দার্জিলিং থেকে যিনি এসেছিলেন, তার বক্তৃতার পর জানা গেল তিনি অধ্যাপক। তিনি সম্পূর্ণ নতুন কথা বললেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশ তৈরি করার প্রতিশ্রুতি কংগ্রেস দিয়েছিল, সব দল সেটা সমর্থন করেছিল। কেন? না, ব্রিটিশরা তাদের নিজেদের দরকার অনুযায়ী। দেশটাকে যখন যেমন ইচ্ছে ভাগ করে চালাত। মাদ্রাজ ছিল বিরাট একটা প্রদেশ। এখনকার কেরালা বা কর্ণাটক ছিলই না। ত্রিবাঙ্কুর-কোচিন, পেপসু এসব প্রদেশ বা রাজ্য হয়েছিল। বাংলা-বিহার-ওড়িশা একসঙ্গে ছিল, আবার আলাদা হয়ে যায়। উত্তরপ্রদেশ ছিল না, ছিল ইউনাইটেড প্রভিন্স। স্বাধীনতার পরে রাজ্যসীমা পুননির্ণায়ক কমিটি নতুন নতুন রাজ্য তৈরির সুপারিশ করেন, ভাষার ভিত্তিতে নতুননতুন রাজ্য তৈরি হয়। ভাষার ভিত্তি মানে ত জাতি-ভিত্তি। জাতি ও ভাষাগত এক-একটা রাজ্য–এটাই ভারতীয় সাধারণতন্ত্রের আদর্শ। যেমন, পাবলিক সেকটর ভারতীয় শিল্পনীতির আদর্শ। যেমন, পরিকল্পনা ভারতীয় উন্নয়নের আদর্শ। একটার পর একটা পাবলিক সেকটরের কারখানা তৈরি হয়। একবার কতকগুলি কারখানা তৈরি করে দিয়েই ত আর বলা হয় নি যে, ব্যাস এই হয়ে গেল আমাদের পাবলিক সেকটর। তেমনি, একটা পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করেই ত আর বলা হয় নি, ব্যাস এই হয়ে গেল আমাদের পরিকল্পনা। তা হলে রাজ্যসীমা পুননির্ণায়ক কমিটিই বা চিরকালের জন্যে একবার। সব রাজ্যের সীমা ঠিক করে দিয়ে কেন বলবে, ব্যাস এইগুলিই আমাদের একমাত্র রাজ্য। ভারতবর্ষের নিজেরই সীমা গত চল্লিশ বছরে কত বদলে গেছে, বলুন। সিকিম আগে ভারতের মধ্যে ছিল না, সিকিমের বাইরে দিয়ে এখন ভারতের সীমা চলে গেছে। তেমনি আকসাই চীন কার্যত আমাদের হাতে নেই, কার্যত ভারতের মধ্যে নেই। এক আমাদের সার্ভে অব ইন্ডিয়ার মাপেই এসব জায়গাকে ভারতের জায়গা বলে দেখানো হয়, পৃথিবীর আর-সব দেশের ম্যাপে এ-সব জায়গাকে চীনের বলে দেখানো হয়, যেমন, আজাদ কাশ্মীরকে দেখানো হয় পাকিস্তানের জায়গা বলে। তা হলে, ভারতের সীমাই যদি এরকম বদলাতে পারে তা হলে রাজ্যের সীমাইবা বদলাবে না কেন? যখন ১৯৫৩ সালে রাজ্য সীমা স্থির হয়েছিল তখন বিহারের ও বাংলার আদিবাসীরা কিছুই জানত না, গোখারাও কিছু জানত না, আপনারাও কিছু জানতেন না। এখন আমরা যদি জেনেবুঝে বলি আমাদের ভাষা ও জাতির জন্যে আলাদা রাজ্য দাও, তার মধ্যে দোষটা কোথায়? বাঙালিরা তখন বলেছিল, বিহারের কিছু জায়গায় বাংলা ভাষা চালু আছে, যারা থাকে তারা বাঙালি, সেই জায়গাটা পশ্চিমবাংলায় দিয়ে দাও। দিয়ে দেয়া হল। এখন আমরা যখন বলছি যে যারা নেপালি ভাষা বলে তাদের একটা রাজ্য করে দাও–তখন আমাদের বলা হল, বিচ্ছিন্নতাবাদী। আপনারা যদি বলেন আমরা রাজবংশীরা একটা আলাদা রাজ্য চাই–তা হলে বলা হবে বিচ্ছিন্নতাবাদী। আমরা ত আসলে এখনই বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি–নিজের ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন, নিজের হকের জায়গা থেকে বিচ্ছিন্ন, নিজের হক থেকেই বিচ্ছিন্ন। আর যাই হোক, এ কথা ত কেউ বলছে না যে নেপালিরা বাঙালি। তা যদি না বললো, তা হলে আমাদের আলাদা রাজ্য হবে না কেন। আপনাদের আলাদা রাজ্য হবে না কেন? রাজ্য পুননির্ণায়ক কমিটি আবার কাজে হাত দেবে না কেন? নাকি তা হলে পশ্চিমবাংলা ছোট হয়ে যাবে। তা হলে এ কথা ত ব্রিটিশরাও বলতে পারত বাংলাকে ভাগ করলে ছোট হয়ে যাবে, সবটাই পাকিস্তানে যাক। ১৯৫৩ সালে যখন রাজ্য ভাগ বাটোয়ারা হয় তখন আমরা ছিলাম না। ছিলাম না বলে আমাদের কাকা-জ্যাঠারা আমাদের সম্পত্তি দেখাশোনা করেছেন। এখন সাবালক হয়ে যখন আমরা সম্পত্তিতে আমাদের ভাগ চাইছি তখন সেই কাকা-জ্যাঠারা বলছেন-এ ছেলেটা বড় বেয়াদপ, আমাদের সুখের সংসারটাকে ভেঙে আলাদা হতে চাইছে। তা আমরা বলি, কাকা শোনো, জ্যাঠা শোনো, সংসারটাও তোমাদের, সুখটাও তোমাদের, আমার থাকল কী? ছেলে লায়েক হলে তার বিয়েশাদি দিয়ে তাকে সংসার তৈরি করে দিতে হয়। ত, আমার ত দাড়ি গজিয়ে এখন পাকতে শুরু করেছে, গোফ পাকার ভয়ে গোফ ছেটে দিয়েছি, কিন্তু তবু ত আমাকে বিয়েশাদি দিয়ে সংসার করানোর দিকে আপনাদের মন নেই। এ কেমন ব্যবহার। তা, এতদিন। যে আমাদের দেখভাল করলেন তার জন্যে আপনাদের প্রণাম করছি, কিন্তু এখন আমার দেখভাল আমাকেই করতে দিন। আপনারা রাজ্যের সীমা নতুন করে ঠিক করার কমিটি আবার চালু করুন, তার রায় মেনে নিন।
.
১৬৯. তিস্তা ব্যারেজ প্রসঙ্গে বক্তৃতা
জলপাইগুড়ি শহর থেকে যে-দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক কৃষকদের মুক্ত এলাকা তৈরির জন্যে অনেক বছর জেল খেটেছেন তাকে বক্তৃতা করতে ডাকা হয়। কিন্তু তার সঙ্গে এই সম্মিলনের সম্পর্কটা নিয়ে কেউই নিশ্চিত নয়–কে তাকে নেমন্তন্ন করেছে, এখন ইনি কী করেন। সাধারণ ভাবে এ-রকম ভদ্রলোকদের নাকশালিয়া বলেই ডাকা হয়। নাকশালিয়াই হোক আর যাই হোক একজন ভদ্রলোকের ছেলে, বা পড়াশোনাজানা একজন ভদ্রলোকই, যদি এরকম সম্মিলনে হাজির থাকেন তা হলে তাকে কিছু না বলতে দিলে হয়? কিন্তু ভদ্রলোক সবচেয়ে দরকারি কথা বললেন একেবারে উত্তরখণ্ড আন্দোলনের বর্তমান কর্মসূচির প্রধানত বিষয়টি নিয়ে। সরকার জানিয়ে দিয়েছেন আর-মাসখানেকের মধ্যেই তিস্তা ব্যারেজের প্রাথমিক উদ্বোধন হবে। মুখ্যমন্ত্রী উদ্বোধন করেন। তার জন্যে সেদিন সারা উত্তরবাংলা থেকে বামফ্রন্ট মিছিল নিয়ে আসবে। উত্তরখণ্ড দাবি করেছে যে তিস্তা ব্যারেজ এখন উদ্বোধন করা চলবে না। কৃষকদের জমি অধিগ্রহণ করা চলবে না, যে-জমি ব্যারেজের জন্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে তার ক্ষতিপূরণের বদলে সমপরিমাণ জমি কাছাকাছি এলাকায় সরকারি খাশজমি থেকে কৃষকদের দিতে হবে, যে কৃষকদের জমি ব্যারেজের জন্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে তাদের মধ্যে যদি এমন কেউ থাকে যার অন্য জমি ইতিপূর্বে ভেস্ট হয়ে গেছে, তাহলে অধিগৃহীত জমির সমপরিমাণ জমি তার সেই ভেস্ট জমি থেকে ফিরিয়ে দিতে হবে। এই সব দাবির ভিত্তিতে উত্তরবঙ্গের, বিশেষত জলপাইগুড়ি জেলার, নানা জায়গা থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে যাওয়া হবে তিস্তা ব্যারেজ উদ্বোধনের দিন। উত্তরখণ্ডের এই সম্মিলন থেকে বলা হচ্ছে আগামী একমাস ধরে সেই বিক্ষোভ মিছিল সংগঠনের জন্যে। এই নাকশালিয়া ভদ্রলোক এই বিষয়টি নিয়েই বললেন, শুধু এই বিষয়টি নিয়েই। ভারতে ভাকরা-নাঙ্গাল হয়েছে, হীরাকুঁদ বধ হয়েছে, নাগার্জুনসাগর হয়েছে, আরো কত-কত জায়গায় কত নতুন-নতুন ড্যাম হয়েছে, বাধ হয়েছে। এই পশ্চিমবঙ্গেই দামোদর হয়েছে, ময়ূরাক্ষী হয়েছে, মাইথন হয়েছে, পাঞ্চেৎ হয়েছে। কিন্তু যেখানেই হোক না কেন তাতে সর্বনাশ হয়েছে এই সব জায়গায় গরিব অধিবাসীদের, বিশেষত আদিবাসীদের। কেন? এই সব ব্যারেজ, ড্যাম ইত্যাদির জন্যে বাছা হয় পাহাড় ও জঙ্গলের এমন দুর্গম জায়গা যেখানে বন্য পশুর সঙ্গে লড়াই করে পশুর মতই জীবনযাপন করে আদিবাসী মানুষজন, গরিব মানুষজন। কেন? না, ঐ রকম দুর্গম জায়গায় তারা এই ভদ্রলোকদের শোষণের হাত থেকে বাঁচবেন। কিন্তু যখন ব্যারেজ বা ড্যামের জন্যে জমি বাছা হয় তখন সেই জমি থেকে এদের উচ্ছেদ করা হয় প্রথম। উচ্ছেদ করে ঐ ব্যারেজ বা ড্যামেই শ্রমিক হিশেবে নিয়োগ করা হয়। তারপর, ঐ ব্যারেজ বা ড্যামের জলে যখন জমিতে ফসল ফলাবার অবস্থা তৈরি তখন সেই জমির দাম ত সোনার দাম। তখন বড় বড় ব্যবসায়ীরা সেই জমিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবুজবিপ্লব তৈরি করে। ভারতে একটা উন্নয়ন পরিকল্পনার নাম বলুন, যেখানে একটা ব্যারেজ বা ড্যামের ফলে আদিবাসীদের বা গরিব মানুষদের এক ফোঁটা উপকার হয়েছে। আপনাদের এখানে এতদিন এই উপদ্রব ছিল না। তিস্তা ব্যারেজের চেহারায় সেই উপদ্রব শুরু হল। তিস্তা ব্যারেজের জলে নাকি লক্ষ-লক্ষ জমি উর্বর হবে, তাতে চাষ হবে, তাতে সোনা ফলবে, সেই সোনা বেচে কৃষকরা বড়লোক হবে, কিন্তু তার আগেই, ঐ ব্যারেজ থেকে এক ফোঁটা জলও কৃষির কাজে লাগার আগেই কৃষকরা জমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে, কৃষকের জমি নামমাত্র মূল্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যে কৃষককে জমির মালিক থেকে তিস্তা ব্যারেজের শ্রমিকে পরিণত করা হয়েছে সেই কৃষককে কি ব্যারেজের জল সোনার ফলন দেবে? ব্যারেজ হওয়ার আগে তাও কৃষক তিস্তার জল আজলা ভরে খেয়ে নিজের খিদে চাপা দিতে পারত, তিস্তার চরে বাঘভালুকের সঙ্গে লড়াই করে দু-এক মুঠো ধান ফলাতে পারত, ব্যারেজ হওয়ার পর কৃষক তাও পারবে না, কারণ আগে ত তিস্তার জল ছিল আকাশের বাতাসের মত–যার খুশি নিশ্বাস নাও। কিন্তু এখন ত তিস্তার জল সরকারি ব্যারেজের জল, এখন ত সে-জলের দাম আছে, যার ইচ্ছে সে ত এখন এই জল দুহাত ভরে তুলে নিতে পারবে না, খাওয়ার জন্যেও নিতে পারবে না। তিস্তার চর ত আর পতিত জমি নয় যে হাল যার ফলন তার। ব্যারেজের ফলে তিস্তার দামও ত হুহু করে বাড়ছে। এ কেমন উন্নয়ন যেখানে নদীর জলের ওপর তার স্বাভাবিক অধিকার কৃষক হারাবে? চরের জমির ওপর তার স্বাভাবিক দখল সে হারাবে? বনের জমির ওপর বাঘভালুকের স্বত্ব আছে কিন্তু সে-জমি কৃষক চাষ করলেই হয়ে যাবে স্কোয়াটার বা অনধিকারী দখলদার। এতদিন ভারতের মানুষকে বোকা বানিয়ে এই সব ব্যারেজ, ড্যাম তৈরি করা হয়েছে কিন্তু নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে লোকজন শিক্ষা নিয়েছে। ওড়িশাতেই দুটো ঘটনা ঘটেছে–একটা বালিয়াপোলে, আর-একটা কোথায় আমার মনে পড়ছে না। বালিয়াপোলে সরকার কামানের গোলা পরীক্ষার জন্যে সমুদ্রের ধারের জমি অধিগ্রহণ করেছে। কিন্তু সেখানকার লোকজন তাদের দখল ছাড়ছে না। সেখানে তুমুল আন্দোলন চলছে। সরকার এখনো তার দখল নিতে পারছে না। আর-একটি জায়গায় এক পাহাড়ে নতুন একটি উদ্যোগ নেয়া হলে সেখানকার আদিবাসীরা প্রবল প্রতিরোধ তৈরি করে বলেছেন তারা এই উদ্যোগ চান না। আপনাদের উত্তরখণ্ড আন্দোলনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আপনাদের হাতে। সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। কিন্তু মাসখানেক পরে তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বিক্ষোভ দেখাবার যেকর্মসূচি আপনারা নিয়েছেন–সেই কর্মসূচিকে সমস্ত শক্তি দিয়ে সফল করুন। আপনারা যদি চেষ্টা করেন, তা হলে তিস্তা ব্যারেজ বন্ধ করে দিতে পারবে, যা হয়েছে তাও অকেজো করে দিতে পারেন। সেটাই হবে আপনাদের প্রধান সাফল্য।
