.
১৭৭. শ্রীদেবীর আগমনের প্রতিক্রিয়া
শ্রীদেবী যে এসেছেন এটা বোঝার আগেই শ্রীদেবী গ্রিনরুমের ভেতরে কয়েকটা কোল্যাপসিবল গেটের আড়ালে চলে যান। শুধু সবচেয়ে বাইরের কোল্যাপসিবল গেটটায় শ্রীদেবীর ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের সঙ্গে উত্তরখণ্ড সম্মিলনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কর্মকর্তাদের একজন দাঁড়িয়ে থাকেন–ভেতরে ও বাইরে আর-সর্বত্রই শ্রীদেবীরই লোকজন। গ্রিনরুমের বা স্টেজের প্রধান দরজা প্যান্ডেলের যে-পুব দিকে সেদিক দিয়ে প্যান্ডেলের ভেতরে ঢোকার কোনো পথ নেই। বাইরের বড় রাস্তার নীচের নালার ওপরে যে-কালভার্টটা দুদিনের মধ্যে বানাতে হয়েছে সেটা দিয়ে শুধু এই পুব দিকটাতেই আসা যায়। এখন এই পুব দিক দিয়ে গিয়ে স্টেজ-গ্রিনরুমের পেছন দিয়ে ঘুরে আবার প্যান্ডেলের পশ্চিমে যাওয়া যায় বটে কিন্তু সেটা অনেক ঘুরপথ। একটা গাড়ি রাস্তার দিকে মুখ করে গ্রিনরুমের প্রধান কোল্যাপসিবল গেটের সঙ্গে লাগানো। আর একটা যে-ছোট গেট আছে গ্রিনরুম থেকে বেরবার, ঠিক এর বিপরীত দিকে, সেখানেই বাকি দুটো গাড়ি পার্ক করা। কয়েকটি পুলিশ ও একজন অফিসার গোছের ভদ্রলোক এই পুরো এলাকাটাতে ঘোরাফেরা করছে।
গাড়ি তিনটি ও পুলিশের গাড়িটি এই ক্যালভার্ট দিয়ে ঢুকে যাবার ও লোকজন নেমে যাবার পর সারা রাস্তায় একসঙ্গে আওয়াজ ওঠে–এসে গেছে, এসে গেছে, শ্রীদেবী এসে গেছে। শ্রীদেবী ঐ ভিড়ের মধ্য দিয়েই এসেছেন, পুলিশের গাড়ি সাইরেন বাজিয়েছে, লোকজন তাড়াতাড়ি সরে গিয়ে জায়গাও দিয়েছে–কিন্তু তখন তারা বুঝতে পারে নি যে শ্রীদেবীই আসছেন। কারণ, এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দর্শক হিশেবে আসার পর থেকে লোকজনকে আজ যে-অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে সে-অভিজ্ঞতা তাদের আগে কখনো হয় নি। ফলে, ময়নাগুড়িতে পৌঁছুনোর পর শ্রীদেবী ব্যাপারটি আর তাদের কাছে প্রধান ছিল না, তাদের কাছে প্রধান হয়ে ওঠে এই ব্যবস্থাটিই। কোথায় বাস বা ট্রাক দাঁড়াবে, কোথায় নামতে হবে, কখন হাঁটতে হবে, কোথা দিয়ে হাঁটতে হবে, কোথা দিয়ে ঢুকতে হবে ইত্যাদি। শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থাটা এমনই প্রাধান্য পেতে থাকে যে লোকজন যেন ভুলেই যায় তারা এখানে একটা বিশেষ অনুষ্ঠানে এসেছে–মাত্র গান শুনতে আর নাচ দেখতে। এ যেন হয়ে দাঁড়ায় সারা দেশের খুব বড় কোনো নেতার মিটিঙ শুনতে আসার মত ব্যাপার। বাড়ি থেকে বেরনো আর বাড়িতে ফেরা পর্যন্ত সমস্তটাই ঐ মিটিঙের উদ্যোক্তাদের ব্যাপার–তার সঙ্গে মিছিলের বা মিটিঙের লোকের কোনো সম্পর্ক নেই। যে রাস্তায় আজ যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ সে রাস্তায় যখন তিন-তিনটি গাড়ি ও পেছনে-পেছনে একটা পুলিশের গাড়ি একই গতিতে ছুটে আসে আর লোকজনকে মুহূর্তে সরে গিয়ে জায়গা করে দিতে হয়, তখন সে-গাড়িতে আর-কে থাকতে পারে, একমাত্র সেই ব্যক্তি ছাড়া যার জন্যে এই রাস্তায় বাকি যানবাহন আজ নিষিদ্ধ, যার জন্যে এই রাস্তায় শুধু মানুষ আর মানুষ? এই সোজা হিশেবটি আর মানুষের মাথায় ঢোকে না।
কিন্তু একবার যখন রটে যায় যে শ্রীদেবী এসে গেছেন, তখন রাস্তায় একটা হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। রাস্তায় এমনিতে কোনো লাইন ছিল না–সকলেই যে-যার মত হেঁটে যাচ্ছে। প্রায় সব রাস্তাই কার্যত ওয়ান ওয়ে হয়ে গেছে বলে লোকজনের কোনো ধাক্কাধাক্কিও নেই। আসামের রাস্তার লোকজন আসছে পুব থেকে পশ্চিমে। তিস্তাব্রিজের রাস্তার লোকজন আসছে পশ্চিম থেকে পুবে। আর ডুয়ার্সের রাস্তায় লোকজন আসছে উত্তর থেকে দক্ষিণে।
কিন্তু সবাইকেই ত ব্লক অফিসের ক্যালভার্টটা দিয়ে সম্মিলনের মাঠে ঢুকতে হচ্ছে। সম্মিলনের তিনটি গেট থেকে লাইন রাস্তায় বহু দূর পর্যন্ত গেছে। রাস্তার লোকজনকেও লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। ফলে রাস্তায় যারা হেঁটে একমুখো আসছে তারাও আসলে পাঁচ-ছ জনের সারির একটা লাইনেই থাকে। শ্রীদেবী এসে গেছে রটে যাওয়ার পর রাস্তার ওপরের এই লাইনগুলোতে ঠেলাঠেলি পড়ে যায় যেন, এখানে ঠেলাঠেলি করলে তাড়াতাড়ি প্যান্ডেলের ভেতরে ঢুকে যাওয়া যাবে।
এত মানুষ যেখানে সেখানে সামান্য ঠেলাঠেলিতেই একটা হুল্লোড় বেধে যায়। কিন্তু প্যান্ডেলের কাছে ও রাস্তায় পুলিশ অফিসাররা খুব দৌড়োদৌড়ি করছিলেন। এক জায়গায় একটু ধাক্কাধাক্কি শুরু হতেই তারা তিনজন ব্যাটনগুলো ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে লোকজনকে ঠেকিয়ে দেন, তারপর ঠেলে একটু সরিয়েও দেন। ডি-এস-পি সাহেবও সেখানে পৌঁছে যান। তিনি জিজ্ঞাসা করেন–পুলিশের মাইকটা কোথায়?
সে ত পেট্রল পাম্পে স্যার, ঐ দিকে।
ডি-এস-পি নিজেই দৌড়ে চলে যান। এ-দিকের ধাক্কাধাক্কিটা অবিশ্যি থেমে যায়–লোকজন আবার চলতে শুরু করে। একটু পরে মাইকে শোনা যায়–পুলিশের পক্ষ থেকে বলছি। আপনারা হুড়োহুড়ি করবেন না। লাইন ভাঙবেন না। লাইন রাখুন। আপনারা প্রত্যেকে নিজেদের জায়গায় বসার আগে অনুষ্ঠান শুরু হবে না। আপনারা ঠেলাঠেলি করলে আপনাদেরই ঢুকতে দেরি হবে। এরপর গলাটা একটু ওঠে, প্রায় চিৎকার করে বলা হয়, গেটে যারা টিকিট চেক করছেন তারা তাড়াতাড়ি কাজ করুন, দেরি করবেন না, রাস্তায় ভিড় জমে যাচ্ছে, গেটে যারা টিকিট চেক করছেন তারা তাড়াতাড়ি কাজ করুন, দেরি করবেন না, রাস্তায় ভিড় জমে যাচ্ছে।
