কিন্তু ১৯১১-তেই এই দ্বিধার ভাব চলে গেছে। ওমেলি তার সেন্সস রিপোর্টে লেখেন, নিজেদের ক্ষত্রিয় বলে পরিচয় দেওয়ার অধিকার চেয়ে উত্তরবঙ্গের রাজবংশীদের মধ্যে একটা স্থায়ী ও গভীর আন্দোলন চলছে। তারা কোচদের থেকে পৃথকভাবে বর্ণিত হতে চায়। শুধু তাই নয়, তারা নিজেদের ক্ষত্রিয় নামে নির্দিষ্ট করতে চায়। প্রথম অনুরোধটি কোনো ইতস্তত না করেই রক্ষা করা হয়েছে। কারণ তাদের উৎপত্তি কী ভাবে হয়েছে সে-প্রশ্ন নিরপেক্ষভাবেই, এ কথা এখন সন্দেহাতীত সত্য রাজবংশী ও কোচ আলাদা জাত (কাস্ট)। যাই হোক, তারে বংশোৎপত্তিগত উপাধি ও প্রাচীন পদবী ক্ষত্রিয় নামে তাদের চিহ্নিত করার কোনো প্রশ্নই আসে না। ১৯২৩-এর সেন্সস রিপোর্টে টমসন লেখেন, ১৯০১-এ অনেক কোচ নিজেদের রাজবংশী বলে চিহ্নিত করেছে, এবং এখন রাজবংশীরা। অনেকেই নিজেদের ক্ষত্রিয় পরিচয় লিপিবদ্ধ করানোর জন্যে শক্তি প্রয়োগ পর্যন্ত করে। এই ১৯২১-এই রাজবংশীদের ভেতর পৈতে পরা ও ক্ষত্রিয় সমিতি আন্দোলন এরকম ছড়িয়ে পড়ে যে, তাদের ক্ষত্রিয় বলে পরিচয় দিতে না দিলে রঙপুর থেকে কোচবিহার পর্যন্ত আদমশুমারি অচল হয়ে পড়ত। এই ক্ষত্রিয় পরিচয় অর্জনের আন্দোলন স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও অনেকখানি যুক্ত। যেন, নিজেদের হিন্দু পরিচয় প্রমাণ করাটা নিজেদের ভারতীয় পরিচয় প্রমাণ করারই সমার্থক। যেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভারতীয় জনসাধারণের যে-একটা পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল, নিজেদের হিন্দু বলে বর্ণনা দিলে সেই পরিচয়ের অন্তর্গত হওয়া যায়। তেমনি, আবার ততদিনে হিন্দু মধ্যবিত্তের প্রতিষ্ঠা হিন্দু মধ্যবিত্ত আদর্শকে রাজবংশীদের গ্রাহ্য করে তুলেছে। সেই পরিচয় যেন তাদের সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার ছাড়পত্র। ক্ষত্রিয় সমিতি আন্দোলন–রাজবংশী সমাজের সবচেয়ে ব্যাপক ও গভীর আন্দোলন। তার ফলে রাজবংশী পরিবারের গঠন ও জীবনযাপন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হয়।
৫.৩ রাজবংশী সমাজের জাতিপরিচয় ও উপজাতি পরিচয়
রাজবংশী সমাজের ঐতিহাসিক কাল জুড়ে নিজেদের উপজাতি পরিচয়কে জাতি পরিচয়ে এমনভাবে মিশিয়ে দেবার চেষ্টা সত্ত্বেও সেই উপজাতির স্মারক থেকে গেছে তাদের চাপা নাক, ছোট চোখ, একটু ফর্শা রং ও চিবুকের উঁচু হাড়ে। যে বৃহৎ হিন্দু সমাজের সঙ্গে মিশে যেতে রাজবংশী সমাজের এমন শত-শত বছরব্যাপী চেষ্টা সেই বর্ণ হিন্দু সমাজ তার দরজা কোনো সময়েই রাজবংশী সমাজের জন্যে খুলে দেয় নি। নরনারীর যে-সম্পর্কের ভেতর দিয়ে রক্তের মেলামেশায় উপজাতি পরিচয় খসে যেতে পারত শরীর থেকে, সে-সম্পর্ক কোনো সময়ই তৈরি হয় নি বর্ণ হিন্দু সমাজের লোকজনের সঙ্গে রাজবংশী সমাজের লোকজনের। যে-দুই রাজপরিবার রাজবংশী সমাজের প্রধান পরিবার তারা নানাভাবে নিজেদের বর্ণ হিন্দু করে ফেলতে পেরেছে, বর্ণ হিন্দু সমাজও তাদের নিজেদের ভেতর নিয়ে নিয়েছে। অত বড় বড় রাজপরিবারে বা জমিদার পরিবারে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিতে কারই বা আপত্তি হবে? তখন ত তাদের রাজা হিশেবেই দেখা হয়, রাজবংশী হিশেবে দেখা হয় না। কালাপাহাড় যে কামাক্ষা মন্দির ধ্বংস করে দেন (১৫৬৩), কোচবিহারের রাজা নরনারায়ণ সেই কামাক্ষ্যা মন্দির পুননির্মাণ করেন ও সেখানে দুর্গাপ্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে নিজের হিন্দু হওয়ার পথ তৈরি করেন। এই উপলক্ষে ১৫০ জন মানুষকে বলি দিয়ে তাম্রপত্রে মন্দিরের দেবীদের সামনে দেয়া হয়। রাজবংশী বা কোচ থেকে হিন্দু হওয়ার এমন রক্তপিচ্ছিল পথ সকলের পক্ষে বা সাধারণের পক্ষে সুলভ ছিল না। রাজারা কখনো রক্ত ঢেলেছেন, কখনো রক্তের প্রতীক সিঁদুর ঢেলেছেন। লক্ষ্মীনারায়ণ বলে কোচবিহারের কে রাজা আকবরের সেনাপতি মানসিং-এর সঙ্গে তার এক মেয়ের বিয়ে দেন (১৫৮৫)। আর-এক রাজা প্রাণনারায়ণ (১৬২৫-১৬৬৫) তার বোন রূপমতীর বিয়ে দেন নেপালের রাজা প্রতাপমল্লর সঙ্গে। ১৮৭৮-এ কোচবিহারের রাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের সঙ্গে বিয়ে হল ব্রাহ্মসমাজের কেশবচন্দ্রের কন্যা সুনীতি দেবীর। নৃপেন্দ্রনাথের বড় ছেলে জিতেন্দ্র নারায়ণের বিয়ে হল বরোদার ইন্দিরা দেবীর সঙ্গে। তার মেয়ে গায়ত্রী দেবীর বিয়ে হল জয়পুরের মহারাজার সঙ্গে। আর-এক বোনের বিয়ে হল আগরতলার রাজার সঙ্গে। ভারতীয় রাজার স্বীকৃতির মূল্য হিশেবে কোচবিহারের রাজা স্বেচ্ছায় ত্যাগ করলেন নিজের রাজবংশী পরিচয়।
বৈকুণ্ঠপুরের রাজপরিবারের ইতিহাসও প্রায় একই রকম। কিন্তু তারা ত দেশীয় রাজ্য হিশেবে স্বীকৃত নয়, তাই, অন্যান্য দেশীয় রাজারা তাদের পরিবারের সঙ্গে বিয়েশাদি দেন নি। কিন্তু টাকা দিয়ে বর্ণ হিন্দু। ঘর থেকে জামাই ও মেয়ে তারাও জোগাড় করেছেন।
রাজবংশী পরিচয়ের সুবাদে যে রাজ্য ও প্রায় রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, রাজবংশী পরিচয় অবলুপ্তির মধ্যে দিয়ে সেগুলি নিজেদের হিন্দু সমাজের ভেতর ঢুকিয়ে নিয়েছে। কিন্তু ঠিক বিপরীত পদ্ধতিতে বর্ণ হিন্দু সমাজ এই রাজবংশীদের দূরে ঠেলে রেখেছে। ফলে তারা গত প্রায় পাঁচশ বছর এক অদ্ভুত বিপরীত জীবন যাপন করে আসছে। তাদের সমস্ত অবয়বে কোচ জন্মচিহ্ন, তাদের পোশাক-আসাকে কোচ উপজাতির অভ্যাস, তাদের অলঙ্করণে কোচসংস্কার, তাদের তৈজসপত্রে কোচঐতিহ্য, তাদের পরিবারের লোকজনের ভেতরকার সম্পর্ক কোচঐতিহ্য সম্মত, তাদের বাড়িঘর কোচরীতি অনুযায়ী তৈরি হয়, অথচ তারা কিছুতেই নিজেদের কোচ বলে স্বীকার করে না, কোচপরিচয় তাদের পক্ষে প্রায় নিকৃষ্ট অপমান।
