কথাটাকে আরো একটু বাড়িয়েও ভাবা যায়। অনুষ্ঠানগুলিতে দর্শকদের পূর্বজ্ঞানের ব্যাপারটি এতই প্রতিষ্ঠিত যেন মনে হয় এই অনুষ্ঠানগুলি না হলেও দর্শকরা এ গুলিতেই সব সময় আবিষ্ট থাকে। তাই যদি হবে, তা হলে এই উত্তরখণ্ডের ত কোনো ভিং গাড়বার মত মাটিই নেই।
নাকি কোথাও কোনো সংযোগ অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে? কোথাও কোনো সংযোগ আরো দৃঢ় হচ্ছে–অদৃশ্য? পরিচিত ঐতিহাসিক কাহিনীর ভেতর বম্বে ফিরে দেখা ক্যাবারে আর বেলিডামে, জায়গা হয়ে যায় যে-প্রক্রিয়ায়, খবরের কাগজে গণধর্ষণের রিপোর্ট পড়তে অভ্যস্ত দর্শকের সামনে একই মেয়ে দুবার দুভাবে ধর্ষিত হয় যে কারণে, চিত্রা সিং-এর ভজন গানের উন্মাদনা আর অনুপ জালোটার দরবারি গানের কারুকাজ দর্শকের ভাল লেগে যায় গান শোনাবার যে-বৈষয়িক কৌশলে, এমনকি ভিডিওর মত আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার এই পশ্চাত্তম অঞ্চলে ঘটে যায় যে-স্বাচ্ছন্দ্যে–সেই প্রক্রিয়া, কারণ, কৌশল ও স্বাচ্ছন্দ্যের ভেতরই নিহিত থাকে বিচ্ছিন্নতার এক প্রবল টান। নদীতে যেমন অনেক সময় ওপরের স্রোত যত বেগে ছেটে, তার নীচে এক স্রোত তত বেগেই তার বিপরীতে ছোটে, সমাজবদ্ধ মানুষের বেলাতেও হয়ত তেমনি। এই সব যাত্রা-গানবাজনা যত বেশি সমস্ত মানুষকে এক করে ফেলে, ততই বেশি মানুষ নিজের ভেতর গুটিয়ে যেতে চায়। শামুকের মত নয়, কারণ, শামুকের গুটিয়ে যাওয়ার মধ্যে আত্মরক্ষাই মাত্র থাকে, কোনো প্রতি-আক্রমণের হিংস্রতা থাকে না।
সারা রাত্রি ধরে ভি-সি-আর-এ চারটি ফিল্ম দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল বুধবার। পরদিন শ্রীদেবীর অনুষ্ঠান। আগের দিনটা এতে একটু হালকা থাকে। কারণ, ভিডিও-ফিল্ম দেখতে দূরের– দর্শকরা নিশ্চয়ই আসবে না, গ্রামের দর্শকরাও আসবে না–স্থানীয় দর্শকরাই সারা রাত ধরে যতটুকু পারে দেখবে। একটা দিন বাদ দিলেই ভাল হত, কিন্তু বাদ দেওয়াটা নেহাৎ খারাপ দেখায় বলেই ভিডিও ফিল্মের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। একটা ইংরেজি–ড্রাকুলা। দুটো হিন্দি–শোলে আর শাহেনশা। একটা বাংলা–প্রতিকার। এখন জলপাইগুড়ির ডুয়ার্সে হাট অনেক বেড়েছে। বড়বড় কয়েকটি হাটে ভিডিও-পালারও হয়েছে। প্রথমে কথা ছিল, কলকাতায় কোনো ভিডিও-পার্লারের মালিকের সঙ্গে ব্যবস্থা করা হবে। সবই যখন বাইরে থেকে আসছে, ভিডিওটাকে আর লোক্যাল রেখে কী হবে? কিন্তু হলদিবাড়ি হাটের ভিডিও-পার্লারের মালিক-ভদ্রলোক এখানে এসে ধরাধরি করেন। ভদ্রলোকের বাবা হলদিবাড়ির বিখ্যাত জোতদার ছিলেন। ছেলেরা জমিজায়গা বিক্রি করে দিয়ে প্রায় সবাই বাইরে চলে গেছে। এক ছেলে ত বিদেশেই থাকে। এক এই ভদ্রলোকই এখানে থেকে গেছেন। পৈতৃক বাড়ির অংশ আছে। নানা রকম ব্যবসা নানা সময় করেছেন–কিছুদিন হল এই ভিডিও-পার্লার খুলেছেন ওদের পরিবার বীরেনবাবুর পুরনো মক্কেল–এখন যদিও মামলা-মোকদ্দমার কোনো ব্যাপার নেই। ভদ্রলোক এসে বীরেনবাবুকে ধরেন। বীরেনবাবু তাঁকে, নকুলবাবুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। উনি কথা দেন, এদের লিস্ট অনুযায়ী কলকাতা থেকে নতুন প্রিন্ট নিয়ে আসবেন। উদ্যোক্তারাও চাইছিলেন না ভিডিও-ফিল্ম ব্যাপারটা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করতে। শেষে, এই ভদ্রলোকের প্রস্তাবেই রাজি হন।
কিন্তু কী কী ফিল্ম আনা হবে–এটা ঠিক করতে অনেক সময় যায়। একটা গোপন প্রস্তাব নিয়ে কিছু নাড়াচাড়া হয় যে শেষের দিকে একটা ব্লু ফিল্ম দেখানো হোক। অত রাতে তেমন কেউ থাকবেও না, যদি থাকেও ঘুমিয়ে পড়বে। কিন্তু, শেষে, গোপন ভাবেই ঠিক হয়ে যায় যে ব্লু ফিল্ম আনা হবে না কারণ পুলিশ ঝামেলা করতে পারে। তার চাইতে এ্যাডাল্ট-হরর অনেক নিরাপদ। খানিকটা ব্লু থাকে কিন্তু টানা হয়, মাঝে-মাঝে হঠাৎ। তা ছাড়া হররটাই প্রধান। কিছু এ্যাডাল্ট-হরর ছবি নিয়ে কথাও হয়। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয় ড্রাকুলাই ভাল। ঐ ভিডিওর ভদ্রলোকই খবর দেন, এটা নতুন ড্রাকুলা, সম্পূর্ণ নতুন ভাবে শুধু ভি-সি-আরের জন্যেই তৈরি। শশালের ব্যাপারে মতৈক্য হয় সবচেয়ে দ্রুত। ভদ্রলোকই জিজ্ঞাসা করেছিলেন, যদি শাহেনশার একটা প্রিন্ট পান, আনবেন কি না। অমিতাভ বচ্চনের শাহেনশার পোস্টার বারবার দেয়া সত্ত্বেও, মুক্তির তারিখ বারবার স্থির হওয়া সত্ত্বেও কিছুতেই মুক্তি করতে দেয়া হচ্ছে না। বাংলা ছবির বেলায় কোনো পছন্দ ছিল না–এমন একটা ছবি হলেই বেটা সবার ভাল লাগে, মেয়েরা এলে ত ঐ প্রথম ফিল্মটা দেখেই চলে যাবে।
শেষ পর্যন্ত এই চারটি ফিল্মই এসে যায়। ঐ ভদ্রলোকই ঠিক করে দিলেন, প্রথমে বাংলা ফিল্মটাই হোক, তারপর শোলে। তারপর ড্রাকুলা। শেষে শাহেনশা। কিন্তু পরে এটা বদলাতে হল। শোলে লম্বা ছবি, অনেকের দেখা। সেটা বরং শেষে থাকুক। শাহেনশা একেবারে নতুন ছবি–সেটাই বরং আগে দেখানো হোক। শেষে তাই ঠিক হল। কিন্তু সে-ঠিক হওয়ার পথেও নানা বাধা। কারণ, বেশ জাগ্রন্থ অবস্থায় শোলের ঐ পরিচিতি সংলাপগুলি শোনার ইচ্ছে অনেকেরই ছিল। শেষ রাতের ঠাণ্ডায় ঘুমের মধ্যে শোলে জমবে না। তখন যেন রাত কাটানোর জন্যেই ঝিমুতে-ঝিমুতে দেখা।
শোলে আগে দেখার পেছনে আর-একটা মতলব ছিল। তাড়ির দোকানটা তখন পর্যন্ত চালু থাকবে। মদ খেতে-খেতে শোলে দেখা–এ রকম সুযোগ ভাবা যায় না। কিন্তু শাহেনশার পক্ষেই মত বেশি হল। যারা শোলের পক্ষে ছিল, তারাও রাজি হয়ে যায়। যাই হোক অমিতাভ বচ্চনের স্না-দেখা ছবি! কত আর খারাপ হবে?
