.
১৬৬. উপেন্দ্রনাথ বর্মন ও উভয় পক্ষের ঐকমত্য
শেষ কথাটা হেমেনবাবু ধপ করে চেয়ারে বসে বলেন। বসেই তিনি চারদটা টানেন। কিন্তু নিজেই চাদরের ওপর বসে পড়ায় চাদরটা বেরয় না। ফলে হেমেনবাবু একটু উঠে চাদরটা টেনে বের করে নিয়ে ঘাড়ের ওপর ফেলেন।
হেমেনবাবুর বক্তৃতার শেষে সমস্ত মিটিঙের আবহাওয়া বদলে যায়। তার পুরো বক্তৃতার সময় ধরেই অবস্থাটা বদলাচ্ছিল বটে কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল না কতটা বদলাবে। বীরেনবাবুর কথাগুলির পর মিটিঙের পরিস্থিতি যেমন বদলেছিল, এ বদল তেমন নয়। বীরেনবাবু মিটিঙের নিয়মকানুনের মধ্যে, মন্ত্রী ও অফিসারদের কথার ভেতরই একটা শক্ত পাল্টা যুক্তি খাড়া করেছিলেন। সেই পাল্টা যুক্তির জোরটা মেনেই শিল্পমন্ত্রী একটু নরম হয়ে মীমাংসার একটা প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সে-প্রস্তাবটা মেনে নিলে হেমেনবাবু হয়ত কিছুই বলতেন না। কিন্তু মেনে না নেওয়ায় হেমেনবাবু মিটিঙের এতক্ষণের সব আলোচনা নস্যাৎ করে দিয়ে সেই সব কথাই তুললেন যে কথাগুলি এতদিন ও এতক্ষণ এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সম্মিলন ও অনুষ্ঠানের লোকজন অনেকখানি উদ্বেগ নিয়েই মিটিঙে এসেছিল। কিন্তু মিটিঙের পরিবেশ-পরিস্থিতি দেখে তারা একটু জোর পেয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত সম্মিলনও হবে, অনুষ্ঠানও হবে। কিন্তু শিল্পমন্ত্রীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর হেমেনবাবু অবস্থাটা যে এরকম বদলে দেবেন এটা কেউই ভাবতে পারে নি।
হেমেনবাবু বসে পড়ার সঙ্গে-সঙ্গেই সুস্থির উঠে দাঁড়ায়, হেমেনবাবু এম-এল-একে ধন্যবাদ যে তিনি আমাদের বিরুদ্ধে তার সমস্ত কথাই বলি দিছেন। কিন্তু শিল্পমন্ত্রী হঠাৎ তার চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে সুস্থিরকে বলেন, আপনি বসুন, বসুন, এখন কোনো কথা হবে না, বসুন।
আপনারা আমাদের মিটিঙে ডেকে এনে কথা বলতে দেবেন না? বলে সন্তোষবাবু দাঁড়িয়ে ওঠেন, হেমেনবাবু যা ইচ্ছে তাই অভিযোগ করে যাবেন? আমাদের রাজবংশীদের ঐতিহ্য, ধর্ম, কালচার সব কিছু নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন? তখন শিল্পমন্ত্রী, সুস্থির ও সন্তোষবাবু তিনজন দাঁড়িয়ে কিন্তু সন্তোষবাবু লম্বা বলে ও তার গলার জোর বেশি বলে কথা বলে যাওয়ার সুযোগটা নিয়ে নেন, হেমেনবাবুর রাজবংশীদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি এখন পছন্দ না হতে পারে; তিনি কমিউনিস্ট হয়ে এখন জল্পেশ্বর মন্দিরের মাহাত্ম্য ভুলে যেতে পারেন, তিনি তিস্তাবুড়ির পুজোকে কুসংস্কার ভাবতে পারেন কিন্তু আমাদের কাছে জল্পেশ্বর সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা। তিস্তাবুড়ি আমাদের কাছে মা গঙ্গা। তিস্তা নদী নয়, তিস্তা দেবতা। হেমেনবাবুর যদি ইচ্ছে হয় তিনি তিস্তা ব্যারেজের পুজো করতে পারেন কিন্তু আমরা তিস্তা বুড়িরই পূজো করব। তাতে যদি আমাদের অপরাধ হয়, অপরাধ হবে। কিন্তু এই ভাবে আমাদের–
হঠাৎ খাবার জায়গায় পার্টিশনের কাছে কিছু যাওয়া-আসা শুরু হয় আর ডেপুটি কমিশনার চট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে শিল্পমন্ত্রীর কানেকানে কিছু বলে বেরিয়ে যান। উপেন বাবু, উপেনবাবু কথাটা শোনা যায়। শিল্পমন্ত্রী বসার জায়গার দিকে একবার মুখটা বাড়িয়ে সন্তোষবাবুকে বলেন, উপেনদা এসেছেন, এখন আপাতত এই আলোচনা একটু বন্ধ থাক। উপেনদার সঙ্গে আমরা সবাই একটু কথা বলে নেই। তারপর, আবার আলোচনা শুরু হবে। ফলে, সন্তোষবাবুকে বসে পড়তে হয়।
সুবিমল বাবু পা নামিয়ে বসেন, বনবিভাগের রাষ্ট্রমন্ত্রী উঠে পড়েন, শিল্পমন্ত্রী বসার জায়গার দিকে চলে যান, ডি-সি ও এস-ডি-ওও তার সঙ্গে যান, ফলে মিটিঙটা ভেঙেই যায়। উত্তরখণ্ডের কেউ-কেউ বসার জায়গার দিকে যান উপেনবাবুর সঙ্গে দেখা করতে, কেউ দরজা দিয়ে বাইরে চলে যান। বীরেনবাবু তার জায়গাতেই বসে থাকেন।
কিছুক্ষণ পরই মিটিঙটা ভেঙে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে, বসার জায়গায় উপেনবাবুকে ঘিরে মন্ত্রীরা, মিটিঙের টেবিলে বাকি অফিসাররা ও অন্যান্যরা কেউ-কেউ, বাইরে বারান্দায় ও মাঠে উত্তরখণ্ড ও অনুষ্ঠানের নোকজন এক-একটা দল পাকিয়ে উত্তেজনায় ফেটে পড়ছে।
এরকম একটা দলে সুস্থির চিৎকার করে নকুলকে বলে, আপনাদের যাকে ইচ্ছা তাকে নাচান, আমরা সম্মিলন করব, আমরা আর এই মিটিঙে থাকব না।
সন্তোষবাবু হঠাৎ সুস্থিরের ঘাড়টা বা হাত দিয়ে চেপে ধরে ডান হাতের আঙুল নাচিয়ে বলে ওঠেন, তোমাদের মত ফায়াররইটারদের জন্যেই আমাদের উত্তরখণ্ড মার খাবে। প্রথমত, তোমরা একটা বেআইনি কাজ করেছ–পারমিশনই নাও নি কনফারেন্সের। তার ওপর পারমিশন নিয়েছ কালচারাল ফাংশনের, করছ পলিটিক্যাল কনফারেন্স। গবর্মেন্ট যদি ইচ্ছে করে তোমাদের কনফারেন্স এক মিনিটে বন্ধ করে দিতে পারে। তার প্রতিক্রিয়া কী হবে সেটা আন্দাজ করতে পারছে না বলেই বন্ধ করার সাহস পাচ্ছে না। সরকারের সবগুলি দল যদি তোমাদের এগেইনস্টে নামে তোমরা কী করতে পারবে? তার চাইতে এখনি একটা কমপ্রোমাইজে রাজি হয়ে যাও। জল্পেশ্বর অভিযানটা করা দিয়ে কথা–সেটা যদি করতে না পার তাহলে ওকনফারেন্সের কোনো মানেই নেই। তার জন্যে যদি একটা দিন পেছতে হয় বা জায়গাটা বদলাতে হয়–একটা চেঞ্জে রাজি হও। তোমরা যদি কিছু না ছাড়ো, তা হলে ওরাইবা রাজি হবে কী করে? ডাকো, সবাইকে ডাকো, বীরেনদা কোথায়?
