সন্তোষবাবু সুস্থিরের কাধ থেকে হাতটা তুলে নেন। সুস্থির সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে–তার কাঁধে ঝোলা, বা হাতটা কনুইয়ের সমকোণে ভেঙে পেট আর বুকের মাঝখানে, ডান হাতটা খাড়া ঠোঁটে, মুখে সামান্য দাড়ি। সেই মুহূর্তে তাকে খুব একা লাগে, যেন, সুস্থির বুঝে গেল যে বীরেনবাবু, নকুলবাবু, সন্তোষবাবু এরা সব একমত হয়ে গেলে তার আর-কিছু করার নেই। তখন সুস্থির শারীরিক ভাবেও একাই-সন্তোষবাবু তার সামনে দাঁড়িয়ে মাত্র, অন্য সবাই দৌড়ে গেছে আরো কয়েকজনকে ডেকে আনতে যাতে মিটিংটা শুরু হওয়ার আগে তারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে নিতে পারে।
নকুল-জগদীশ মিটিঙের ঘর থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসে। এসে বলে, বীরেন কাকাকে ডেকে নিয়ে উপেনবাবু গল্প করছেন। আমাদেরই ঠিক করতে হবে। এখানেই বসুন। ততক্ষণে সুরেন, শান্তি, ভূপেনবাবু এদিকে এসে এদের সঙ্গে মাঠের মধ্যেই বসে যান। এখানে এদের এতজনকে মাঠের মধ্যে গোল হয়ে বসতে দেখে যারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল তারাও এসে গোল হয়ে বসে। এখানে চাপা স্বরে একটা পুরো দস্তুর মিটিঙ শুরু হয়ে যায়।
খানিকক্ষণ পর সার্কিট হাউসের বারান্দা থেকে ডাকাডাকি শুরু হয়,–সগায় আইসেন, মিটিঙ-মিটি।
শুনে ওরা একসঙ্গে উঠে পড়ে মিটিঙের ঘরের দিকে চলে। নতুন লোক কেউ আসে নি বরং দু-একজন চলে গিয়ে থাকতে পারে। কে কোথায় বসেছিল সে জায়গা নির্দিষ্ট হয়ে আছে। ফলে, মিটিঙটা আবার আগের অবস্থায় আসতে দেরি হয় না। শুধু এইটুকু তফাৎ-শিল্পমন্ত্রী বীরেনবাবুর বক্তব্য শোনার পর তার চেয়ারটাকে যেখানে টেনে এনেছিলেন সেখানে উপেনবাবু বসে আছেন। আর উপেনবাবুর পাশের চেয়ারে শিল্পমন্ত্রী। অফিসাররা সবাই একটা করে চেয়ার সরে গেছেন।
শিল্পমন্ত্রী দাঁড়িয়ে বললেন, আমরা উপেনবাবুকে অনুরোধ করেছিলাম আজকের সভায় থাকতে। কিন্তু তিনি খুব অসুস্থ। তাই সবার সঙ্গে একটু দেখা করে গেলেন। এখনই উনি চলে যাবেন। তাই আপনাদের সবাইকে উনি দেখতে চাইলেন।
উপেন্দ্রনাথ দাঁড়িয়ে নমস্কার করেন। সুস্থির ও আরো অনেকে দুই চোখ বড় বড় করে দেখে সেই কিংবদন্তির নায়ককে। সেকালের একজন রাজবংশী এম-এ বি-এল শুধু নন–দেশের যে-দায়িত্ব তিনি পেয়েছেন সেখানেই নিজের কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন, দিল্লি, কলকাতা, লন্ডন, লস এঞ্জেলস; এই রাজ্যের বিধান পরিষদ একদিন পরিচালিত হয়েছে এই রাজবংশীর নির্দেশে, আর জীবনে তিনি কোনো সময় ভুলে যান নি তিনি রাজবংশী। এখনো উপেন্দ্রনাথের লেখা জল্পেশ্বর মন্দিরের ইতিহাস প্রচার করছে সুস্থিররা তাদের জল্পেশ্বর অভিযানের জন্যে। উপেন্দ্রনাথের মোটা তুষ চাদর বা কাধ আর ডান বগলের তলা দিয়ে ঘোরানো। মাথায় সামান্য চুল, গোটা দুদিকে সরু ও লম্বা–প্রায় সবটাই পাকা। মুখে স্মিত হাসিবিনয়ের ও আত্মবিশ্বাসের। চোখ তুলতে পারেন না–একটু যেন লাজুক। পাঞ্জাবির ঢোলা হাতা ঝুলিয়ে সকলকে নমস্কার করে আস্তে বলেন, আমি যাচ্ছি। আপনাদের নমস্কার।সকলে মিলেমিশে একমত হয়ে সব ঠিক করেন। আচ্ছা বলে একটু ঘুরে দাঁড়ান। শিল্পমন্ত্রী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান, সঙ্গে-সঙ্গে সবাই নমস্কার করে উঠে দাঁড়ান। শিল্পমন্ত্রী দুপা এগিয়ে যান, ডি-সি পেছন থেকে বলেন, স্যার, আমি ওঁকে তুলে দিয়ে আসছি, আপনি মিটিঙে বসুন। উপেন্দ্রনাথ একটু ঘুরে নমস্কার করে ধীর পায়ে বেরিয়ে যান। শিল্পমন্ত্রী এসে তার পুরনো চেয়ারেই বসেন।
শিল্পমন্ত্রী এসে বসতেই সন্তোষবাবু জিজ্ঞাসা করেন, উপেনদাকে আবার এটা বলেন নি ত যে শ্রীদেবী নাচবে?
সকলে হো হো করে হেসে ওঠায় সুবিমলবাবু বলেন, উপেনদাকে দিয়ে শ্রীদেবীর নাচটা ওপেন করালে কেমন হয় হেমেন?
এতে আর-এক চোট হাসি ওঠে, যেন, এখানে সবাই পারিবারিক বয়োজ্যেষ্ঠের কাছে গোপন করে কোনো নিষিদ্ধ আনন্দ ভোগ করছে–সেখানে তাদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই। ডি-সি এসে তার চেয়ারে বসেন। ফলে, শিল্পমন্ত্রী আর ডি-সির মাঝখানে একটা চেয়ার খালি পড়ে থাকে।
সন্তোষবাবু তার লম্বা হাতটা তুলে বলেন, সুবিমল, দেখো, আমার একটা প্রপোজাল আছে। এনাফ হিট হ্যাঁজ বিন জেনারেটেড বাই দি ফায়ারি ওরাটরি অব আওয়ার এসটিমড এম-এল-এ ফ্রম ময়নাগুড়ি।
তার পাল্টা আরো তাপ বিকিরণ করার জন্যে আমাদের জ্বালাময়ী বক্তা সুস্থির উঠে দাঁড়িয়েছিল বটে কিন্তু উপেনদার উপস্থিতি আমাদের এ যাত্ৰা বাঁচিয়েছে। সন্তোষবাবু কথা বলছিলেন সকলের দিকে মুখ ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে, বিশেষ করে উত্তরখণ্ডীদের দিকে, নিজে একটু হাসছিলেন। তাঁর পাশে নকুল হাসি-হাসি মুখ করে বসেছিল, যেন তার হাসি দিয়েই সে সন্তোষবাবুর প্রস্তাবটাকে যতটা পারে সাহায্য করতে চায়।
সন্তোষবাবু বলে যান, আইনশৃঙ্খলার ব্যাপার নিয়ে সরকারের উদ্বেগ দেখে আমরা প্রস্তাব দিচ্ছি যে উত্তরখণ্ড সম্মিলন যেখানে যেমন হচ্ছে সেরকমই হোক, কিন্তু শেষ দিন জল্পেশ্ব অভিযান সম্মিলনের জায়গা থেকে শুরু না হয়ে, চৌপত্তির এদিক থেকে শুরু হোক।
হেমেনবাবু সঙ্গে-সঙ্গে বলেন, অভিযানটা বাদ দেন না, আর সবই করেন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার জন্যে অভিযান পরিত্যক্ত। চৌপত্তিতে দাঁড়াবে কোথায় লোজন?
