প্রমোদতরণী-ও এরকমই কিছুটা ঐতিহাসিক ও কিছুটা সামাজিক। কুলটার কুল-এ যে রকম, প্রমোদতরণীতেও সেরকম, নায়ক-নায়িকার সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট হয় না–অর্থাৎ ভাইবোন, স্বামীস্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা–এ রকম নির্দিষ্ট পরিচয়ের চাইতেও তাদের একসঙ্গে থাকা ও বাঁচাটাই প্রধান ব্যাপার। প্রমোদতরণীর বেশ অনেকটা জুড়ে প্রথমেই মোনা গুপ্তাসহ অন্যান্য মেয়েদের নাচ আছে। মোনা গুপ্তা এখানে মাইক হাতে নিয়ে পাশ্চাত্য ফিল্মের কায়দায় ঘুরে-ঘুরে গানও গায়। নীলকর সাহেবের বাংলোতে বড়দিনের উৎসব ছিল এরকম দীর্ঘ ও সমবেত নাচের উপলক্ষ। সেখানেও নীলদর্পণ-এর তোরাপের মত চরিত্র আছে, সংখ্যায় কিছু বেশি। ক্ষেত্রমণির ধর্ষণ দৃশ্য আছে বার দুয়েক–একবার সাহেব করে, একবার নায়েবগোছের বাঙালি একজন। কিন্তু ঐরকম কিছু অংশ ছাড়া নীলদর্পণ আর মনে পড়ে না। সেখানেও দেখা গেল অনেকেই ঐ আরম্ভের সমবেত নারীনৃত্য ও ভেতরের ধর্ষণের দৃশ্যের কথা জানে। তাই সেই নৃত্যের পরই প্যান্ডেল থেকে অনেকে বেরিয়ে যায়, আবর ধর্ষণের আগে ঢোকে। নাচের সময় আলো খুব চড়া, রঙিন ও ঘুরন্ত–ফলে সেই ঘূর্ণনের একটা মাদকতা আসে। সেই মাদকতা দর্শকদের মধ্যে ছড়ায় বটে কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে কাহিনীর ইঙ্গিত বুঝে নিতে হয় বলে এতটা ছড়ায় না যে দর্শকরা নিজেদের আসন ছেড়ে উঠে নাচতে থাকবে! সেটা বরং ঘটে ধর্ষণ দৃশ্য দুটিতে। দুটি দৃশ্যই একটু বিস্তারিত ভাবে দেখানো হয়। সেখানেও আলো খুব পরিকল্পিত ভাবে ব্যবহৃত হয়। ধর্ষণদৃশ্য দুইবার কেন, তার একটা জবাব কাহিনী থেকে পাওয়া যায়–পালাকার দেশীয় তাঁবেদার শ্রেণীর, চরিত্রও দেখিয়েছেন। সেটা অবিশ্যি অন্যভাবেও দেখানো যেত। কিন্তু দর্শকদের প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, প্রথম বারের ধর্ষণটা কিছু প্রত্যাশিত ও কিছু দুর্ঘটনা। সেখানে অত্যাচারের আবহ সম্পূর্ণ লুপ্ত হয় না। কিন্তু একই মেয়ের দ্বিতীয় ধর্ষণের দৃশ্য দর্শকদের নাটকীয় ও অপ্রত্যাশিত ঠেকে। শরীরজীবিনী কোনো মেয়ের শরীরের ওপর কোনো যৌন আঘাত এলে যেমন দর্শকের শারীরিক পবিত্রতাবোধ আহত হয় না, তেমনি, একবার ধর্ষিতা মেয়েকে দ্বিতীয়বার ধর্ষিতা হতে দেখলে দর্শকদের সামাজিক নিরাপত্তাবোধ হয়ত ব্যাহত হয় না। বরং, এই দ্বিতীয় ধর্ষণটাকে যাত্রার দৃশ্য হিশেবে অনেক নিরপেক্ষভাবে ভোগ করা যায়। সেই ব্যাপারে আলোকসম্পাতের সাহায্যও পাওয়া যায়। প্রথমবার ঘটনা ঘটে সাহেবের কুঠিতে। সেখানে ততক্ষণ বেশ প্রকাশ্য আলো থাকে যতক্ষণ সাহেব সেটা চায়, আর সাহেব বেশ অনেকক্ষণ ধরে। সেখানে অজ্ঞাত কোনো উৎস থেকে সাহেবি বাজনাও বাজে ধর্ষণের আয়োজন জুড়ে। আর দ্বিতীয়বার ধর্ষণ ঘটে মেয়েটির নিজের ঘরে, অন্ধকারে। সেখানে দর্শকরা নটনটীর শ্বস, দীর্ঘশ্বাস, কাতরতার আওয়াজ বেশ ভালভাবে শুনতে পায়।
প্রত্যেকটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেই দেখা গেল যে দর্শকদের বড় একটা অংশ প্রায় সবটাই আগে থেকে জানে। সেই অংশটা সংখ্যার দিক থেকে বড় কিনা তা বলা যাবে না। বরং অনুমান হয়, তা নয়। কারণ প্যান্ডেলভর্তি অত মানুষের মধ্যে কত মেয়ে এসেছে কাছাকাছি গ্রাম থেকে, অনেক দর্শক এসেছে দূর থেকে বাসে করে। তাছাড়া সে রকম পুরুষের সংখ্যাও কম নয়। তারা এ সব যাত্রা, থিয়েটার ফিল্ম আগে দেখে নি। তারা এ-সব গান বরং কিছুটা রেডিওতে আগে শুনেছে। কিন্তু সংখ্যার দিক থেকে, এ-সব দেখা বা জানা দর্শকের সংখ্যা বেশি না হলেও, ঐ দর্শকরাই অত বড় প্যান্ডেলের ভেতরে প্রধান। তারা নানা জায়গায় বসে থাকে বটে, কিন্তু ঢোকে আর বেরয় প্রায় একসঙ্গেই। তাদের বয়সের সীমাটাও বেশ বড়–বিশ-বাইশ থেকে চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ পর্যন্ত। এদিককার আলোর ভোল্টেজ কম। সেই ক আলোয় খুব পরিষ্কার বোঝাও যায় না এরা সবাই স্থানীয় ছেলে কি না। তার ওপর এ অনুষ্ঠানের টিকিট বিক্রি হয়েছে পাহাড়ে, আসামের কাছাকাছি এলাকায়, বিহারের এলাকায়, বালুরঘাট রায়গঞ্জ শিলিগুড়ি জলপাইগুড়ি এই সব শহরেও। সুতরাং হিমঝরা রাত্রির আধো-আলোর এই অনুষ্ঠানে স্থানীয় রাজবংশী যুবকের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল চা বাগানের মজুরদের মদেশিয়া মুখ, গোখা মুখ, বিহারী বা আসামী মুখ। পলিথিনের জ্যাকেট, টুপি আর একই ধরনের জুতোয় শহরের যুবকদের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল ট্রাক বা বাসের ড্রাইভার-ক্লিনাররা বা ট্রাকভর্তি করে দূর থেকে আসা নানা পেশার নানা মানুষ। এই ভিড়টাই কিন্তু দর্শকদের প্রধান অংশ–তারাই যেন ঠিক করছিল কোথায় কতটা শিস বাজবে, কতটা আওয়াজ উঠবে, কোথায় একজনের একটা মন্তব্য শোনা যাবে, কোথায় হাততালি অর চিৎকার একসঙ্গে চলবে।
.
১৭৩. সাংস্কৃতিক ফাংশনের বিবরণ—গান
দর্শকদের এই অংশের অনুষ্ঠানগুলো সম্পর্কে পূর্বজ্ঞানই এই সাংস্কৃতিক অধিবেশনগুলির প্রধান দিক। শিশুরা যেমন শোনা গল্পটাই একাধিকবার শুনতে চায় ও গল্প শুনতে-শুনতে তার মনের পরিচিত প্রতিক্রিয়াটাই আস্বাদ করতে করতে এগয়, এই দর্শকরাও সে রকম অনুষ্ঠানটির পরিচিত অংশগুলিই বারবার শুনতে চায়, দেখতে চায়। এমন হতে পারে যে এই দর্শকদের মধ্যেও বড় একটা অংশ ফিল্ম দেখে, টিভি দেখে, বা নানা জায়গায় এই সব অনুষ্ঠান দেখে-দেখে পাকা দর্শক হয়ে গেছে।
