কিন্তু পঞ্চাননবাবুর বক্তৃতার প্রধান অংশ খানিকটা আলগা ভাবে এই ইতিহাসের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে থাকল। বর্তমান অবস্থার বিশেষত্বের প্রসঙ্গে তিনি বিশেষ কিছু প্রায় বললেনই না।
সেটা বরং একটু বেশি মাত্রায় স্পষ্ট করে দিলেন নকশালবাড়ি থেকে আসা সম্পৎ রায়। প্রথম যখন নকশালবাড়ি হয় তখন সেখানকার নকশাল-আন্দোলনের বিরুদ্ধে সম্পৎ রায় জোতদারদের একটা কৃষক সমিতি তৈরি করে নকশালপ্রভাবিত কৃষকদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধ নেমে পড়েন। তখন সম্পৎ রায়ের বয়স বছর চল্লিশ, এখন বছর ষাট। চারু মজুমদার, কানু সান্যালের নেতৃত্বে নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলন শুরুতে ত ছিল কৃষকদের ন্যায্য ভাগের আন্দোলন, কোথাও-কোথাও আধিয়ারির দখলের আন্দোলন। ও-সব এলাকায় কোনোদিনই গোলমাল-টোলমাল হত না, ফলে থানাপুলিশের ব্যাপার ছিল বললেই চলে। সম্পৎ রায়ই প্রথম স্থানীয় জোতদারদের দ্রুত সংগঠিত করে পূর্ণিয়া থেকে ভাড়া করে লোক নিয়ে এসে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। সম্পৎ রায় মাইক ফাটিয়ে বললেন, অনেকে বলেন এটা রাজবংশীদের দল–এই উত্তরখণ্ড দল। আমি এ কথা মানি না। উত্তরবঙ্গে রাজবংশী বেশী–যা কিছু করবেন তাতেই রাজবংশী বেশি হবে। কমিউনিস্টরা যখন মিছিল করে তখন সেখানেও রাজবংশী বেশি থাকে–তাকে ত কেউ রাজবংশী পার্টি বলে না। আবার চা বাগানের মজুরদের নিয়ে সিটু বা আই-এনটিইউসি যখন আন্দোলন করে, তখন তাকে ত কেউ মদেশিয়া আন্দোলন বলে না–কিন্তু তাতে ত মদেশিয়ারাই বেশি থাকে। আপনারা ভাবেন উত্তরবাংলায় রাজবংশীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ অথচ দেখেন, কোনো জায়গায় রাজবংশীরা চাকরি পায় না, রাজবংশী কৃষক ব্যাঙ্কের লোন পায় না। গত চল্লিশ বছর দেশ স্বাধীন হল–তাতে রাজবংশীদের কোন উপকার হল? প্রত্যেক সরকার একজন করে রাজবংশী মন্ত্রী রাখে। আগে পুরা মন্ত্রী রাখত, এখন আধামন্ত্রী একজন রাখে। তাতেই রাজবংশীদের বাপঠাকুর্দা উদ্ধার হয়ে গেল। কিন্তু আমাদের এ-আন্দোলন–উত্তরবঙ্গের সকলের জন্যে আন্দোলন, শুধু রাজবংশীদের আন্দোলন এটা নয়। আমরা চাই উত্তরবঙ্গের সবাই আমাদের সঙ্গে আসেন।
আসাম থেকে যিনি এসেছিলেন তিনি আসামের কোন পার্টির প্রতিনিধি বা কেন এসেছেন সেটা বোঝা গেল না। কিন্তু তার বক্তব্যটা খুব নির্দিষ্ট ছিল। তিনি বললেন, ভারতবর্ষের রাজনীতিতে একটা গুরুতর পরিবর্তন ঘটছে। এতদিন পর্যন্ত দিল্লি থেকে সারা ভারতের শাসন চালানো হত, কিন্তু এখন একটা সময় এসেছে যখন আঞ্চলিক শক্তিগুলিই আলাদা-আলাদা অঞ্চল থেকে মিলিভাবে ভারতবর্ষ চালাবে। কেন্দ্রে একটা সরকার থাকতে পারে, থাকবেও, থাকা দরকার। কিন্তু সে-সরকারকে চলতে হবে এই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ওপর নির্ভর করে। এইভাবে এই আঞ্চলিক শক্তিগুলির সঙ্গে কেন্দ্রের একটা লেনদেনের সম্পর্ক তৈরি হবে। কেন, সে সম্পর্ক এখনই তৈরি আছে। তামিলনাড়ুর কথাই ধরুন। সেখানে কত দিন হল স্থানীয় ডি-এম-কে বা এ-আই-এ-ডি-এম-কে দলের সঙ্গে কেন্দ্রের কংগ্রেসের একটা বোঝাপড়া হয়ে আছে। রাজ্যে ডি-এম-কে বা এ-আই-এ-ডি-এম-কে ক্ষমতায় থাকবে–সেখানে কংগ্রেস কোনো ভাগ বসাবে না, কেন্দ্রে কংগ্রেসকে ক্ষমতায় থাকতে এরা সাহায্য করবে–সেখানে এরা কোনো ভাগ চাইবে না। একবার কংগ্রেস হিশেবে ভুল করেছিল, রাজ্যে ক্ষমতার কে আসবে! সেবার কংগ্রেসও সেই ভুলের খেশারত দিয়েছে। শুধু কংগ্রেস নয়, কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় যারাই থাকবে তাদেরই রাজ্য বা আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে এরকম বোঝাপড়া করে নিতে হবে। ধরুন, ১৯৭৭ সালের ভোটে তামিলনাড়ুতে এ-আই-এ-ডি-এম-কে ভোটে জিতল আর সারা ভারতে কংগ্রেস হারল। এই এ-আই-এ-ডি-এম-কের সঙ্গে কেন্দ্রের জনতা পার্টির আপোশ-সমঝাওতা হল। ১৯৮০-তে ইন্দিরা গান্ধী ফিরে এলেন, তামিলনাড়ুর এ-আই-এ-ডি-এম কে সরকারকে কংগ্রেসবিরোধী বলে বরখাস্ত করে ডিএমকের সঙ্গে সন্ধি করলেন। ছ মাস পরের ভোটের কংগ্রেস ডুবল, ডি-এম-কেও ডুবল। এ-আই-এ-ডি-এম-কে জিতে গেল। ইন্দিরা গান্ধী তার ভুল বুঝতে পেরে সাত তাড়াতাড়ি এ-আই-এ-ডি-এম-কের সঙ্গে রফা করে নিলেন রাজ্য তোমাদের, কেন্দ্র আমাদের। এই রাজনীতির ধরনটাই এখন ভারতে নতুন ভাবে এসেছে আপনাদের উত্তরখণ্ড আন্দোলনকে সেইভাবে পরিচালিত করতে হবে।
এই আসামের প্রতিনিধি রাজনীতির কায়দাকানুন নিয়ে আর-একটা কথা বলেন, এতদিন ভারতের রাজনীতি এই রকম ভাগে ভাগ হয়ে এসেছে কংগ্রেসবিরোধী ও কংগ্রেসসমর্থক। বা, এটাকে উল্টেও বলতে পারেন– কমিউনিস্টবিরোধী ও কমিউনিস্টসমর্থক। বা, এটাকে আর-এক ভাবে বলতে পারেন–কংগ্রেস কমিউনিস্টবিরোধী ও কংগ্রেস কমিউনিস্টসমর্থক। কংগ্রেস ভেঙে যে-সব দল তৈরি হয়েছে সেই সব দল ও বিজেপি, কংগ্রেস কমিউনিস্ট বিরোধী। এ রকম শাদায়কালয় রাজনীতিকে ভাগ হতে হবে কেন? কেন একদলকে কংগ্রেস ও কমিউনিস্টদের সমর্থক বা বিরোধী হতেই হবে? এই দুই দল কিন্তু সেরকম কোনো বাধানিষেধ মানে না। এরা যখন যার সঙ্গে ইচ্ছে রফা করে, যখন যার বিরোধিতার ইচ্ছে তার বিরোধিতা করে। আমরাও সেভাবেই চলব। আমরা কংগ্রেসও না, কমিউনিস্ট না। প্রত্যেকের সঙ্গেই আমাদের লেন-দেনের সম্পর্ক। এখন কমিউনিস্টরা এখানে ক্ষমতায় আছে। কমিউনিস্টরা যদি আপনাদের দাবি মেনে নেন–রাজবংশীপ্রধান অঞ্চলে যদি রাজবংশীদের প্রাধান্য স্বীকার করে নেন, যদি রাজবংশীদের চাকরির ব্যবস্থা করেন, বা, রাজবংশী ভাষার প্রাধান্য দেন, তা হলে আপনাদের আপত্তি কী? তেমনি আবার এই সব দাবি আদায়ের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় কংগ্রেস সরকারের কংগ্রেস যদি আপনাদের সাহায্য করে তা হলে আপনারা কেন্দ্রীয় সরকারের বা কংগ্রেসের সাহায্য নেবেন। গোর্খাল্যাণ্ড হবে কি হবে না সেটা এখনই বলা যায় না বটে কিন্তু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যখন গোখাল্যাণ্ডের নেতা ঘিসিংকে জাতিদ্রোহী বলেছিলেন, কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী তার বিরোধিতা করেছিলেন। আবার রাজীব গান্ধী যখন দার্জিলিং সফরে গেলেন, তখন ঘিসিং হরতাল ডেকে দিলেন। এটাই হওয়া উচিত। আপনাদের পক্ষে যা-কিছু যীক কাজে লাগানো, আপনাদের বিপক্ষে যা-কিছু তার বিরোধিতা করা। তার জন্যে কংগ্রেস বা কমিউনিস্টের স্থায়ী সমর্থক বা স্থায়ী বিরোধী হাওয়ার কোনো দরকার নেই। দেশের ভেতরে কি কংগ্রেস আর কমিউনিস্টই আছে–আর-কিছু নেই? দেশের বেশির ভাগ মানুষই কংগ্রেসও নয়, কমিউনিস্টও নয়। আপনাদের এই আন্দোলনকে সেই কংগ্রেস কমিউনিস্ট বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
