বাংলা ফিল্মটা সাড়ে দশটার মধ্যেই শেষ হয়ে গেল। মাঝখানে কোনো ইন্টারভ্যাল দেয়া হয়নি। বাংলা ফিল্মটা মেয়েরাই বেশি দেখল। কিন্তু সে-ফিল্ম শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই প্যান্ডেল প্রায় ভরে যায়। এত লোক হবে এটা আশা করা যায় নি। টেলিভিশন সেটটা একটু উঁচু টুলের ওপর বসানো হয়েছে–টিনের বেড়ার ওপরের স্কু আটার জন্যে সে-টুলটা বানানো হয়েছিল। কিন্তু স্টেজের ওপর না রেখে, টুলটা রাখা হয়েছে প্যান্ডেলের মাঝামাঝি–পুব দিকের বেড়া ঘেষে। দর্শকরা বসেছে টিভিটা ঘিরে। সামনের দিকে যারা, তারা বেশি পাশে যেতে পারে নি, কিন্তু পেছনে যারা তারা পাশেও অনেকটা ছড়িয়েছে।
ঐটুকু স্ক্রিনের আলো থেকে প্যান্ডেলের ভেতরে মুহূর্তে-মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে ভারতবর্ষের নানা প্রান্তরের নানা দৃশ্য, পাহাড় থেকে সমদ্র মধ্য যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বিস্তারিত হয়ে যায়। আর সেই প্রায় তিন ঘন্টা ব্যাপী বাস্তবের ওপরেই নেমে আসে মধ্যযুগের এক পাশ্চাত্য প্রাসাদ–তাতে মৃত্যুর পর নির্বিকল্প এক মুখোশের মত মুখ নিয়ে এক দীর্ঘদেহী মানুষ, তার বয়স বোঝা যায় না, তার চোখের দৃষ্টিতে পলকের ছায়া পড়ে না। ময়নাগুড়ির ঐ প্যান্ডেলের মাথায় শেষ রাতের শিশির পড়ে টুপ টুপ, অঝোরে, আর, প্যান্ডেলের ভেতরে দর্শকদের নিদ্রালু চোখের সামনে একটার পর একটা হত্যা ঘটে যায়। প্রত্যেকটা হত্যাকাণ্ড দেখানো হয় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে। যাকে খুন করা হচ্ছে তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ নানা ক্লোজ-আপে দর্শকের সামনে ঘোরাফেরা করে। হত্যার পর হত্যার পর হত্যা, রক্তের পর রক্তের পর রক্তে মানবশরীর যখন অবান্তর হয়ে যায়, তখন সেই যান্ত্রিক অবান্তরতায় মেয়েদের শরীর মোমের শরীরের মত পর্দা জুড়ে শুধু ঘোরে। যেন, কোনো উচ্চারণ নেই, কোনো ভাষা নেই, বোমায় বিধ্বস্ত কোনো নগরের মত নারীশরীর আছে; শুধু শরীর। সেই সম্পূর্ণ অচেনা কাহিনীর শেষে গব্বর সিং-এর চিরপরিচিত কণ্ঠস্বরে ড্রাকুলাও উত্তরখণ্ড সম্মিলনের আত্মীয় হয়ে ওঠে।
.
১৭৫. শ্রীদেবীর নাচের জন্য ট্রাফিক কন্ট্রোল
বৃহস্পতিবার সকাল দশটা নাগাদ মনে হল ময়নাগুড়ি শহরটা পুলিশ দখল করে নিয়েছে। তিস্তা ব্রিজ থেকে যে রাস্তা ময়নাগুড়িতে ঢুকেছে, আর ময়নাগুড়ি থেকে যে রাস্তা দুটো মালবাজারের দিকে ও আসামের দিকে চলে গেছে–সেই তিনটি রাস্তাতেই পুলিশভর্তি গাড়ি চলে গেল। মালবাজারের রাস্তায় একটি, আসামের রাস্তায় তিনটি, আর ব্রিজের রাস্তায় দুটি। তা ছাড়া একটা জিপ গাড়ি নিয়ে ডি-এস-পি সাহেব চৌপত্তিতে দাঁড়িয়ে থাকলেন। আসামের রাস্তায় চলে গেলেন ময়নাগুড়ি থানার ওসি আর জলপাইগুড়ির দিকে থাকলেন জলপাইগুড়ির ও-সি। বেলা দশটা থেকে বারটা এই সব ছোটাছুটিতেই কাটল। বেলা বারটার পর থেকেই বোঝা গেল পুলিশ সমস্ত ট্রাফিকের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। আসামের রাস্তায় মাইল,তিন আগে থেকে, জলপাইগুড়ির রাস্তায় তিস্তা ব্রিজ পর্যন্ত, কোনো গাড়িকে দাঁড়াতে দিচ্ছে না কিন্তু কোনো গাড়ি আটকাচ্ছেও না। মিনি বাস বা লাইনের বাসগুলোকে স্পিড়ও কমাতে দিচ্ছে না–প্যাসেঞ্জার নামানো-ওঠানোর জন্যে অনুষ্ঠানের জায়গায়, চৌপত্তিতে, চৌপত্তির পরে এক জায়গায় মাত্র এক মিনিটের জন্যে দাঁড়াতে দিচ্ছে। মালবাজারের দিকে গাড়িগুলোকে টাউনের ভেতর ঢুকতেই দিচ্ছে না–ভারতী সিনেমার কাছ থেকে বের করে দিচ্ছে। ফলে, ময়নাগুড়ির চৌপত্তির অন্য দিনের তুলনায় গাড়ির ভিড় প্রায় নেই বললেই চলে যদিও মানুষের ভিড় অনেক বেড়ে গেছে। অনেকটা হরতালের দিনের মত লাগছে।
বেলা একটা-দেড়টা থেকে বাইরের ট্রাক বাস আসতে শুরু করে। পুলিশ কোনো ট্রাক বাসকেই শহরের ভেতরে ঢুকতে দেয় না। অনুষ্ঠানের জায়গা থেকে মাইলখানেক দূরে আসামের রাস্তায় একটা বড় মাঠে সেই ট্রাক-বাসগুলোকে ঢোকানো হচ্ছে। সারি দিয়ে দাঁড়ানো ট্রাকবাসগুলোকে একটা টোকেনও দেয়া হচ্ছে–গাড়ির নম্বর ও ড্রাইভারের নাম লিখে রাখা হচ্ছে। প্রথম দিকের কয়েকটা বাসট্রাকের পারমিট আছে কিনা দেখা হয়েছিল। তা নিয়ে একটু গোলমাল দেখা দিতেই ডি-এস-পি সাহেব এসে ময়নাগুড়ির ওসিকে বলে দেন, পারমিট দেখতে হবে না। ডি-এস-পি সাহেব চলে যাওয়ার পর দুই হেড কনস্টেবল মাঠের ভেতরে সারি দিয়ে দাঁড়ানো গাড়িগুলোতে গোপনে পারমিট দেখতে চায়। পারমিটের বদলে তারা দশটা টাকা দেয়। পাঁচটাকাই দিতে চেয়েছিল কিন্তু কনস্টেবলরা তাদের বোঝায় কত ভাগ করতে হবে। তখন থেকে দশ টাকাই ঠিক হয়ে যায়। কয়েকটা ট্রাক-বাস আসতে-আসতেই এই সব হাঙ্গামা মিটে যায়। নতুন গাড়ি মাঠে ঢুকেই জেনে যায়–কনস্টেবলকে দশ টাকা দিতে হবে। ঐ দুই কনস্টেবলকে আর-কেউ ডাকাডাকি করে না, তারা ওখানে একটা বাসের ছায়ায় পাতা শতরঞ্জির ওপর বসে থাকে।
তিস্তা ব্রিজ দিয়ে প্রথম গাড়ি আসতে শুরু করে আর-একটু পর, বেলা তিনটে নাগাদ। ওদিকে কাছাকাছির মধ্যে খালি মাঠ না থাকায় গাড়িগুলোকে একটু বেশি দূরে, প্রায় মাইল দেড়েক দূরে এক মাঠের ভেতর ঢোকানো হয়। সে মাঠটাও নিচু। ফলে রাস্তা থেকে মাঠের ভেতর নামতে গাড়িগুলোকে একটু সামলাতে হয়। মাঠটা বড় হলেও একটু দূরেই জংলা গাছপালা শুরু হয়ে গেছে। সেদিকে কোনো ট্রাক বা বাসই যেতে রাজি হয় না।
