কিন্তু এগুলি ত নীতিমূলক প্রস্তাব। কার্যকরী প্রস্তাব নেয়া হয়েছে দুটো।
প্রথম প্রস্তাবটিতে বলা হয়েছে-যে-ভাবে তিস্তা ব্যারেজ তৈরি হচ্ছে তাতে এই সম্মিলন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ না করে পারে না। সরকার যদৃচ্ছভাবে জমি অধিগ্রহণ করেছেন। অধিগ্রহণের সময় এমন-কি জমির দাঁড়ানো ফসল পর্যন্ত বিবেচনা করা হয় নি। অথচ যদি তিস্তা ব্যারেজ কোথা দিয়ে যাবে তার একটা মানচিত্র আগে প্রচার করা হত তা হলে কৃষকরা আগেই সতর্ক হতে পারতেন ও অধিগ্রহণের আশঙ্কা আছে এমন জমিতে ফসল বুনতেন না। তদুপরি তিস্তা ব্যারেজের কাজে স্থানীয় লোকজনদের নেয়া হয় নি। তা ছাড়াও তিস্তা ব্যারেজের ফলে কোথায় কী ভাবে জল যাবে তার কোনো হিশেব জনসাধারণকে দেয়া হয় নি। ফলে, এরকম আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যে তিস্তা ব্যারেজের ফলে উত্তরবঙ্গের কৃষিপণ্যের ধারা ব্যাহত হবে। অথচ এই আশঙ্কা সত্ত্বেও রাজ্য সরকার তাড়াতাড়ি তিস্তা ব্যারেজ চালু করতে চাইছেন। অতি শীঘ্র পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তিস্তা ব্যারেজের প্রথম পর্যায়ের উদ্বোধন করবেন বলে যে-ঘোষণা করা হয়েছে তাতে সম্মিলন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ না করে পারছে না। তিস্তা ব্যারেজের কাজ কতটা এগিয়েছে সে-বিষয়ে জনসাধারণকে কিছু না-জানিয়েই সরাসরি উদ্বোধন করে দেয়া অন্যায় ও অগণতান্ত্রিক। পরন্তু, তিস্তা ব্যারেজের কাজ এখনো উদ্বোধনের পর্যায়ে আসেই নি। এমতাবস্থায় সম্মিলন উত্তরবঙ্গবাসীকে সতর্ক করে দিচ্ছে–এই উদ্বোধনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠুন। তাই সম্মিলন আহ্বান করছে–মুখ্যমন্ত্রী তিস্তা ব্যারেজ উদ্বোধন করতে এলে আপনারা নির্দিষ্ট দিনে সারা, উত্তরবঙ্গ থেকে মিছিল নিয়ে এসে এই উদ্বোধনের প্রতিবাদ করুন, মুখ্যমন্ত্রী যাতে এই উদ্বোধন না। করতে পারেন।
দ্বিতীয় প্রস্তাবটি আরো দূরপ্রসারী। তাতে বলা হল–উত্তরবঙ্গের উন্নতির প্রতি কোনো রাজ্য সরকারই কোনোদিন মনোযোগ দেন নি। অথচ উত্তরবঙ্গ থেকে চা, তামাক ও কাঠের শুল্কবাবদ রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার কোটি-কোটি টাকা পেয়ে থাকেন। উত্তরবঙ্গের প্রতি এই উপেক্ষার প্রতিবাদে সম্মিলন আহ্বান করছে যে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গবাসী যোগ দেবেন না। সম্মিলনের পক্ষ থেকে উত্তরবঙ্গবাসীকে আহ্বান করা হচ্ছে, তার যেন বিধানসভায় ভোট বয়কট করেন। উত্তরবঙ্গের কেউ প্রার্থী হবেন না। উত্তরবঙ্গের কেউ ভোেট দেবেন না। সম্মিলনের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে উত্তরখণ্ড হিংসায় বিশ্বাস করে না, তাই কোনো হিংসাশ্রয়ী উপায়ে ভোট বন্ধ করার আহ্বান দেয়া হচ্ছে না। সম্মিলন শুধু শান্তিপূর্ণ উপায়ে আগামী বিধানসভা নির্বাচন বয়কট করার আহ্বান দিচ্ছে।
.
১৭২. সাংস্কৃতিক ফাংশনের বিবরণ–যাত্রা
শনিবার ছিল কলকাতার নবরঞ্জন অপেরার কুলটার কুল আর রবিবার ঐ একই অপেরার প্রমোদতরণী। সোমবার ছিল গানের আসর। তাতে চিত্রা সিং শেষ পর্যন্ত জোড়ায় আসেন নি, একাই এসেছেন। কিন্তু অনুপ জালোটা এসেছিলেন, মান্না দে ছিলেন, তা ছাড়া অন্যান্য আর্টিস্টরা ত ছিলেনই। মঙ্গলবার কলকাতার গ্রুপ থিয়েটার নামে একটা দল ব্রেখটের ককেসিয়ান চক সার্কল করে। বুধবারের অনুষ্ঠানটা সন্ধ্যায় শুরু হয় নি, শুরু হয়েছে রাত আটটায় আর শেষ হয়েছে সকাল চারটেয়–সারা রাত ধরে ভিডিওতে চারটি ফিল্ম দেখানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার একটিই অনুষ্ঠান ও সেটিই সম্মিলনের শেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-শ্রীদেবীর নাচ।
এর ভেতর যাত্রার অনুষ্ঠানটা দুদিনই খুব জমে গিয়েছিল। তবে একটা পৌরাণিক হলে আরো ভাল হত। দুটোই খানিকটা ঐতিহাসিক আর খানিকটা সামাজিক। নবাবি আমলে একটি মেয়ে কুলত্যাগিনী হয়ে কী করে অত্যাচারী নবাবের প্রতিরোধ সংগঠন করেছিল তার কাহিনী–কুলটার কুল। মেয়েটি। হিন্দু, হিন্দু জমিদারের গায়ে থাকে। সে একটি যুবকের সঙ্গে এক রাত্রিতে বাড়ি ছেড়ে, গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। সে জন্যেই সে কুলটা। কিন্তু পরে ধীরে-ধীরে জানা যায় ঐ হিন্দু জমিদার ঐ হিন্দু মেয়েটিকে মুসলমান মনসবদারের কাছে ভেট দিতে চায় এই খবর পেয়ে মনসবদারের এক যুবক সৈন্যাধ্যক্ষ পালিয়ে এসে মেয়েটিকে বাড়ি থেকে সরিয়ে অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়ে রক্ষা করে। কিন্তু ইতিমধ্যে সেই জমিদার, মনসবদারের ঐ ছেলেটিকে তনখাইয়া ঘোষণা করে, তার খোঁজে সমস্ত জায়গায় সৈন্য পাঠায় ও গ্রামে-গ্রামে সেই সৈন্যরা অত্যাচার শুরু করে। বিশেষত মেয়েদের ওপর। এক-একদল মেয়েকে ধরে আনা হয়–জমিদারকে দেখানোর জন্যে যে তার ভেতর সেই মেয়েটি আছে কি না। আর, আত্মগোপন করে গ্রাম থেকে গ্রামে পালিয়ে বেড়াতে-বেড়াতে সেই ছেলেটি ও মেয়েটি হঠাৎ একটা সময় থেকে নবাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনের সংগঠক হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ঐ মুসলমান সেনানী ও হিন্দু নারীর নেতৃত্বে স্বতঃসংগঠিত গ্রামবাসীদের বাহিনী গেরিলা যুদ্ধে সেই মুসলমান মনসবদার ও হিন্দু জমিদারের ভাড়াটে সৈন্যদের পর্যদস্ত করে ফেলে।
খানিকটা দেবী চৌধুরানীর আদল আসে, জোয়ান অব আর্কও একটু আছে। যারা ঐতিহাসিক নাটক ভালবাসে তাদের কাছে মনসবদার, জমিদার আর ঐ গ্রামের মেয়েটি কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিচিত হয়ে যায়। আর, তারপরই হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের ওপর মাঝেমধ্যেই কথাবার্তা আসতে থাকে। গেরিলা যুদ্ধের ব্যাপারে নকশালদের খতম অভিযান-এর কথা মনে পড়ে আবার পাঞ্জাবের সন্ত্রাসবাদীদের কথাও মনে আসে। এই সব মিলিয়ে যাত্রাটি প্রায় সব রকম দর্শকের কাছে অনায়াসে পৌঁছে যায়। এমন-কি আধুনিক ছেলেপিলে, যারা ইতিহাসের ততটা ধার ধারে না, তারাও অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে জনসাধারণের সংগঠিত বিদ্রোহের কাহিনীতে নিজেদের বিষয় পেয়ে যায়। একদিকে মনসবদার ও জমিদারের অত্যাচার দেখানোর সুযোগ নরনারীর কিছু ঘনিষ্ঠ দৃশ্যও ছিল, সেখানে হিন্দি গজল গানই গাওয়া হয়েছে, সঙ্গে মেয়েটি নেচেছেও। এই মোনা গুপ্তা মেয়েটি ফিল্মে ক্যাবারে নাচের জন্যে খুব নাম করেছে। মনসবদারের এক মদ্য পানের দৃশ্যে মোনা গুপ্তার ক্যাবারে নাচ ছিল। এই নাচটা যে আছে তা অনেকেই জানত। আসলে, এই নাচটার জন্যেই কুলটার কুল যাত্রা হিশেবে হিট করেছে। ক্যাবারের বেশ কিছুটা জুড়ে বেলিডান্স। শেষের দিকে এক সময় মেয়েটা প্রায় আর্চ করে স্টেজের মাঝখানে ঘোরে, তার পেটের ওপর, তলপেটের ওপর আর বুকের ওপর আলো পড়ে, অন্য সব আলো নিবে যায়, মেয়েটিকে ঐ আর্চ করেই স্টেজজুড়ে ঘুরতে হয়, যাতে সব দিকের দর্শকরা দেখতে পায়, দর্শকদের ভেতর থেকে হাততালি, চিৎকার, শিস ওঠে। যখন যেদিক থেকে তার পেট আর বুক দেখা যায়, তখন সেদিক থেকেই হাততালি, চিৎকার আর শিস ধ্বনিত হয়। কিন্তু এ-স্টেজ ত যাত্রার মত চারদিক খোলা নয়, থিয়েটারের মত একদিক খোলা। মোনা গুপ্তার শরীর ঘোরানোর ফলে সব দর্শকই তার বুক ও পেটের নতুন নতুন দৃশ্য পায়। ফলে, তারাও হাততালি, চিৎকার আর শিস দেয়। এই দৃশ্য একটু যেন বেশি সময় ধরেই হয়। তারপরই বাইরে বোমার আওয়াজ, চকিত অন্ধকারে মোনা গুপ্তা উঠে দাঁড়ায়, হাত বাড়িয়ে নেয়া একটা কাল কাপড়ে সে নিজেকে সম্পূর্ণ আবৃত করে নিতে-নিতেই আলো সম্পূর্ণ জ্বলে ওঠে ও সেই নায়ক-নায়িকার গেরিলাবাহিনী স্টেজে ঢুকে পড়ে। তখন বোঝা যায়, ঐ নর্তকীও ছিল ছদ্মবেশী গেরিলা। সেখানে মনসবদারের পরাজয় ও হত্যাতেই যাত্রার সমাপ্তি–তার আগে কিছু · ছোটাছুটি ও সংক্ষিপ্ত তলোয়ার খেলা আছে।
