বিশাই বা বিশ্বসিংহকে (১৪৯৬-১৫৫৩) যদি ঐতিহাসিক কালে কোচদের সংগঠিত আত্মপ্রকাশের প্রথম চরিত্র বলে ধরে নেই তা হলে পাঁচশ বছর ধরেই রাজবংশী মানুষ নিজের এই দুটি জীবন মেনে নিয়েছে। সে নিজেকে মনেপ্রাণে হিন্দু মনে করে। তার পরম দেবতা জল্পেশ্বর শিব। কিন্তু বর্ণ হিন্দুরা তাকে হিন্দু মনে করে না, তাই বর্ণ হিন্দু সংস্কৃতিও সে আয়ত্ত করে নিতে পারে নি।
এখন ভারতের অর্থনীতির রাজনীতির নিয়মে এই রাজবংশী তার কোচপরিচয় পুনরুদ্ধার করতে, চাইছে। যে-হিন্দুত্ব ছিল তার আদর্শ, সেই হিন্দুত্ব থেকে সে বেরিয়ে আসতে চাইছে। শরীরে ও সংস্কৃতিতে যে-কোচ সে থেকেই গেছে, সেই কোচই সে হয়ে উঠতে চায়। আর, এই কোচপরিচয়ের সুবাদেই ভারতের রাজনীতি-অর্থনীতিতে ভারতীয় হিশেবে সে তার বিশেষ সুবিধে আদায় করে নিতে চায়। হিন্দু হওয়ার পাঁচশ বছর পর সে অহিন্দু হতে চাইছে। কিন্তু এই অহিন্দু হতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার কোচঐতিহ্যের গৌরববোধ থেকে ও চৈতন্য থেকে জন্মাচ্ছে না, জন্মাচ্ছে তার টাকাপয়সার নগদ হিশেব থেকে। যে-কোচ পাঁচশ বছর ধরে রাজবংশী থেকেছে সে কি আর ইচ্ছে করলেই আজ কোচ হতে পারে?
হতে পারার একটা উপায় অবিশ্যি তার ছিল। হিন্দু সমাজের প্রত্যাখ্যানের ফলেই সে তার কোচ জীবনযাপনের যে-অভ্যাস অব্যাহত রাখতে পেরেছে সেই অভ্যাসটাকে প্রায় আক্রমণের ভঙ্গিতে হিন্দু সমাজের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারত। কিন্তু তা হলে ত তাকে অস্বীকার করতে হয় এই রাজবংশী নামটিই। কোনো রাজপরিবারের সঙ্গে উপজাতি পরিচয়ের ঐক্যসূত্রে সে তার কোচপরিচয় ফিরে পাবে না। সেই রাজপরিবারের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক অস্বীকার করলেই তার উপজাতিপরিচয় সে ফিরে পেতে পারে। কিন্তু ১৮৯০ থেকে শুরু করে ১৯৩০-৩৫ পর্যন্ত যে নিজেকে শুধু রাজবংশী নয়, ক্ষত্রিয় বলে পরিচয় দিতে চেয়েছে, সেই পরিচয়ই তার সামাজিক আন্দোলনের প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে, সে কী করে এখন নিজেকে রাজবংশী না বলে কোচ বলবে? কোচ ত নয়ই, রাজবংশীও নয়–হিন্দু ক্ষত্রিয়–এই পরিচয় এখন উল্টে যাবে কী করে–হিন্দু ত নয়ই, রাজবংশীও নয়–কোচ?
উল্টে যেতে পারত যদি সত্যি আত্মপরিচয়ের এক প্রখর বেদনায় ও অভিমানে এই সমাজ নিজের ওপর বদলা নিতে চাইত, নিজের পঁচশ বছরের হিন্দু হওয়ার ইতিহাসের বদলা নিতে চাইত, নিজেকে আঘাতে-আঘাতে পর্যদস্ত করতে চাইত। তা হলে এক উদ্ভট প্রতিক্রিয়ায় সে নিজের সংস্কৃত নাম ত্যাগ করত, সে এমন-কি রায় বা বর্মন উপাধিও ছেড়ে দিত, সে বিয়ে-শাদি-শ্রাদ্ধে পুরুত বামুনকে আসতে দিত না, উদ্ধার করে আনত নিজের পিচশ বছরের পুরনো কোনো রীতি, এমন-কি জল্পেশ্বর শিবকেও অস্বীকার করত, এমনকি কোচবিহারের মদনমোহনকেও অস্বীকার করত, কামাক্ষ্যা মন্দিরের বিগ্রহকেও অস্বীকার করত–বদলে গড়ে তুলত নিজের নতুন তীর্থ, তা হলে সেই অভিযান এই বিরাট রাজবংশী সমাজকে ইতিহাসের এক অবাস্তব পুনরাবৃত্তির প্রতিক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে ফেলত ঠিকই কিন্তু সেই পুনরাবৃত্তি হয়ত নতুন একটা আরম্ভও ঘটাতে পারত। এই উত্তরখণ্ড আন্দোলন ত তা নয়ই, বরং তার উল্টো।
কংগ্রেসের আর ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই বলে কংগ্রেসের যে-জনভিত্তি গ্রাম-গ্রামান্তরে আছে, সেই জনভিত্তির ওপর তৈরি হচ্ছে এই ধরনের আঞ্চলিকতাবাদী আন্দোলন। কিন্তু এটা হয়ত পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ পরিস্থিতি। পশ্চিমবঙ্গ বাদ দিয়ে সারা ভারতেও ভারতীয়তার বিপরীত যে রাজনৈতিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, এর সঙ্গে হয়ত তারও সম্পর্ক আছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের সেই নির্দিষ্টতা বাদ দিলেও, আসলে ভারতের অর্থনীতিতে মুনাফা ভাগাভাগি এত স্পষ্ট চেহারা নিয়েছে যে উত্তরবঙ্গের রাজবংশী জোতদারও তার ভাগ চায়।
এমন একটা সম্মিলন যেমন হওয়ার কথা তেমনিই হতে লাগল। ছদিন ধরে এই সম্মিলন সকালের দিকে প্রতিদিনই ঘন্টা দু-তিন করে হয়েছে। কিন্তু তাতে প্রতিদিন একই বক্তৃতা হয়েছে। এমনকি প্রতিদিন বক্তৃতা করার লোক পাওয়া যায় নি। পুরো সম্মিলনটা একদিনেই শেষ হতে পারত-যদি একটু সাজানো যেত। কিন্তু সেরকম সাজানোর লোকও নেই, সেরকম সাজানোর কোনো উদ্দেশ্যও ছিল না। মাঝখানে, একদিন দেবনাথ রায় পি-এইচ-ডি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিভাগের, কয়েকজন অধ্যাপককে এনে উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতির ওপর একটা আলোচনা সভার ব্যবস্থা করে। তাতে বরং এমন কিছু শোনা গিয়েছিল, যা সম্মিলনের অন্যান্য বক্তৃতায় আসে নি। ।
সম্মিলন সকালে শুরু হতে-হতে প্রায় দশটা হয়ে যেত, তারপর বারটা-সাড়ে বারটার মধ্যেই শেষ। দু-একদিন এমনও হয়েছে যে দশটাতেও আরম্ভ করা যায় নি। কিন্তু একটি অধিবেশন সম্পূর্ণ বাদ দেয়া ঠিক নয় বলে যে-কেউ একটা বক্তৃতা করে অধিবেশন শেষ করে দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত জানা যায় যে সম্মিলনে অনেকগুলি প্রস্তাব নেয়া হয়েছে। তার মধ্যে এইগুলি আছে। এক : উত্তরবঙ্গের রাজবংশী অধ্যুষিত এলাকাকে স্বতন্ত্র অধিকার দিতে হবে, প্রয়োজনে এর জন্যে রাজ্য সীমা পুননির্ণায়ক কমিটিকে নিয়োগ করতে হবে। দুই : উত্তরবঙ্গে সমস্ত সরকারি কাজকর্মে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, মেডিক্যাল কলেজে, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে রাজবংশী ছাত্রদের জন্যে শতকরা অন্তত ৫০ ভাগ আসন নির্দিষ্ট রাখতে হবে ও তাদের ভর্তির জন্যে প্রবেশিকা পরীক্ষার ব্যবস্থা তুলে দিতে হবে। তিন : তিস্তা ব্যারেজের জন্য অধিগৃহীত জমির সমপরিমাণ জমি খাশ জমি থেকে কৃষকদের দিতে হবে এবং আর-কোনো জমি অধিগ্রহণ করা চলবে না। চার : কৃষিপণ্যের সর্বোচ্চ দাম ও লেভির বাধ্যতা উত্তরবঙ্গের প্রযোজ্য হবে না, কারণ উত্তরবঙ্গে কৃষির জন্যে কোনো সেচ ব্যবস্থা নেই ও এখানকার ফলন কম।
