কিন্তু সদর রাস্তার ওপর এই সম্মিলনের জন্যেই পাবলিকের একটা সঁকো তৈরি না হওয়ায় বেশ জুতমত একটা গেট বানানো যায় নি। নিখিল বঙ্গ উত্তরখণ্ড সম্মিলন লেখা নীল রঙের ফেস্টুন–একটা টাঙাতে হয়েছে প্যান্ডেলের পেছনের হেশিয়ানের ওপর রাস্তার দিকে মুখ করে। আর, একটা টাঙানো হয়েছে পান-সিগারেটের দোকানটায় পাশে কোনাকুনি, সেটাও রাস্তার দিকে মুখ করে। কিন্তু গেট না থাকায় সেই ফেস্টুন দুটো কেমন আলগা হয়ে ঝোলে। রাস্তা থেকে ও-দুটো দেখা যায় ঠিকই, বাসের লোকজনও দেখতে পায়, কিন্তু এই সম্মিলনের লোকজনের চোখের আড়ালেই থেকে যায় ফেস্টুনদুটো। টিনের বেড়ার গায়ে দড়ি দিয়ে আর-একটা ফেস্টুন ঝোলানো আছে কিন্তু দড়িগুলো টানাটান হয় নি বলে সেটাতে এত নানা রকম ভাজ পড়েছে যে ঠিক পড়া যায় না। তা ছাড়া, টিনের ওপর কাগজে লেখা নানা পোস্টার আছে–কোন দিন কী অনুষ্ঠান হবে সে-সব জানিয়ে, সেগুলোই বেশি চোখে পড়ে।
গেট একটা বানানো হয়েছে ময়নাগুড়ির চৌপত্তিতে, পেট্রল পাম্পের কাছে, একেবারে ন্যাশন্যাল হাইওয়ের ওপরে! হাইওয়ের ওপর বলেই গেটটা উঁচু করতে হয়েছে, যাতে আসাম থেকে ও আসামের দিকে যে-সব ট্রাক পাহাড়প্রমাণ মাল নিয়ে যায় সেগুলোর মাথা না ঠেকে। অত উঁচু করার জন্যে ইলেকট্রিক ও ফোনের তারের ওপরে গেটটাকে তুলতে হয়েছে বটে কিন্তু তারও ওপরে হাই ভোল্টেজ লাইন থেকে অনেকটা নামিয়ে রাখতে হয়েছে। অত বড় রাস্তার এপার-ওপার জুড়ে গেটটা এত চওড়া আর উঁচু হয়েছে যে চোখে পড়লে তাক লেগে যায়। মাথার ওপর লেখা নিখিল বঙ্গ উত্তরখণ্ড সম্মিলন, ময়নাগুড়ি। কিন্তু চোখে পড়াটাই মুশকিল। গেটটার পুরো মাথাটা যত বড়, এক-একটি স্তম্ভ তত মোটা নয়। দুই স্তম্ভকে যুক্ত করেছে আড়াআড়ি মাথার ওপরের যে-অংশ সেটাও সরু। ফলে, গেটটা কেমন দু-পাশের ও মাথার ওপরের দোকানপাট, বাড়িঘর, গাছপালার সঙ্গে মিশে আছে। এতই মিশে আছে যে ট্রাক বা বাস থেকে নজরে ত পড়েই না, এমনকি রিক্সায় চড়ে যেতেও চোখে পড়ে না। কিন্তু একবার যদি নজরে পড়ে যায়, তা হলে বারবারই দেখতে হয়–হ্যাঁ, গেট একখান হইছেন বটে। সাত দিনের এই সম্মিলনে যারা আসে-যায় তাদের আর এই গেট না দেখে উপায় কী আছে? কিন্তু সম্মিলনের মূল জায়গায় রাস্তার ওপর কোনো গেট না থাকায়–চৌপত্তির এই গেটটা যে ঐ সম্মিলনেরই গেট তা বোঝা যায় না।
সম্মিলনের মাঠের ভেতর সাইকেল, মোপপড, মোটর সাইকেল, স্কুটার রাখার ব্যবস্থা হয়েছে বটে কিন্তু গরুর গাড়ি রাখার কোনো জায়গা নেই। যদি রাস্তা থেকে সঁকো একটা তৈরি করা যেত, তা হলে অত বড় মাঠের একটা দিক গরুর গাড়িতে ভরে যেত, যেমন সব হাটে হয়। সঁকো না-থাকায় গরুর গাড়িগুলোকে রাস্তার পাশেই লাইন দিয়ে দাঁড় করাতে হয়। তাতেও অসুবিধে। ন্যাশন্যাল হাইওয়ে হলেও রাস্তাটা তত চওড়া নয়। আপ-ডাউনের গাড়ির রাস্তা ছেড়ে দিলে আর কতটুকু জায়গা থাকে? সেখান থেকেই ত খালের ঢাল। সে-ঢালে গরুর গাড়ি নামিয়ে দিলে ভোলা মুশকিল। অথচ, গরুর গাড়ির সংখ্যাও ত নেহাৎ কম নয়। সন্ধ্যাবেলার ফ্যাংশন দেখার জন্যে সেই দুপুরের পর থেকেই। পাশাপাশি গায়ের মেয়েরা বাচ্চারা হেঁটে, রিক্সায় ও গরুর গাড়িতে আসতে শুরু করে। ফাংশন শুরু হওয়ার আগেই মাঠ রাস্তা মিলে একটা মেলার মত হয়। এক-একটা বড় গাছের নীচে রাস্তার ওপর, গরুর গাড়িগুলোকে রাখা হয় আর গরুগুলোকে, হয় গাড়ির চাকার সঙ্গে, আর না-হয় খুঁটি পুঁতে তাতে, দড়ি ছোট করে বেঁধে দেয়া হয়। মেয়েরা ও বাচ্চারা নানা রঙিন শাড়ি-জামায় সেই গাছতলাতেই অপেক্ষা করে–যতক্ষণ ভেতরে নিয়ে যাবার জন্যে দেউনিয়া না আসে।
.
১৬৮. উদ্বোধন অনুষ্ঠানের বিভিন্ন বক্তৃতার সংক্ষিপ্তসার
শনিবার সকালে সম্মিলনের উদ্বোধন হল। সময় ছিল সকাল আটটা। কিন্তু মোটামুটি লোকজন জমতে-জমতেই বেলা নটা হয়ে গেল। সকালে শুধু পতাকা উত্তোলন ও কয়েকজন বিশেষ বক্তার বক্তৃতা ছিল। পতাকা তুললেন রাজবংশী সমাজের প্রধান নেতা পঞ্চানন মল্লিক। আর বক্তৃতা করলেন আসাম ও দার্জিলিং থেকে আসা দুই প্রতিনিধি আর কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি। স্থানীয় যারা বললেন তারা সরাসরি উত্তরখণ্ড আন্দোলনে যোগ দেন নি, কেউ-কেউ পার্টিতেও নেই, কিন্তু বিভিন্ন পেশায় ও রাজনীতিতে নিজেরা প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত অত বড় প্যান্ডেলে শ-দেড়েক মত উপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে অনেকেই বিকেলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত কর্মী। সুস্থিরের সঙ্গে কাজ করেন এমন কয়েকজন প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠিত ভাবে এসেছিলেন। আর, ময়নাগুড়ি বাজারের যে ব্যবসায়ীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত তাদেরও কেউ-কেউ। এ-ছাড়া বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছিলেন কয়েকজন–তাঁদের প্রতিনিধিই বলা যায়–যেকদিন সম্মিলন চলবে সেই ক-দিনই তাঁরা থাকবেন। এ ছাড়াও সম্মিলনে উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন যারা রাজবংশী নন, কোনো ভাবেই উত্তরখণ্ড আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত নন। তাদের একজন ৭০-৭১ সালে লাটাগুড়ি এলাকায় কৃষকদের মুক্ত এলাকা তৈরি করতে গিয়ে কৃষকদের হাতে মার খেয়ে হাসপাতালে যান, হাসপাতালের বেডেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, তার বেডের পাশে কয়েকজন পুলিশ বসে, কিছুদিন পর তাকে কলকাতার এক হাসপাতালে বদলি করা হয়, সেখানে হাড়টাড়ের ওপর অনেক অপারেশন হয়, তারপর জেলেও থাকতে হয়। সব মিলিয়ে সাত-আট বছর পর ছাড়া পান। দাড়ি তখনো ছিল, এখনো আছে। কিন্তু সে-দাড়িতে এখন বেশির ভাগই শাদা ছোপ। এখন থাকেন জলপাইগুড়ি শহরেই, বাবার বাড়িতেই। কিছু করেন না। কিন্তু মাঝেমধ্যে এখানকার স্থানীয় নানা আন্দোলনে উপস্থিত থাকেন। তার কিছু করারও নেই কিন্তু এই ধরনের স্থানীয় সমস্যার ব্যাপারে তার যেন এক ধরনের আগ্রহ আছে। ইনি এসেছিলেন সঙ্গে একজন বন্ধুকে নিয়ে। কেউ তাকে নিমন্ত্রণ করেছে কি না বা আসতে বলেছে কি না–সেসব প্রশ্ন ওঠেই না। পাজামা-পাঞ্জাবি-দাড়ি আর একটা চাদরে এমন পরিচিত একজন ভদ্রলোককে দেখলে এসব সম্মিলনে একটু জোর আসে।
