এর সঙ্গে প্যান-বোরো সংস্কৃতির একটা ছোঁয়াও লাগছে যাতে উত্তরপূর্ব বা নর্থইস্টের বিরাটতর একটা অঞ্চল জুড়ে সংস্কৃতিক ঐক্য খোঁজ হচ্ছে।
এই সব কিছুর মধ্যে কোনো দৃঢ় মিল নেই, অনেক সময় এর ভেতর বৈপরীত্যও আছে। উত্তরখণ্ডের ভেতরে এমন কোনো লোক নেই যে বা যারা এই আন্দোলনকে সংগঠিত একটা তত্ত্বের ভিত্তি দিতে পারে। বীরেন বসুনিয়া বা কোচবিহারের সন্তোষবাবুর মত লোজন উত্তরখণ্ডকে কোনো-কোনো সময় বৃহত্তর সমাজে বা প্রশাসনে যোগ্যতার সঙ্গেই দাঁড় করাতে পারে কিন্তু সেটা ত আন্দোলনের একটা ছোট অংশ মাত্র, পুরো অংশও নয়। তাদের পক্ষে ত জননেতা হওয়া সম্ভব নয়।
আবার হয়ত উত্তরখণ্ড আন্দোলনের মত ঘটনা এ-রকম নানা পরস্পরবিরোধী স্বার্থ মিশিয়েই তৈরি হয়। কখনো এই স্বার্থ, কখনো ঐ স্বার্থ প্রাধান্য পায়। কিন্তু রাজবংশী জোতদারের নতুন টাকার যোগ্য বিনিয়োগক্ষেত্র খোঁজার জন্যে এ-ধরনের আন্দোলন এখন অনেক দিন পর্যন্ত তৈরি হয়ে উঠবে, তৈরি থাকবে। বৃহত্তর ভারতে ব্যবসা ও শিল্পের বাড়তি, হিশেববহির্ভূত, অসংখ্য টাকায় যে-সামাজিক শ্রেণী তৈরি হয়ে গেছে রাজবংশীরাও তা থেকে আলাদা নয়। ভারতের অর্থনৈতিক নিয়মেই তাদের সমাজের ভেতরে এখন তাদের বোরো ও কোচ রক্তের শুদ্ধতা জোর এই ঝোঁক সংগঠিত হচ্ছে, যেমন ভারতের অর্থনীতির নিয়মেই শিখরা আরো কত ভাল শিখ হতে পারে সেটা একটা রাজনৈতিক বিষয় হয়েছে; যেমন, সেই একই নিয়মে তেলুগুরা কত বেশি তেলগু সেটাই রাজনীতি হয়ে উঠেছে; যেমন সেই একই নিয়মে অহোমরা অহোম-ঐতিহ্যের প্রাগেতিহাস থেকে তাদের আত্মপরিচয় জোগাড় করে ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে ঢুকছে। ইতিহাসেরও অতীত, বর্তমানে এই কাজে লাগছে, রাজনীতির-অর্থনীতির ভারতীয় ভবিষ্যতের প্রয়োজনে।
কিন্তু নিজেদের উপজাতিত্বের অতীতকে বর্তমানের মধ্যে আবিষ্কার করার মধ্যে, অন্তত রাজবংশীদের ক্ষেত্রে, একটা এমন গোজামিল আছে, যা মীমাংসা করা অসম্ভব। রাজবংশীরা রাজবংশীও থাকবে, আবার কোচ-বোরো উপজাতিও হবে–এ ব্যবস্থা কোনো ভাবে সম্ভব নয়।
কেউ যদি বলেন, এখন আর রাজবংশীদের উপজাতিত্ব নির্ণয় করা যাবে না, তাই তাদের পক্ষে উপজাতিত্বে প্রত্যাবর্তন সম্ভব হবে না–তা হলে সে কথা ধোপে টিকবে না। কারণ ধোপটা দিচ্ছেন রাজবংশীরাই। তারা নিজেদের যে-উপজাতিত্ব স্বীকার করবে, সেই উপজাতিত্বই তাদের পরিচয়। তাতে হজসন, ডালটন, বেভারলি, হান্টার, রাউনি, বোয়লো, ম্যাগোঁয়ার, ওডোনেল, রিজলি, গ্রিয়ারসন, গেইট, ওমেলি, টমসন-এ-সব সাহেবদের লিস্ট করা জাতি-উপজাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে মিল হল কি হল না। সেটা অবান্তর। কারণ, এই সব সাহেব যে-লিস্ট বানিয়ে দিয়েছে সেটা কোনো নতুন স্মৃতিশাস্ত্র নয় যে তাতে গাই-গোত্র মিলিয়ে তবে একটি উপজাতিকে উপজাতি হতে হবে।
কিন্তু এই উপজাতির-পরিচয় পুনরুদ্ধারের পথে বাধা রাজবংশীরা নিজেরাই। কারণ, তারা এতদিন ধরে নিজেদের এই উপজাতি-পরিচয় অস্বীকার করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হিন্দু হতে চেয়েছে, হিন্দু হয়ে উঠেছে।
কোচবিহারের রাজপরিবার আর জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুরের রায়কত পরিবার ত রাজবংশীদের প্রধান ঐতিহাসিক প্রতিনিধি। কোচবিহারের আদি পুরুষ বিশু বা বিশাই। সেই বিশাইই হয়ে গেল বিশ্বসিংহ। এই বিশাই পুবে ব্রহ্মপুত্র থেকে পশ্চিমে ঘোরাঘাট পর্যন্ত নিজের রাজত্ব কায়েম করলে ব্রাহ্মণরা. তাকে হিন্দু বানিয়ে ফেলল। পাজি-পুথি ঘেঁটে তারা আবিষ্কার করল যে আসলে বিশাই ও তার জাতির লোজন ক্ষত্রিয়, পরশুরামের ভয়ে তাদের পৈতে ছিঁড়ে ফেলে তারা এই বনে পালিয়ে আসে। আর বিশাই হরিয়া চাড়ালের ছেলে নয়, আসলে শিবের ছেলে। তেমনি বিশাইয়ের ভাই শিশাইও শিবের ছেলে। বিশ্ব সিংহ সিলেট থেকে একদল ব্রাহ্মণ আমদানি করে কামরূপী ব্রাহ্মণ বলে একটি শ্রেণীই তৈরি করল। বিশ্ব সিংহের পর থেকে কোচবিহারের রাজপরিবার নারায়ণ পদবী ব্যবহার করে। তারা মদনমোহন ঠাকুরবাড়ি বানায়। আর জলপাইগুড়ির রায়কতরা হয়ে যায়, বৈকুণ্ঠপুরের অধিবাসী।
কিন্তু এটা কেবল রাজপরিবারের ব্যাপার নয়। রাজপরিবার সেই জনগোষ্ঠীর প্রধান পরিবার হিশেবেই এই ব্যবস্থা নিয়েছে এবং সেই জনগোষ্ঠীও নিজেদের রাজবংশী বলেই পরিচয় দেবে বলে ঠিক করে নেয়। সেটাই হয়ে দাঁড়ায় তাদের গৌরবের পরিচয়, তাদের উপজাতিত্ব অস্বীকারের পরিচয়, তাদের বৃহত্তর হিন্দু জাতির ভেতর ঢুকে পড়ার প্রধান ছাড়পত্র। তিনশ বছরের বেশি সময় ধরে এই হিন্দু পরিচয় রাজবংশী সমাজের এত ভেতরে সেঁদিয়ে যায় যে উনিশ শতকের শেষ থেকে এই হিন্দু ক্ষত্রিয় আত্মপরিচয় হয়ে দাঁড়ায় তাদের একটা আন্দোলনেরই বিষয়। সেটা ১৯২১ সাল নাগাদ, আদমশুমারির সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় পর্যন্ত। ১৮৯১-এর আগেই বৈকুণ্ঠপুরের জমিদারি নিয়ে একটা মামলা প্রিভি কাউন্সিল পর্যন্ত গড়িয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, বৈকুণ্ঠপুর পরিবারের প্রধানের নাম রায়কত, এরা বাংলার উত্তর-পূর্ব সীমান্তের কোচ উপজাতির অন্তর্গত এবং হিন্দু নয়। ১৮৯১-এর সেন্সাস রিপোর্টেও রাজবংশীদের কোচচরিত্র স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। কিন্তু এই ১৮৯১-এর রিজলি মন্তব্য করেছেন, উত্তরবঙ্গের কোচ অধিবাসীরা নিজেদের রাজবংশী ও ভঙ্গক্ষত্রিয় বলে পরিচয় দেয়। তাদের ব্রাহ্মণ আছে, তারা ব্রাহ্মণ্য রীতিনীতি অনুসরণ করে ও ব্রাহ্মণদের গোত্র গ্রহণ করতে শুরু করেছে।
