শিল্পমন্ত্রীর কথার ভঙ্গিতে উত্তরখণ্ডীরা ও অনুষ্ঠানের লোকজন হঠাৎ যেন বুঝে যায় যে সম্মিলন বা অনুষ্ঠান বাতিল হচ্ছে না, বীরেনবাবু মোক্ষম যুক্তি দিয়েছেন। বা বীরেনবাবুর যুক্তিকে মোক্ষম বলে মন্ত্রীরা মেনে নিয়েছেন।
শিল্পমন্ত্রী সেটা ইচ্ছে করেই বুঝতে দিলেন কি না–সেটা বোঝাও যাবে না, জানাও যাবে না। অতটা সূক্ষ্ম হিশেব করে কথা বলা হয়ত সম্ভবও নয়। কিন্তু শিল্পমন্ত্রীর একটা স্কুল হিশেব ছিল যে আজ বাদে কাল সম্মিলন ও অনুষ্ঠান, কোনো অবস্থাতেই কিছু বাতিল করা যাবে না। যদি কোনো রকমে জল্পেশ্বর অভিযানটা ঠেকানোযায় বা পেছুনো যায়, বা সম্মিলনটাই একটু পেছিয়ে দিতে এদের রাজি করানো যায় তবে তাই যথেষ্ট।
শিল্পমন্ত্রী বলেন, আমরা কেবল একেবারে আইন-শৃঙ্খলার দিক থেকেই শ্রীদেবীর নাচ ও আপনাদের ঐ মিছিলটা এক রাত্রিতে হবে এটাতে আশঙ্কা করছি। নানা জায়গার লোক আসবে, আপনাদের মিছিলেরও লোক আসবে, সারা রাতে ত সব লোক চলে যেতে পারবে না, বেশির ভাগ লোকই থেকে যাবে, যে-কোনো মিসক্ৰিয়ান্ট একটা গোলামল পাকিয়ে দিতে পারে।
সে ত যে কোনো দিনই পারে, সন্তোষবাবু বলেন। তা পারে।
কিন্তু শ্রীদেবীর সিনেমা এলে কলকাতায় হলের কাছে এজন্য পুলিশ পোস্টিং করতে হয় শুনি, আর এ একেবারে স্বশরীরে আবির্ভাব। আমি অবশ্য দেখি নি। কিন্তু যা রিপোর্ট পেলাম সে নাকি সেক্স সিম্বল। আপনারাই বা আপনাদের রাজনৈতিক সম্মিলনের অনুষ্ঠানের ব্যাপারে এরকম আর্টিস্ট আনলেন কেন বুঝলাম না। যা-হোক, আপনারা মিছিলটা এক দিন পেছিয়ে দিন।
মিছিল, মানে জল্পেশ্বর অভিযান? সন্তোষবাবু জিজ্ঞাসা করেন।
সম্মিলন ও অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের জায়গা থেকে সমবেত আপত্তির গুঞ্জন ওঠে। সন্তোষবাবু পেছন ফিরে একবার দেখেন। তারপর পাশে নকুলবাবুর সঙ্গে কথা বলে জেনে নিতে চান এটা কতটা সম্ভব বা কতটা অসম্ভব। সন্তোষবাবু তার ওকালতি বুদ্ধিতে মুহূর্তে অনুমান করে ফেলেন যে শ্রীদেবীর। নাচ ও জল্পেশ্বর অভিযানের দিনক্ষণ অপরিবর্তনীয়। এই বিষয়ে কোনো আপোশ হবে না। অন্য কোনো বিষয় নিয়ে হতে পারে।
সুস্থির দাঁড়িয়ে বলে, মাননীয় মন্ত্রী মহাশয়ের কাছে আমরা উত্তরখণ্ডীরা একটা অনুরোধ করছি যে শ্রী বীরেন বসুনিয়া যে-যুক্তিগুলি দিলেন তার প্রত্যেকটি ধরি-ধরি আলোচনা করেন আর না-হয় ত আমরা যে-ভাবে সম্মিলন ও ফাংশন করিবার চাহি করিতে দিন। আমরা আমাদের কর্মসূচির কোনো পরিবর্তন করিব না।
ময়নাগুড়ির এম-এল-এ হেমেনবাবু চট করে উঠে দাঁড়ান। তার গলার চাদরটা অর্ধেক তার গলায়, অর্ধেক চেয়ারে। তিনি ডান হাত দিয়ে চারদটাকে চেয়ারের ওপর ফেলে দিয়ে বলেন, শুনুন, আমি একটা কথা বলছি। বীরেনকাকাই কথাটি তুলেছেন। আমি দাঁড়িয়েই বলি, কারণ সবার মুখ দেখতে চাই। বীরেনকাকা বলেছেন বিষয়টির তিনটি দিক আছে–আইনগত দিক, আইনশৃঙ্খলার দিক ও রাজনীতির দিক। রাজনীতির দিকটা আমরা এখনো কেউ আলোচনা করি নাই কিন্তু করা উচিত। উত্তরখণ্ড আন্দোলন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন কিনা, উত্তরবঙ্গ পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে বাঁচবে নাকি বাইরে আসি বাঁচবে–এগুলি রাজনীতির কথা, এবং এ সব কথারই আলোচনা করতে হবে। এই মিছিলে না হোক, বাইরের মিটিঙে। পাবলিক মিটিঙে। বৈঠক মিটিঙে। সব জায়গায় এসব আলোচনা করতে হবে। আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে আমরা সেই রাজনৈতিক প্রচারে নামব। আপনারাও নামেন। কিন্তু শিল্পমন্ত্রী মশায়ের ভাল প্রস্তাব আপনারা প্রত্যাখ্যান করলেন। আপনাদের মিছিল একদিন পিছি দিলে আপনাদের কী ক্ষতি হত? কিন্তু আপনারা তাতে রাজি না হন। তা হলে আপনারাই বলেন–সরকারই বা কী করে ময়নাগুড়ি ও পাশাপাশি অঞ্চলের সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা সম্পর্কে নীরব থাকবে? আপনারা কাদের নিয়ে এই অনুষ্ঠানের টাকা তুলছেন? কারা এর পার্টনার? রামগোপাল আগরওয়ালা–সারা উত্তরবঙ্গে নেপালের সঙ্গেযে-চোরাবাজারের ব্যবসা চলে তাতে প্রধান টাকা খাটায় যে সে কমিটিতে আছে। এতে উত্তরখণ্ডীদের মধ্যে একটু গুঞ্জন উঠতেই হেমেনবাবু তার গলা আর-একটু চড়িয়ে দেন। তাতে তার বক্তৃতায় জনসভায় ভাষণের ভাব আসে। অফিসাররা মাথা নিচু করে শোনেন। আপনাদের আর-একজন পার্টনার সুখরাম বর্মন। সে তামাকের স্মাগলিঙে এখন বোধ হয় লক্ষপতি হয়ে নিজের নাম পর্যন্ত বদল করে ফেলেছে। এখন সে অমিতাভ বচ্চন। আপনাদের আর-একজন পার্টনার আসিন্দির রায়–গয়ানাথ জোতদারের জামাই। গয়ানাথ জোতদার সেটেলমেন্টের বিরুদ্ধে মামলা করে তিস্তা ব্যারেজের কাজ বন্ধ করার ষড়যন্ত্র করি যাচ্ছে আর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে মামলা করি ফরেস্টের গাছ কেটে বেচে নতুন বড়লোক হচ্ছে। আপনাদের পার্টনারদের অনেকেরই ত এই পরিচয়। আপনারা যদি উত্তরখণ্ড সম্মিলনই করবেন তা হলে আপনারা এই সব লোকদের ওপর নির্ভর করছেন কেন? কারণ, আপনাদের টাকার দরকার। এরা আপনাদের টাকা দিচ্ছে। এরা আপনাদের টাকা দিয়ে বম্বে থেকে শ্রীদেবী আনি দিচ্ছে আর আপনারা সেই টাকা সেই লোক নিয়ে জল্পেশ্বরের শিবের নামে সরকারবিরোধী মিছিল নি যাবেন। সরকারবিরোধী হলে আমাদের আপত্তি নাই। কিন্তু আমরা জানি আপনারা জল্পেশ্বরের পবিত্র নামকে সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করিবেন। সেখানে তিস্তাবুড়ির পূজা অনুষ্ঠান হবে। সেই পূজার শেষে আপনারা শপথ নিবেন তিস্তা ব্যারেজের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্যে। কী? না গয়ানাথ জোতদার বংশানুক্রমে যে-সব জমি বেআইনি ভাবে ভোগদখল করি আসছে গোচিমারিতে, বাসুসুবায়, গাজোলডোবায় সেই সব জমি তিস্তা ব্যারেজে নেয়া চলিবে না। তিস্তা ব্যারেজে হলে লাখ-লাখ কৃষকের উপকার। আপনারা সেইটা চাহেন। আপনারা চাহেন গয়ানাথ জোতদারদের, রামগোপাল আগরওয়ালা আর অমিতাভ বচ্চনদের মত জোতদার, কালবাজারি আর চোরাকারবারিদের উপকার। বীরেন কাকা এই সব কথার বিচার করেন। যা সাফ কথা, তা সাফ-সাফ হওয়াই ভাল। আপনারা শ্রীদেবীর নাচ দেখবেন কি হেমামালিনীর নাচ দেখবেন–তা দেখেন। কিন্তু ঐ নাচের নাম করি হাজার-হাজার মানুষকে জল্পেশ্বরের মত ধর্মস্থানে নি যাবেন আর তিস্তা ব্যারেজের বিরুদ্ধে অভিযান করিবেন তা আমরা হতে দিব না। আমরাও তাহলে পাল্টা মিছিল করিব। আমরা জানি মাসখানেকের মাথায় তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধন করিবেন আমাদের মুখ্যমন্ত্রী। সেই উদ্বোধনে বিক্ষোভ দেখাবার জন্যে উত্তরখণ্ড কামতাপুরী গোখাল্যান্ড সবাই জোট বাঁধছে। আপনাদের এই সম্মিলনের উদ্দেশ্যও সেই কারণে তোক জোগাড় করা। আমরাও ধানের বিচি খাই। আমরা জানি, বম্বের শ্রীদেবী আর কলকাতার যাত্রা আনতে কত খরচা হয়। আর এ-টাকা কোখিকে আসে। বীরেন কাকা খুব ভাল যুক্তি দিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু আমরা সোজাসুজি বলতে চাই কথাটা আইনশৃঙ্খলারও না, আইনেরও না, কথাটা রাজনীতির। আপনারা রাজনীতি করিছেন, আমরাও তাই রাজনীতি করব।
