ট্রাক, বাস, গাড়ি পার্কিঙের জায়গায় খাবারের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে, তার সঙ্গে মিশে আছে একটু-আধটু মদের গন্ধও। কিন্তু খাবারের গন্ধ এত জটিল যে মদের গন্ধটাও তার সঙ্গে মিশে গেছে–আলাদা করা যাচ্ছে না। অথচ আওয়াজগুলোকে আলাদা করা যাচ্ছে। মেলার মত খুব হৈ-হৈ নেই–মানুষজন নিজেদের ভেতরই কথা বলছে। সে-আওয়াজ আরকতটা দূরেই বা যেতে পারে। দোকানপাটের চিৎকার নেই, গাড়িঘোড়ার আওয়াজ নেই। মানুষজনের গলার স্বরের সঙ্গে ভেসে বেড়াচ্ছে ক্যাসেটে শ্রীদেবীর সব বিখ্যাত গান। ক্যাসেট প্লেয়ারগুলো কাঁধে বা হাতে ঝুলিয়ে লোজন চলাফেরা করছে বলে এক একটা গানের সঙ্গে অন্য গান চকিতে মিশে আবার আলাদা হয়ে যাচ্ছে। কোনো-কোনো ক্যাসেটে অন্য গানও বাজছে। কেউ-কেউ খালি গলায় এই সব গানের সঙ্গে গলায় মেলাচ্ছে। কিন্তু তবুও কোনো হট্টগোল তৈরি হচ্ছে না। এমনকি ক্যাসেটও কেউ যেন খুব জোরে বাজাচ্ছে না। কিংবা, হয়ত জোরে বাজানো সত্ত্বেও এতটা বড় জায়গা ও এত মানুষজনের ফলে আওয়াজগুলো চাপা পড়ে থাকছে। এত মানুষজন, এত গাড়িঘোড়ার সঙ্গে আজকাল মাইকের আওয়াজটা এমন অভ্যস্ত হয়ে গেছে, যে, শুধু মাইকটা না-থাকার ফলেই মনে হচ্ছে সব কেমন চুপচাপ।
এই হাজার-হাজার মানুষ অপেক্ষাকৃত শান্ত অনুত্তেজিত হয়ে ঘোরাফেরা করছে, ধীরস্বরে ক্যাসেট বাজিয়ে যাচ্ছে, খাওয়াদাওয়া-তাসখেলার মধ্যেও একটু আনমনা হয়ে আছে, চায়ে বা মদে গলা একটু ভেজালেও তাতে কখনোই মজে যাচ্ছে না, তার কারণ, এই হাজার-হাজার মানুষ একটা স্থায়ী ও অনাটকীয় প্রত্যাশার আবহের ভেতরে ঘোরাফেরা করছে। যদি সম্পূর্ণ অজ্ঞাত কোনো কিছু নিয়ে গড়ে উঠত, তা হলে সেই প্রত্যাশাটাকে এতটা ধীর ও নিশ্চিত লয়ে তাতিয়ে তোলা যেত না–একটা অনিশ্চয়তার উদ্বেগে সে-প্রত্যাশা ফেটে পড়ত। কারণ, শ্রীদেবী এই ভিড়ের প্রায় কারো কাছেই অপরিচিত নয়। শ্রীদেবীর ফিল্ম দেখে, নাচ দেখে এই ভিড় আজকের অনুষ্ঠানে কী দেখতে পারে তা নিশ্চিতভাবেই জানে। এমন-কি, এই ভিড় তার সেই দেখা ও চেনা শ্রীদেবীকেই রক্তমাংসে দেখতে চায়। এমন-কি, যেন শ্রীদেবী যদি এই রাস্তা দিয়ে খোলা গাড়ির ওপর দাঁড়িয়ে চলে যায়, তাতেও এই ভিড়ের অনেকটা তৃপ্তি ঘটবে এটুকু জেনে যে শ্রীদেবীর একটি রক্তমাংসের শরীর আছে। শ্রীদেবী তার রক্তমাংসের শরীর নিয়েই এই সব মানুষের কাছে পরিচিত। সেই রক্তমাংসের শরীর থেকে যে-যৌনতা সিনেমাহলের অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়ে এই ভিড় সেই যৌনতার টানেই এসেছে। এই ভিড়ের যেন এরকম একটা কাণ্ডজ্ঞানও আছে যে, ছবি থেকে বিচ্ছুরিত যৌনতার একটা মানবিক উৎস আছে এটুকু জানাই যথেষ্ট। কিন্তু সেই কাণ্ডজ্ঞানেরও সীমা একটা খুব শিথিল আছে। এই ভিড়ের ভেতর এমন একটা অসম্ভবের প্রস্তুতিও যেন থাকে যে সিনেমার পর্দা ছাড়াও মঞ্চের বাস্তবতায় রক্তমাংসের শ্রীদেবীকে দেখা ত তার ঐ সিনেমা হলের অভিজ্ঞতারই সম্প্রসারণে, তেমনি, হতেও ত পারে শ্রীদেবীর রক্তমাংসের শরীরকে ছুঁয়ে ফেলা যাবে বা, প্রায় ছুঁয়ে ফেলা যাবে। সিনেমার পর্দায় শ্রীদেবীর বাহুমূলের ভাঁজ বা পিঠের তিনকোনা হাড়ের ওপরকার পেশীর কম্পন পর্যন্ত যার চেনা, সে সেই শরীরটাকে অতটা স্পর্শাতীত নাও ভাবতে পারে–যদি সুযোগ পাওয়া যায়। তাই এই ভিড়ের শান্ত বা অনুত্তেজ প্রত্যাশার ভেতরে একটা হিংস্রতার ইচ্ছাও যে মিশে থাকে না তা নয়। এতটা শান্ত ও অনুত্তেজিত না থাকলে সেই হিংস্রটাও অনুমান করা যেত না।
অথবা, সে-হিংস্রতাটাকে সব সময়ই সত্য বলে ধরে নেয়া হয়।
তাই, পুলিশের পরামর্শ অনুযায়ীই শ্রীদেবী শিলিগুড়ির হোটেল থেকে তার তিন গাড়ি নিয়ে জলপাইগুড়ি হয়ে তিস্তা ব্রিজ দিয়ে ময়নাগুড়িতে এলেন না। কারণ, এই রাস্তা দিয়েই দর্শকরা আসছে। যে-কোনো জায়গায় গাড়ি আটকে যেতে পারে, মানুষজন শ্রীদেবীকে চিনে ফেলতে পারে। শ্রীদেবী ময়নাগুড়িতে এলেন শেবক ব্রিজ হয়ে, ওদলাবাড়ি পার হয়ে, চালসার মোড় দিয়ে, লাটাগুড়ির ওপর দিয়ে। কারণ এই রাস্তাতেই দর্শকদের গাড়ি সবচেয়ে কম, যা আসছে তাও চা বাগানেরই। রাস্তাটাও একটু চওড়া, অনেকটা পাহাড়, ফরেস্ট ও চা বাগান। ফলে হঠাৎ চিনে ফেললেও লোকজন জমে যাওয়ার ভয় ততটা নেই।
শ্রীদেবীর তিনটি গাড়ির প্রথমটিতে তার দেহরক্ষীরা, দ্বিতীয়টিতে তিনি নিজে এবং হয়ত আর-কেউ। সে-গাড়ির কাল কাঁচ তুলে দেয়া। তৃতীয়টিতে তার অন্যান্য সহকারীরা, যারা যন্ত্রপাতি বাজাবে, যারা মেক-আপ দেবে। এই তিন গাড়ি থেকে একটু দূরত্ব রেখে পুলিশের একটা জিপও ছিল।
ময়নাগুড়ির কাছাকাছি এসে পুলিশের গাড়ি আর-দূরে থাকে না–প্রথম গাড়িটার আগে-আগেই চলে। ময়নাগুড়ির রাস্তায় তখন হাজার-হাজার লোক চলছে। পুলিশের গাড়িটা সাইরেন বাজিয়ে দেয়। সেই উচ্চকিত সাইরেনের আওয়াজের সঙ্গে মিলে চার-চারটি গাড়ির হেডলাইট এই রাস্তাভর্তি মানুষজনের গায়ের ওপর হামলে পড়ে। আর, এত মানুষজন এত বেগে রাস্তার দু পাশে ছিটকে যায় যে পাড়িগুলোকে কোথাও বেগ কমাতেই হয় না। চার-চারটি গাড়ি সেই একই বেগে অনুষ্ঠানের জায়গায় এসে নতুন তৈরি ক্যালভার্ট দিয়ে প্যান্ডেলের বা পাশে একেবারে গ্রিনরুমের গেটের সামনে গিয়ে পৌঁছয়। পুলিশের গাড়িটা সরে যায়, তার পেছনে প্রথম গাড়িটাও সরে যায়। দ্বিতীয় কাতোলা গাড়িটা এগিয়ে আসে। তৃতীয় গাড়ির দরজা খুলে কয়েকজন নামে, নেমে দাঁড়িয়েই থাকে। কেউ বুঝতেই পারে না দ্বিতীয় গাড়িটার দরজা খুলে শ্রীদেবী কখন কোল্যাপসিবল গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে গেছেন। গাড়িগুলো থেকে তখন নানা যন্ত্রপাতি নামাচ্ছে নানা লোক।
