এরকমই এসেছিলেন ধূপগুড়ি ও বীরপাড়া অঞ্চলে কংগ্রেস নেতা বলে পরিচিত দুজন–অনিল রায় ও দেবকান্ত ক্ষত্রিয়। জেলাতে কংগ্রেস নেতা বলে এদের কেউ তেমন চেনে না কিন্তু স্থানীয়ভাবে কংগ্রেস নেতা বলে এদের যে-প্রতিপত্তি সেটা বিশেষত ভোটর সময় কাজে লাগে। কংগ্রেসের সরকার থাকলে স্থানীয় ব্যাপারস্যাপার নিয়ে এঁদের একটা ভূমিকা থাকে। এখন বয়স হয়ে গেছে। নিজেদের জমিটমি কিছু আছে কিন্তু এদের প্রধান একটা আয় হত নানা লোকের মামলা মোকদ্দমা বা সরকারের কাছে নানা কাজকারবারের ছোটখাট তদ্বির-তদারকি থেকে। এমন কিছু বড় কাজ নয়–এই সব কাজকেই খারাপ অর্থে এ-দেশী ভাষায় বলা হয় দেউনিয়াগিরি। এখন অনেক দিন সেই আয়টা নেই, সেই ভূমিকাটাও নেই। কংগ্রেসের সরকার থাকলে রাজনৈতিক মাতব্বরির যে-আত্মবিশ্বাস এদের চেহারার ফুটে ওঠে তাও নেই। ওরা স্থানীয় ভাবে নেতৃত্ব দিতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। পঞ্চায়েত-উঞ্চায়েত হয়ে গ্রামে নতুন সব নেতা তৈরি হয়ে গেছে। সেই নতুন নেতৃত্বের এরা কেউ নয়। অথচ পঞ্চায়েত যখন ছিল না তখন এরাই ছিল পঞ্চায়েত। উত্তরখণ্ডের আন্দোলন প্রধানত গ্রামাঞ্চলকে কেন্দ্র করেই হবে বলে আশা। সে কারণেই এদের চোখেমুখে যেন কিছু অসহায় ভরসা যে উত্তরখণ্ড : তাদের পুরনো নেতৃত্ব ফিরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু উত্তরখণ্ড যেরকম মিছিল, মিটিঙ, সম্মিলন, দাবিদাওয়া–এসব করছে, তাতে তারা অভ্যস্ত নয়। বরং এ-সব থেকে তারা দূরেই থাকতে চায়।
উদ্বোধনের দিনের বক্তৃতাগুলো নানা রকম। উত্তরখণ্ডের নিজস্ব দলীয় পতাকা তোলা হল। লাল তেকোনা কাপড়ের মাঝখানে শ্বেত পূর্ণ সূর্য। পরে, এই নতুন পতাকা ব্যাখ্যা করে সভাপতি পঞ্চানন মল্লিক বলেছিলেন–ঠিক বলেন নি, তার ছাপানো সভাপতির ভাষণে ছাপা হয়েছিল, কামতাপুর রাজ্যের মুক্তির আন্দোলনের এই মুহূর্তে পতাকা রক্তবর্ণ ত্রিকোণ এবং মধ্যে মধ্যাহ্নকালীন খেত সূর্য ঘোষণা করা হয়েছে। উত্তরখণ্ড দল প্রাচ্যদর্শনে বিশ্বাসী। পৌরাণিক যুগ থেকে প্রাক ঐতিহাসিক যুগ পর্যন্ত ত্রিকোণ পতাকা প্রচলিত। ত্রিকোণ অর্থ ত্রিগুণ–সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ। রক্তবর্ণ মাতৃরজঃ সুতরাং শক্তির প্রতীক। শ্বেতবর্ণ পিতৃওজঃ বীজ সুতরাং জ্ঞানের প্রতীক অর্থাৎ সূর্য জ্ঞানের প্রতীক। শক্তি ও জ্ঞানের সমন্বয়েই উন্নয়নের পথ। জৈবিক ত্রিগুণাত্মিক ত্রিকোণ শ্বেতসূর্যসমন্বিত পতাকা সম্পূর্ণ অহিংস গণতান্ত্রিক পথে জ্ঞানের আলোকে দলের বিপ্লবাত্মক চিন্তাধারাকে লক্ষ্যে পৌঁছানোর দৃঢ়তা ঘোষণা করে।
সভাপতি, উদ্বোধক ও প্রধান নেতা পঞ্চানন মল্লিকের বক্তৃতাতেও এই বিষয়টিই প্রাধান্য পেল–ভারতীয় হিন্দুদর্শনে বিশ্বাস, ভারতের সংবিধানের প্রতি বিশ্বাস, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি বিশ্বাস ও কলকাতার নেতৃত্বের প্রতি সম্পূর্ণ অনাস্থা। তার বক্তৃতাতেই স্বাধীন কামতাপুর রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবি তোলা হল। সেই দাবির সমর্থনে ইতিহাস থেকেও কিছু-কিছু যুক্তি এসেছে বটে কিন্তু বারবারই নিজেদের উপজাতীয় অস্তিত্বের স্বাতন্ত্র ঘোষণার সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল বর্ণ হিন্দু সমাজের প্রতি আনুগত্যের সংস্কার।
তার বক্তৃতা শুরুই হল গীতার উদ্ধৃতি দিয়ে, তাও অনুবাদে নয়, সংস্কৃতে,
হতে বা প্রাপ্যসি স্বর্গং।
জিত্বা বা ডোক্ষ্যসে মহীং।
তস্মাদুত্তিষ্ঠ কৌন্তেয় যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ
সুখদুঃখে সমে কৃত্বা লাভালাভৌ জয়াজয়ে
ততো যুদ্ধার যুজ্যস্ব নৈবং পাপমবাসি।
তিনি প্রথমেই বলে নেন, ভারতবর্ষ মাতৃভূমি। ভারতবর্ষের অখণ্ডতা ও জাতীয় সংহতি রক্ষা করায় প্রতিটি ভারতবাসীর মত আমরাও সর্বপ্রকার ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত আছি। তারপরই যোগ করেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তরাংশের মানুষের সর্বাঙ্গীন উন্নতির জন্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আজ পর্যন্ত যা করার দরকার ছিল, তা করেন নি।….সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত ও শোষিত হচ্ছেন এখানকার বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজবংশী, সংখ্যালঘু মুসলমান, বাস্তুহারা নমশূদ্র, বহু উপজাতি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষ। এই সকল অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছে উত্তরখণ্ড দল। উত্তরখণ্ড দলের উদ্দেশ্য হল উত্তরবঙ্গকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে পৃথক করে ভারতীয় সংবিধানের ৩নং ধারা অনুযায়ী কামতাপুর নামে এক ভারতভুক্ত সমৃদ্ধিশালী অঙ্গরাজ্য গঠন করা এবং কলকাতা কেন্দ্রিক রাজনৈতিক কুচক্রী পুঁজিবাদী নেতাদের শোষণের থেকে উত্তরবঙ্গবাসীকে রক্ষা করে তাদের মুখে হাসি ফোঁটান।…আপনারা জানেন যে ভারতবর্ষের প্রাচীনকালে কামরূপ নামে এক রাজ্য ছিল। এই কামরূপ রাজ্যের পশ্চিম অংশে গঠিত হয় কামতাপুর রাজ্য। মহারাজা নরনারায়ণের রাজত্বকালে এই কামতা রাজ্যের সীমা আসাম ও উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত হয় কিন্তু কালক্রমে কামতা রাজ্যের সীমা কিছু পরিবর্তিত হয়ে সমস্ত উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে।…. উত্তরবঙ্গের কোনো অংশ সিরাজদৌল্লার শাসনাধীন ছিল না। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন পলাশি প্রান্তরে সিরাজদৌল্লা ইংরাজের হাতে পরাজিত হলে বাংলাদেশ ইংরাজ শাসনাধীন হয় কিন্তু একথা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে কামতা রাজ্য কোনোকালেই বঙ্গদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। স্বাধীনতা লাভের পর ভারত সরকার উত্তরবঙ্গকে পৃথক ভাবে শাসন করার জন্যে চেয়েছিলেন। ভাষা ভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন উত্তরবঙ্গে এলে সেই কমিশনের কাছে উত্তরবঙ্গকে কামতাপুর নামে এক রাজ্য হিশাবে ঘোষণা করার দাবি জানানো হয় ১৯৫৫ সালের ১৩ই মে তারিখে। এই কমিশনের মাননীয় সদস্য হৃদয়নাথ কুঞ্জরু, মিঃ পানিকর ও অন্যান্য সদস্যগণ কামতাপুর রাজ্য গঠনের যৌক্তিকতা স্বীকার করেন এবং প্রস্তাব গ্রহণ করেন। কিন্তু তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে নানা ভাবে বুঝিয়ে কামতা রাজ্যকে পশ্চিমবঙ্গের ভেতরে রাখেন। এরপর বোম্বাই ভেঙে মহারাষ্ট্র ও গুজরাট গঠন (১৯৬০), আসাম ভেঙে নাগাল্যাণ্ড (১৯৬২), পাঞ্জাব ভেঙে হরিয়ানা (১৯৬৬), আসাম ভেঙে মেঘালয় ও অরুণাচল (১৯৭১), মাদ্রাজ ভেঙে অন্ধ্র (১৯৫৩),এই সব উদাহরণ দেন।
