৭৮. শ্রীদেবী : চেনা ও অচেনা
শ্রীদেবীর নাচের অনুষ্ঠানটা শুরু হয়ে যায় কিন্তু খুব সহজ ভাবে। শুরুর ধরন দেখে মনেই হয় না যে এই অনুষ্ঠানের জন্যে গত মাস দুই ধরে এত প্রচার, বাংলা-বিহার-আসাম জুড়ে দর্শকদের আসার নানা আয়োজন, প্রায় মাসখানেক ধরেই রাজনৈতিক স্তরে ও প্রশাসনের স্তরে মিটিঙ, কলকাতা থেকে মন্ত্রীদের আসা আর এখন এই প্রায় লক্ষ দর্শকের উপস্থিতি। অনুষ্ঠানের শুরু দেখেই হতাশ হওয়ার জন্যে ত এত দর্শক আসে নি, তাই দর্শকরা হতাশ হয় না নিশ্চয়ই। শুরু থেকেই এই সমস্ত দর্শক শ্রীদেবীকে তাদের মধ্যে পেয়ে যাবে–এমন একটা আবহ হয়ত আলাদা-আলাদা ভাবে কোনো-কোনো দর্শকগোষ্ঠীর মধ্যে ছিল। কিন্তু এই প্যান্ডেলের ভেতর বসার পর দেখা যায় দর্শকদের একটা বেশ বড় অংশই রাজবংশী ও চা বাগানের মদেশিয়া। এদের মধ্যে শ্রীদেবী সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট প্রত্যাশা ছিল না, ফলে শুরু দেখে তারা হতাশ হয় নি। সেই কারণে, অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই প্যান্ডেলটা চুপ করে যায়। সেই নীরবতার মধ্যে কিছু সম্ভ্রমও ছিল।
