সেই আচ্ছন্নতা কাটতে একটু সময় লাগে কিন্তু দর্শকরা বড় একটা বাইরে যান না, মোটামুটি যে যার আসনে বসেই থাকেন! পর্দাও তাড়াতাড়িই ওঠে। স্টেজের আলো ও চিত্রা সিং-এর পোশাক একটু বদলেছে! এবার তার গলাতে অন্য সুর খেলা করে–একটু আদরকাড়া সুর, বালগোপালকে নিয়ে। কিন্তু সে বালগোপালও দর্শকদের চেনা। এটাও যেন তাদের জানা যে এই দ্বিতীয় বৈঠকে তাদের গলা মেলানো বারণ, গানগুলোও গলা মেলানোর নয় অবিশ্যি।
অনুপ জালোটার বেলায় দর্শকদের এই পূর্বজ্ঞানই প্রকাশিত হয় অন্য ভঙ্গিতে। চিত্রা সিং-এর পর তার আসর বাসার আগেও একটা বিরতি-মত হয়। পর্দা ওঠার পর তিনিও কিছুটা সময় নেন দর্শকদের সঙ্গে তার উপস্থিতির একটা সংযোগ তৈরি করতে। বারবার হার্মনিয়াম বাজান আর দর্শকদের দিকে তাকান, যেন চেনা লোক খুঁজছেন এমন ভঙ্গিতে। কিন্তু ওটা একটা ভঙ্গিই মাত্র। মঞ্চের সব আলো তারই ওপর। সেই আলোর পর্দা ভেদ করে তার পক্ষে দশর্কদের কাউকে দেখা সম্ভবই নয়! কিন্তু দর্শকরা ত তার এই ভঙ্গি দেখছিল ও সেই ভঙ্গিতে সাড়াও দিচ্ছিল গানের জন্যে প্রয়োজনীয় পরিবেশ। তৈরি করে। অনুপ জালোটা ঐ রকম আঁতিপাতি খুঁজতে-খুঁজতেই খুব চাপা স্বরে একটা উর্দু গজল ধরেন, যেন গাঢ় স্বরে কেউ নিভৃতে নিজের সঙ্গে কথা বলছে। ময়নাগুড়ির মত একটা জায়গায় প্রধানত রাজবংশী শ্রোতাদের সামনে উর্দু শায়েরের মেজাজে অনুপ জালোটার সেই গান কেমন মোহ তৈরি করে। যতই কেন না আসাম-বিহারের দর্শক আসুক, যতই কেন না শিলিগুড়ি-বালুরঘাটের দর্শক আসুক–এদের মধ্যে বড় জোর কেউ-কেউ হিন্দিভাষী। কিন্তু উর্দুর সূক্ষ্ম রসিকতায় আপ্লুত হয়ে যায় উর্দু ভাষা থেকে এত দূরবর্তী এই দর্শক আর গায়ককে বাহবাও জানায় উর্দুরীতিতেই। অনুপ জালোটা যে এই উর্দু গজলেই আটকে থাকেন তা নয়। কিন্তু প্রথম দুটি গজল ঐ ধরনের গেয়ে যেন ভুলিয়েই দেন একটু আগে চিত্রা সিং এখানে আর-এক রকম গানে কী রকম মোহ তৈরি করেছিলেন শ্রোতা-দর্শকদের মধ্যে। অনুপ জালোটা এরকম দুটি গান গাওয়ার পর মৃদু হেসে হিন্দিতে বলেন, আমি আপনাদের সেবার জন্যে এখানে এসেছি। আপনাদের হুকুম মত গাইব। কিন্তু সবাই মিলে হুকুম করলে ত শুনতে পাব না। আমার একটা গান শেষ হলে আমিই জানতে চাইব। তখন আপনাদের যার গুলা আমার কানে পৌঁছবে, তার ফরমায়েশ মত আমি গাইব। অনুপ জালোটা তার এক-একটা গানে দর্শকদের স্তব্ধ করে দিয়ে, রুমালে মুখে মুছে, হেসে বলেন, ফরমাইয়ে। সমবেত চিৎকার শেষ হওয়ার আগেই তিনি একটা গান ধরে বসেন। হয়ত গানটি তার আগেই ঠিক করা ছিল কিন্তু দর্শকদের ঐ ফরমায়েশের অধিকারের ফলেই অত বড় প্যান্ডেলভর্তি হাজার-হাজার দর্শকের সঙ্গে গায়কের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। যতক্ষণ গান হয়, ততক্ষণ দর্শক গায়কের এই সম্পর্কেরই নানা দিক উন্মোচিত হতে থাকে। কখনো তিনি হেসে দর্শকদের দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দেন। কখনো মাথা ঝাঁকিয়ে একটা লাইন ফিরে-ফিরে গাইতেই থাকেন এক নিশ্চয়তায় যে, যে-দর্শকদের তিনি দেখতে পাচ্ছেন না তারা কী ভাবে তাকে ও তার গানকে নিচ্ছে।
.
১৭৪. সাংস্কৃতিক ফাংশনের বিবরণ–ভিডিও
এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে ত উত্তরখণ্ড সম্মিলন উপলক্ষেই–যদিও যারা অনুষ্ঠান করছে তারা উত্তরখণ্ডী নাও হতে পারে। কিন্তু উত্তরখণ্ডের সঙ্গে তাদের কোনো এক ধরনের সহানুভূতি যদি না থাকত তবে ত তারা নিজেরাই আলাদা ভাবে টাকা খাঁটিয়ে এরকম অনুষ্ঠান করতে পারত। সে-সহানুভূতি হয়ত রাজনৈতিক নয়, বা শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়। সে-সহানুভূতি হয়ত তৈরি হয়েছে। এই উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ব্যবসাপাতি বা কাজকর্মেরই সূত্রে। এমন-কি, হয়ত ব্যক্তিগত চেনাজানারই সূত্রে। কিন্তু যে-সূত্রেই হোক, সহানুভূতিটা ত সত্য। আবার উল্টো দিকে উত্তরখণ্ডের এত বড় একটা সম্মিলন যারা সংগঠিত করেছে তারা ত জানে এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এই সম্মিলনেরই একটা অংশ। একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করলে উত্তরখণ্ড সম্মিলনের কথা সারা উত্তরবঙ্গে অন্তত সবাই ভালভাবে জানতে পারবে–প্রচারের এমন সহজ উপায় হিশেবেও তারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটিকে দেখে থাকতে পারেন।
কিন্তু প্রথম ধাক্কায় মনে হয় উত্তরখণ্ড সম্মিলন আর এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেন পরস্পরের বিপরীত কাজ করছে। সম্মিলনে উত্তরখণ্ড বলতে বোঝায় রাজবংশীদের স্বাতন্ত্র্য, অতীত গৌরব, বর্তমান বঞ্চনা, বিক্ষোভ, ভবিষ্যতের কর্মসূচি। আর সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে চলতে থাকে প্রধানত হিন্দি-উর্দু গান বা অন্তত বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হিশেবে ঐতিহাসিক নাটকের ধারায় যাত্রা, বা, এমনকি ব্রেখটের নাটকের বাংলা অনুবাদ, তা ছাড়া ভিডিও ফিল্ম। এর প্রত্যেকটাই ত দর্শকদের ভারতের বৃহত্তর সত্তা, এমনকি বিশ্বের সত্তার কথাও মনে করিয়ে দেয়, অন্তত সেরকমই মনে করিয়ে দেয়ার কথা। তা যদি হয়, তা হলে সকালে সম্মিলনে যে-স্বাতন্ত্র্যের দাবি তোলা হচ্ছে, সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে ত সেই স্বাতন্ত্রের দাবিই নাকচ হয়ে ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যই আরো বেশি করে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তা হলে, এই সম্মিলনের সঙ্গে এমন অনুষ্ঠান যুক্ত হল কেন?
