হেমেনবাবু ও সন্তোষবাবু হেসে ওঠেন বটে ও মুহূর্তে বোঝা যায় এই প্রস্তাবটা সকলে মেনে নেবে কিন্তু হেমেনবাবু অভিযান বাদ দেয়ার কথাটা নিয়ে আরো রগড়াবেন কি না এই নিয়ে একটি চাপা উদ্বেগও থাকে।
হেমেনবাবু বলেন, তার চাইতে জল্পেশ্বরের দিকে আর-একটু এগিয়ে আসুন, আপনারা বরং টাউনের বাইরে জমায়েতটা করুন।
বেশ, তাই হবে, বলে নকুল হাত তুলে দেয়। আর-কেউ কোনো আপত্তি না করায় নকুল দাঁড়িয়ে উঠে বলে, আমরা যারা এই কালচারাল ফাংশনের পার্টনার তাদের পক্ষ থেকে মাননীয় পর্যটন মন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, বনমন্ত্রী ও এম-এল-এ সাহেবকে অনুরোধ করছি এই ফাংশনে, বিশেষত শেষ দিন, সপরিবার উপস্থিত থাকতে।
আরে থাকব বলেই ত তোমাদের এত করে বললাম উত্তরখণ্ডটা সরাও, শ্রীদেবীটা রাখো, তা তোমরা শুনলেই না, বলে সুবিমলবাবু অনেকক্ষণ ধরে চেয়ার ছেড়ে ওঠেন।
.
১৬৭. সম্মিলন ও অনুষ্ঠানপ্রাঙ্গণ
ময়নাগুড়ি ব্লক অফিসের পাশের মাঠে বিরাট প্যান্ডেল-হেশিয়ানের। ভেতরে খড়ের ওপর ত্রিপল ও হেশিয়ান বিছিয়ে বসার ব্যবস্থা। সামনের দিকে, একটু কোনাকুনি, স্টিলের ও কাঠের ভাজ করা চেয়ার–সেগুলো গিয়ে শেষ হয়েছে হেশিয়ানেরই বেড়ায়। ঐ চেয়ারগুলির জন্যে দর্শকদের কোনো অসুবিধা হবে না। খড়ের ওপর বেছানো হেশিয়ানের আসন আবার বাশ দিয়ে তিন ভাগ করা-ফাস্ট, সেকেন্ড, থার্ড ক্লাশ। পুবদিকে কোন গেট নেই। পশ্চিমদিকে তিনটি বড় গেট, কিন্তু তাতেও পর্দা ঝুলছে। এই পুরো প্যান্ডেলটিকে ঘিরে চারদিকেই টিনের বেড়া, বেশির ভাগই কাঁচা বাঁশের কাঠামোতে। স্টেজের পেছন দিকে ও পাশে কাঠের কাঠামো–তাতে টিনগুলো ভ্রু দিয়ে আঁটা। টিনের বেড়ায় ঢোকার রাস্তা বেশ চওড়া। সেই রাস্তাগুলি আবার বাঁশ দিয়ে দুভাগ করা–পুরুষদের ও মহিলাদের জন্যে। স্টেজের পেছনে স্টেজের চাইতে একটু কম উচ্চতায় কাঠের পাটাতন বিছিয়ে গ্রিনরুম। সেই গ্রিনরুম ও স্টেজ কাঠের কাঠামোতে টিন দিয়ে আলাদা করে ঘেরা। ঢোকার জন্যে দুদিকে দুটো কোল্যাপসিবল গেট-সেটা দিয়েই স্টেজে ঢোকা যায়। গ্রিনরুমের জন্যেই আবার একটা কাঠের দরজা–সেটা প্রয়োজনে ভেতর থেকে বন্ধ করা যায়।
এই প্যান্ডেলের বাইরের মাঠটাতে নানা রকম দোকান বসেছে। বেশির ভাগই খাবারের। একটা বেশ লম্বা দোকানের উনুনটা বাইরের দিকে। সেখানে জিলিপি আর সিঙাড়া ভাজা হয়। সেই দোকানটিতে ভেতরে বসার ব্যবস্থা আছে। অনেকে বসেও বটে, কিন্তু বেশির ভাগই বাইরে উনুনের সামনে দাঁড়িয়ে গরম-গরম জিলিপি আর সিঙাড়া খবরের কাগজের টুকরোর ওপর নেয়। তাই দোকানটাতে দুটো ক্যাশ বাক্স, একটা দোকানের ভেতরে আর একটা ঐ উনুনের পাড়ে। এই দোকানটি ছাড়া ছোট ও মাঝারি দোকানও আছে। শুধু একটা টেবিল ও একটা উনুনি নিয়ে চায়ের দোকান। মাঠের ওপর প্লাস্টিকের চাদর বিছিয়ে চিনির রসে পাকানো শুকনো মিষ্টি। এলুমিনিয়ামের সসপ্যানে রসগোল্লা আর লাড্ড নিয়ে বসে একজন একটা টুলের ওপর। মাথার ওপর ভামনির ছাউনি দিয়ে তার তলায় শোয়ানো কাঁচের শো-কেসে মেয়েদের নানা রকম নকল গয়না কাগজে সঁটা। পেছনে কাঠের তাকে প্লাস্টিকের নানা রকম খেলনা। একটা দোকানে প্লাস্টিকের বালতি-গামলাও বিক্রি হচ্ছে। খোলা মাঠের মধ্যে পেছনে টাঙানো একটা পর্দায় সারি-সারি বেলুন। একটু দূরে একটা টেবিলের ওপর রাখা একটা খেলনা বন্দুক। ঐ বেলুনগুলিতে নম্বর দেয়া আর নীচে সারি সারি প্রাইজেও নম্বর দেয়া। কুপির আলো জ্বালিয়ে চানাচুর বাদামওয়ালা আর তিলেরখাজাওয়ালা। রাস্তা দিয়ে ঢুকলে বায়ে-ডাইনে দু-দুটো পান-সিগারেটের দোকান–চৌকির ওপর। ঢোকার সময় ডান দিকের পান-সিগারেটের দোকানের পেছনে সাইকেল, মোপেড, স্কুটার ও মোটর সাইকেল রাখার জায়গা।
এই মাঠটা ব্লক অফিসের পাশে কিন্তু রাস্তা থেকে এই মাঠে আসার কোনো ব্যবস্থা নেই। রাস্তাটা মাঠ থেকে অনেক উঁচু। রাস্তা থেকে মাটি ভাঙতে-ভাঙতে গড়াতে-গড়াতে বিরাট নালায় এসে পড়েছে। নালাটার ভেতর এখন এই শীতে ভেজা কাল মাটি আর সেই মাটির ওপর সবুজ শ্যাওলার আস্তরণ। কিন্তু সব জায়গায় সমান নয়। কোথাও কাল ভেজা মাটির ঢিবি, কোথাও কাল ভেজা মাটির গর্ত। এই নালীটা সরকারি জমি। তাই এখান থেকে যে যার খুশিমত মাটি কেটে নিয়ে নিজের জমি উঁচু করে নিয়েছে। ফলে, রাস্তার পাশে টানা একটা শুকনো খালের মত নালীটা পড়ে থাকে।
রাস্তা থেকে সরাসরি খাল পেরিয়ে মাঠে উঠে আসা সম্ভব নয় আর এই খালটার ওপর বাশ বা কাঠের কোনো অস্থায়ী সঁকো তৈরি করা হয় নি। কিন্তু শ্রীদেবীর গাড়ি ঢোকানোর জন্যে সাধারণের পক্ষে নিষিদ্ধ একটা কাঠের কালভার্ট তৈরি করা হয়েছে। ব্লক অফিসে ঢোকার বড় ক্যালভার্টটাই প্রধান প্রবেশ পথ। সেই ক্যালভার্ট দিয়ে খালটা পেরিয়ে ব্লক অফিসের দেয়াল ডান হাতিতে রেখে বেঁকলেই মাঠটাতে ঢোকা যায়। সেখানে যে একটু-আধটু গর্ত ছিল খালের মাটি কেটে সেগুলো ভর্তি করা হয়েছে। দু-চার ট্রাক বালি ঢেলে লেবেল করে দেয়ায় ঐ জায়গাটাকে প্রায় সদর রাস্তার মতই লাগছে–এক ঐ ব্লক অফিসের দেয়ালের পাশের জায়গাটা একটু সংকীর্ণ, তবু সেখান দিয়েও মোটর সাইকেল চলে আসছে।
