তিস্তা ব্রিজের দিক থেকে প্রাইভেট গাড়ি ও ট্যাক্সি অনেক বেশি আসতে থাকে। তারা ঐ মাঠে নামতে অস্বীকার করে আর ঐ মাঠে নেমে অতটা হেঁটে যেতেও তাদের আপত্তি। সেখানেও বেলা চারটে নাগাদ বেশ একটা গোলমাল পেকে ওঠে। ডি-এস-পি সাহেবকেও আসতে হয়। যারা ডি-এস-পি সাহেবের সঙ্গে কথা বলেন তারা অনেকেই দার্জিলিং, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ির ব্যবসায়ী বা চাকুরে। কলেজের শিক্ষকরাও দুটো ট্যাক্সিতে এসেছে। ব্যাপারটা পাকিয়ে ওঠার আগেই ডি-এস-পি বলে দেন, দেখুন, ট্রাক, বাস বা মিনিবাসকে এখানে নামতে হবেই, প্রাইভেট গাড়ি ও ট্যাক্সির জন্যে সামনে একটা পয়েন্ট আমরা করে দিচ্ছি ঐ পয়েন্টে গিয়ে প্যাসেঞ্জারদের নামিয়ে আবার এখানে চলে। আসতে হবে। এতে আপনারা রাজি থাকলে, বলুন, নইলে, সবাইকেই এখানে নামতে হবে।
সমর্থন ও আপত্তির একটা গুঞ্জনের মধ্যে হঠাৎ একজন জিজ্ঞাসা করে, তার মানে ফেরার সময়। আবার এখানে এসে উঠতে হবে? এতটা হেঁটে এসে?
ডি-এস-পি ধমকে ওঠেন, বাস-ট্রাকের প্যাসেঞ্জারদের যে এখান থেকেই হাঁটতে হচ্ছে সেটা দেখছেন না। আপনারা সময় নষ্ট করবেন না, যা করার এখনি করুন। এর মধ্যে আবার একটা কণ্ঠস্বর শোনা যায়, অত রাতে এতটা রাস্তা হেঁটে আসার সময় ছেনতাই-টেনতাইয়ের দায়িত্ব কে নেবে।
ডি-এস-পি সাহেব বলেন, রাস্তায় কাল সকাল পর্যন্ত পুলিশ থাকবে। বলে রাস্তার ওপর দাঁড়ানো একটা মারুতিকে সোজা চলে যেতে বলেন। মারুতির ড্রাইভার অত কিছু না বুঝে সোজা চলে যায়। তার পেছনে দাঁড়ানো গাড়িগুলোও না জেনে তার পেছন-পেছন যায়। জলপাইগুড়ির ও-সিকে সেই আগের পয়েন্টে পাঠিয়ে দিয়ে ডি-এস-পি তার গাড়িতে ওঠেন।
জলপাইগুড়ির ও-সি তার জিপগাড়িটা রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে নামে–তারপর ডি-এস-পির এগিয়ে আসা জিপের দিকে হাটে। ডি-এস-পি গাড়ি থামাতেই ও-সি বলে, স্যার, আগে যে ব্যবস্থা ছিল সেটাই রাখুন স্যার, না-হলে এইটুকু রাস্তায় সেই মানুষ আর গাড়িতে গোলমাল বেধে যাবে।
ডি-এস-পি গাড়ি থেকে নামেন! তারপর ওসিকে নিয়ে আবার আগের জায়গায় আসতে থাকেন হেঁটে। প্রাইভেট গাড়ির ধুলোয় রাস্তা অন্ধকার হয়ে আসে। ডি-এস-পি চাপা গলায় বলেন, ঠিকই বলেছেন, গাড়িকাড়ি মিলিয়ে একটা স্ট্যামপিড হয়ে যাবে।
সেই পার্কিঙের মাঠটাতে এসে ডি-এস-পি হাত দেখিয়ে বাকি প্রাইভেটগাড়িগুলোকে আটকে দিয়ে মাঠে ঢুকতে বলেন। সেই সব নতুন গাড়ির লোকরা জানেও না যে ইতিমধ্যে এখানে কী হয়েছে। ফলে তারা মাঠে ঢুকে যায়। আর যে-সব প্রাইভেট গাড়ির লোকজন ওখানে নামতে আপত্তি করেছিল, তারাও অনেকে মাঠে নেমে গেছে। কারণ, গাড়ির ভেতর কারো কারো ফ্লাস্কে চা আছে, কারো কারো মদের বোতলও আছে। গাড়ি তাদের খানিকটা দূর এগিয়ে আবার যদি ফিরেই আসে তা হলে লাভটা কী? তার চাইতে বরং এখানে এই মাঠের মধ্যেই গাড়িটা রেখে হেঁটে-হেঁটে যাওয়া ভাল–এ রকম ভেবে তারাও মাঠের ভেতরই ঢুকে যায়। এ নিয়ে আর-কোনো গোলমাল হয় না। যে-গাড়িগুলোকে প্রথমে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল, সেগুলো ফিরে এলেডি-এস-পি, ওসিকে বলেন, আপনি এখানেই থাকুন।
ততক্ষণে যে-তিনটি দিক থেকে ট্রাক বাস গাড়ি আসছিল সেই তিনটি দিকই সংগঠিত হয়ে গেছে। আকাশ থেকে যদি তাকানো যেত, তা হলে দেখা যেত তিস্তাব্রিজ থেকে, আসাম রোড থেকে, ডুয়ার্সের রাস্তা থেকে আর এ-ছাড়াও মাঠ দিয়ে, মেঠো পথ দিয়ে, যেন এইটুকু জায়গার সব দিক থেকে পায়ে হটা মানুষ একটা কেন্দ্রের দিকে চলছে। এই এত সব পথ দিয়ে এত হাজার-হাজার মানুষ আস্তে-আস্তে হেঁটে-হেঁটেই সেই কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছে খুব বড় মেলায় তীর্থ যাত্রীরা যেমন হাঁটে। তাতে ধুলো উড়ছে। আকাশ আর মাটির মাঝখানে ধুলোর একটা পর্দাও তৈরি হচ্ছে। সেই পর্দার আড়ালে মানুষজনকে একটু অস্পষ্টও-দেখাচ্ছে। কিন্তু অত মানুষের একসঙ্গে এক গতিতে একটি কেন্দ্রের দিকে হাটার সঙ্গে সেই ধুলোওড়াটুকু মানিয়েও গেছে। এত আর ট্রাক বা বাসের ধুলোর ঝড় নয়, মানুষের পায়ে-পায়ে ওড়া ধুলো। একই কেন্দ্রের দিকে এত মানুষ যায় বলে ধুলোরও যেন একটা প্রবাহ পথ তৈরি হয়।
.
১৭৬. শ্রীদেবীর নাচ : প্রত্যাশা ও প্রতীক্ষা
ময়নাগুড়ির কাছেই জল্পেশে প্রতি বছরই শিবরাত্রিতে মেলা বসে। জল্পেশের কাছাকাছি ময়নাগুড়িই সবচেয়ে বড় শহর আর জল্পেশের মেলাও চলে প্রায় মাসখানেক। ফলে নানা জায়গায় তীর্থযাত্রীরা। ময়নাগুড়ির ওপর দিয়ে যায়, ময়নাগুড়ির মাঠেঘাটে, বারান্দায়, গাছের তলায় অস্থায়ী ডেরা বাধে। শিবরাত্রির দিন ময়নাগুড়ির ওপর দিয়ে আগে পায়ে হাঁটা তীর্থযাত্রীরা যেত, এখন বাস-মিনিবাসের ভিড় লেগে যায়। এসব দেখার অভিজ্ঞতা ময়নাগুড়ির লোকজনের আছে।
কিন্তু শ্রীদেবীর নাচের অনুষ্ঠানটির দিন বেলা চারটে থেকে ময়নাগুড়ি ও তার আশেপাশের যে-চেহারা হল তা সেই বাৎসরিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে কণামাত্র মেলে না। মনে হল, ময়নাগুড়িতে ও তার আশেপাশে কয়েকটা জল্পেশ মেলা একসঙ্গে বসেছে।
আসাম ও বিহারের দিক থেকে যারা ট্রাক-বাসে এসেছে তাদের ট্রাকে ও বাসেই খাবারদাবার পোশাক-আশাক বিছানাপত্র। ডিলাক্স বাসের যে-যাত্রীরা কোনো কোম্পানির দায়িত্বে এসেছে তাদের ত বাসটায় ঘরবাড়ি। ফলে, মাঠের ভেতর গাড়িগুলোকে ঢুকিয়ে দেয়ার পর গাড়ির যাত্রীরা নিজেদের পরিবারের লোকজন বা বন্ধুবান্ধব নিয়ে দুটো-একটা শতরঞ্জিতে আলাদা-আলাদা হয়ে ছড়িয়ে যায়। কোথাও টিনের মুখ খুলে ডালপুর, আচার, ডালমুট, চানাচুর, প্যারা বেরচ্ছে। শালপাতার ঠোঙাও সঙ্গে আছে, আর আছে জেলিক্যানে জল। কোথাও পাম্প দেয়া কেরোসিন স্টোভের সা-সঁ আওয়াজের ওপর কড়াই চাপানো হয়েছে–লুচি ভাজা হচ্ছে। এমন-কি মাত্র এই স্বল্প অবকাশেও কোথাও-কোথাও তাসের আসর বসে গেছে। মেয়েরা আছে কিন্তু সংখ্যায় তত বেশি নয়–এরকম সব অনুষ্ঠানে। মেয়েদের সংখ্যাই যেমন বেশি থাকে, তেমন নয়। তবে লুচি ভাজা, টিনের বাক্স থেকে খাবার বের করে দেয়া এ-সবের জন্যে ত মেয়েদেরও দরকার হয়। কোনো-কোনো ডিলাক্স বাসে মেয়েদের সংখ্যা বেশ বেশি। সেখানে বড়-বড় কলসীর সাইজের ফ্লাস্কে চাও আছে, ঠাণ্ডা জলও আছে।
