দর্শকদের অনুষ্ঠান সম্পর্কে এই পূর্বজ্ঞানই সবচেয়ে বেশি বোঝা গেল গানের আসরে। কারণ, এমন-কি মেয়েদের মধ্যেও অনেকে এই সব গায়কের গলার সঙ্গে ও তাদের নির্দিষ্ট গানের সঙ্গে পরিচিত। মেয়েদর্শকদের ভিড়ও অবিশ্যি পুরুষদর্শকদের মতই বিচিত্র। সংখ্যায় অনুপাতে সেখানে রাজবংশী ও মদেশিয়া মেয়েদেরই ভিড় বেশি। কিন্তু এই গানের অনুষ্ঠানে শহরের মেয়েরাও অনেকে এসেছে–জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, ধূপগুড়ি, আলিপুর দুয়ার থেকেও। গায়কের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না–চিত্রা সিং, অনুপ জালোটা, মান্না দে। তা ছাড়া আরো তিনজন, তত খ্যাতনামা নয় এমন, গায়ক। তাদের দিয়েই অনুষ্ঠান শুরু হয়, ভিড় তখনো জমাট নয়। অনেকেই বাইরের মাঠে, এমন কি রাস্তাতেও, জটলা পাকায়, চা-সিগারেট খায়। একটা ছোট্ট তাড়ির দোকান বসেছে মাঠের ভেতর সেই ইমিটেশন গহনার দোকানের পেছনে। অনেকেই একটু এলোমেলো হাঁটতে-হাঁটতে অন্ধকারের দিকে গিয়ে সেই তাড়ির দোকানে এক পাক ঘুরে আসছে। বাইরের দলগুলি অত গা ঢাকাও দেয় না। তারা বেশ হৈ-হৈ করতে-করতে সেদিকে যায়, ফিরে আসে।
মান্না দে-কে দিয়েই অনুষ্ঠান আসলে শুরু হল। একটা ভজন দিয়ে শুরু করলেন। তারপর, একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইলেন। এই দুটো গানের পর একটু বিরতি নিলেন, কিছুক্ষণ হার্মনিয়াম বাজালেন, তবলা, গিটার এগুলো একটু বাধাৰ্বাধি হল, তারপর একটু গুনগুন করলেন–সেটাও মাইকে শোনা গেল, তারপর একেবারে হঠাৎ একটা কলি গেয়ে উঠে থেমে গেলেন, দর্শকরা হাততালি দিয়ে উঠল। হাততালি শেষ হলে তিনি গানটা গাইবার মত করে গাইতে আরম্ভ করেন মাইক থেকে মুখটা একটু সরিয়ে। সে-গানটা খুব তালের গান নয়, কিন্তু টানা সুরের চলন আছে। উঁচু পর্দায় টানা সুরের সেই চলনে একটা উত্তেজনা ছড়াচ্ছিল। ছড়াচ্ছিল কিন্তু পুরো ছড়াতে না-ছড়াতেই গানটা, যেন খানিকটা আচমকা শেষ করে দিয়ে বানলা লোকসঙ্গীতের সুরে একটা আধুনিক গানের প্রথম স্তবকটি গেয়ে দেন। প্রথম চরণটি শুরু হতেই দর্শকদের ভেতর ই-স এরকম একটা আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সেই আওয়াজের ভেতর আকস্মিকের উত্তেজনার চাইতে হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ার বিস্ময় ছিল। সেই প্রাথমিক উচ্ছ্বাসের পর দর্শকরা গানটা যেন আস্বাদ করে। আর, এই গানটাতেই মান্না দে যেন বুঝে যান, দর্শকদের একটু অন্য রকম ভাল লাগছে। গানটা তিনি ফিরে-ফিরে গান আর সেই ফিরে-ফিরে গাওয়ায় প্রক্রিয়ায় দ্রুত হওয়া সত্ত্বেও গানটা থেকে নাটক ঝরে যেতে থাকে।
মান্না দের পরে এলেচ চিত্রা সিং। কিন্তু দলবলসহ মান্না দের প্রস্থান, তারপর পর্দা নেমে আসা, দর্শকদের অনেকেরই বাইরে বেরিয়ে আসা, এই সব মিলে একটা বিরতির মতনই হয়। বেশ কিছুটা পরে, চিত্রা সিং মঞ্চে বসলে পর্দা ওঠে। তারপর যন্ত্রপাতি বাধাবাধি শুরু হয়। তখন বোঝা যায় দর্শকরা বেশ স্থির হয়ে বসেছে, তখন, চিত্রা সিং মাইকেই একটু গুনগুন করে নেন। বেশ নরম গলার সেই গুনগুনানিতে সাড়া প্যান্ডেল ভরে যায়। তারপর গুনগুনানি থামে, বাজনাগুলো হঠাৎ জোরে একসঙ্গে বেজে উঠে একটা সুর বাজিয়ে ফেলে আধ মিনিটটাক। সেটা থেমে গেলে মাইকে ঘোষণা শোনা যায়, শ্রোতাদের কাছে শ্ৰীমতী চিত্রা সিং-এর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুরোধ তারা যেন এই অনুষ্ঠান ক্যাসেট বা টেপ না করেন। যদি এরকম করা হয় তাহলে তিনি তখনই অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেবেন। এই ঘোষণাটা দুবার করা হয়। চিত্রা সিং হার্মনিয়ামটা একটু জোরে বাজিয়ে নিয়ে দু হাত তুলে নমস্কার করেন। তারপর তার প্রথম গানটি ধরেন।
শুরু করতেই মেয়েদের ভেতর থেকে আবছা একটা গুনগুনানি ওঠে, সমবেত গুনগুনানি। উঠেই থেমে যায়। কিন্তু তাতে বোঝা যায়, গায়িকার সঙ্গে-সঙ্গে অনেকেই মনে-মনে সুর ভাজছে। চিত্রা সিং-এর অনুষ্ঠানেরই মাঝামাঝি এই মনে-মনে সুর ভঁজাটা প্রকাশ্য হয়ে পড়ল। মনে হয়, গায়িকা কিছুটা উৎসাহই দিলেন দর্শকদের এই সক্রিয়তায়। একটু মৃদু হাসলেন। তারপর সে-গানটা শেষ হতেই একটা দ্রুত লয়ের ভজন গেয়ে উঠে, দর্শকদের দিকে হাত বাড়িয়ে বলেন, আপনারাও গান, তারপর একটা লাইন গেয়ে যেন অপেক্ষা করেন দর্শকদের প্রতিধ্বনির জন্যে। আর প্রতিধ্বনি ওঠেও। একটু ধীরে বটে কিন্তু বেশ উল্লসিত প্রতিধ্বনি। আরো দু-তিন রণ এরকম গাইবার পর চিত্রা সিং হঠাৎ হার্মনিয়াম ছেড়ে উঠে দাঁড়ান-ভজনের ছন্দে-ছন্দে দু হাত দু দিকে প্রসারিত করে নিজে ত যেন প্রায় ভজনতাড়িত হয়ে ওঠেনই, সঙ্গে সঙ্গে দু-হাতের ইঙ্গিতে দর্শকদের গাইতে বলেন, উইং থেকে ছুটে এসে একজন তার হাতে একটা মাইক ধরিয়ে দেয়, তিনি বা হাতে মাইকটা নিগে, ডান হাতে বাতাসে হাততালি দেন, মাথাটা তালে-তালে দোলান, তাঁর নিমীলিত চোখে ভজনের ঘোর বোঝা যায়, তার চুলের দোলনেও সেই একটু চাপা নেশা। দর্শকরা প্রথমে তার মাথার দোলনের সঙ্গে তাল রেখে মৃদু হাততালি দিতে থাকে, কিন্তু গানের দ্রুততার সঙ্গতিতে সে-হাততালি উচ্চকিতও হয়, দ্রুতও হয়, অনেকটা কীর্তনের আসরের মত, চূড়ান্ত পর্যায়ে তিনি অনেক সময় চুপ করে শুধু মাথা দুলিয়ে যান আর দর্শকরা হাততালি দিয়ে গাইতে থাকে। সেটাও আরো একটা পর্যায়ে উঠে সেই চুড়াতেই শেষ হয়। চিত্রা সিং দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে আনত হন। ধীরে ধীরে পর্দা নেমে আসে। সমস্ত আসরটা যেন একটু আচ্ছন্ন হয়ে থাকে।
