সকলে, এমনকি অফিসাররাও, হো হো করে হেসে উঠতেই হেমেনবাবু দাঁড়িয়ে একবার সুবিমলবাবুর দিকে, আর-একবার সন্তোষবাবুর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে জোরে বলে ওঠেন, এই সুবিমলদা, সন্তোষদা, আপনাদের দুই বন্ধুর ফ্রেন্ডলি ম্যাচ থামান ত। মিটিঙটা ত শেষ করতে হবে। কাকা, বলেন।
বীরেনবাবু গলা পরিষ্কার করে নিয়ে হাতটা তোলেন। সন্তোষবাবু সেই হাতটার দিকে তাকিয়ে একটু হাসেন। বীরেনবাবু যখন এজলাশে তার সবচেয়ে শক্ত যুক্তিগুলো দেন তখন বা হাতটা এরকম একটু খাড়া রাখেন। টেবিলের দিকে তাকিয়েই বীরেনবাবু বলেন, ময়নাগুড়ির এম-এল-এ যে কথা বললেন সেটাই যদি এই মিটিঙের আলোচ্য হয় তা হলে তার জবাব খুব সোজা-শ্রীদেবী রোজ নাচছেন না, আর রোজ আমাদের সম্মেলন বেলা একটার আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। তার পঁচঘণ্টা পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে। সুতরাং সম্মিলনের লোক আর অনুষ্ঠানের লোক কোনো সময়ই এক হচ্ছে না।
বীরেনবাবু থামামাত্র হেমেনবাবু বলে ওঠেন, বাঃ, সেইটা নিয়েই ত ক্রাইসিস, শ্রীদেবীর নাচ হবে রাত্রিতে আর আপনাদের জল্পেশ্বর অভিযান হবে সকালে। তা হলে?
বীরেনবাবুর দিকে সবাই তাকায়। তিনি তার ভঙ্গি একটুও বদলান না, গলার স্বর একটুও তোলেন না। অপরিবর্তিত স্বর ও ভঙ্গি দিয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি মনোযোগ অনায়াসে টেনে নেন। কোনো-কোনো সময় এটাকে তার কৌশলই মনে হয়–যখন প্রতিপক্ষ তাদের আক্রমণ গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু অনেক সময় এটা তার স্বভাবই মনে হয়–যখন প্রতিপক্ষকে তিনি সরাসরি আক্রমণ কখনোই করতে পারেন না। বীরেনবাবু বলছিলেন, আমাদের কর্মসূচি অনুযায়ী শ্রীদেবীর অনুষ্ঠান হবে রাত নটা থেকে সাড়ে এগারটা। অনুষ্ঠানের সময় বেড়ে যাবার কোনো আশঙ্কা নেই। কারণ, অনুষ্ঠান শেষ করে শ্রীদেবী তার থাকার জায়গা শিলিগুড়িতে ফিরে যাবেন। তা ছাড়াও, এমন-কি অনুষ্ঠান দেরি করে শুরু হলেও শ্রীদেবী সাড়ে এগারটাতেই তার অনুষ্ঠান শেষ করবেন। প্রতিটি বেশি মিনিটের জন্যে আমাদের অতিরিক্ত এত টাকা দিতে হবে যা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। রাত সাড়ে এগারটায় আমাদের অনুষ্ঠান শেষ আর সকাল ছটায় জল্পেশ্বর শিবের মন্দিরের দিকে যাত্রা। মাঝখানে সাড়ে ছ-ঘণ্টা সময়। সুতরাং শ্রীদেবীর নাচের ভিড় আর জল্পেশ্বর শিবমন্দিরের যাত্রীদের ভিড় কোনো সময়ই মিলে যেতে পারে না। তা ছাড়াও, এখানকার লোক হিশেবে আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, বছরের এই সময় জল্পেশ্বর শিবের দিকে নানা জায়গা থেকে নানা তীর্থযাত্রীর দল আসে। তার সঙ্গে কোনো অনুষ্ঠান বা সম্মিলনের সম্পর্ক নেই। আমরা আমাদের সম্মিলন ও অনুষ্ঠানের শেষ দিন সেই চিরাচরিত তীর্থযাত্রায় যোগ দেব বলে স্থির করেছি। তীর্থযাত্রার জন্যে সরকারের অনুমতি কোনো কালে দরকার হয় না। বরং তীর্থযাত্রীদের যাতে অসুবিধে না হয় সেজন্যেই সরকার যথাযোগ্য ব্যবস্থা করে থাকেন, এ বছরও করছেন ও নিশ্চয়ই আরো করবেন।
সবাই একেবারে চুপ করে বীরেনবাবুর নিচু গলায় এই কথাগুলি শোনে। একজন কেউ জোরে-জোরে শ্বাস ফেলছিল, পাশের লোকটি তাকে খুঁচিয়ে থামিয়ে দেয়। বীরেনবাবুর কথা শেষ হওয়ার পর যে-অতিরিক্ত সময়টুকু চুপ করে থাকতে হয়, তার কথা শেষ হয়েছে কি না বুঝতে, সেটুকু সময় কেটে গেলে, সন্তোষবাবু ঘাড় দোলান, ওস্তাদি গানে বাহবা দেবার ভঙ্গিতে, আরগুমেন্ট, আরগুমেন্ট, চাপা স্বরে বলে ওঠেন, সুবিমল, কতদিন ধরে বলছি হাইকোর্টের একটা বেঞ্চ এখানে বসাও, বীরেনদার মত এই সব লিগ্যাল টেলেন্টকে কাজে লাগাতে পারতে! তোমার উত্তরখণ্ডও হত না, কামতাপুরীও হত না। কী লিগ্যাল টেলেন্ট! আরগুমেন্ট, আরগুমেন্ট!
.
১৬৫. শ্রীদেবীর নাচ ও জল্পেশ অভিযান নিয়ে রাজনীতি
শিল্পমন্ত্রীকে চেয়ারটা টেনে টেবিলের কাছে আনতে হয়। তারপর টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে তিনি বলেন বীরেনদা, আপনার কথা অঙ্কের হিশেবে ত ঠিক কিন্তু বেঅঙ্কের হিশেবটা মেলাবে কে?
শিল্পমন্ত্রী বীরেনবাবুকে চেনেন না। রাজনীতির ব্যাপারেও ওঁর পরিচয় তিনি কখনো পান নি। কিন্তু তিনি বুঝে গেছেন–ইনিই পারেন অবস্থাটা সামাল দিতে। তা ছাড়া ডেপুটি কমিশনার একটা কাগজ আগেই দেখিয়েছিলেন–তাতে পার্টনারদের নাম ও পরিচয় ছিল। অনুষ্ঠানের ও সম্মিলনের সম্পাদক হিশেবে সেখানে এই বীরেন্দ্রনাথ বসুনিয়ার নামই আছে।
অতিরিক্ত একটা উদ্দেশ্যও শিল্পমন্ত্রীর ছিল। বীরেনবাবুর কথাগুলি যে প্রভাব ফেলেছিল, সেটা কিছু নষ্ট করা।
অথবা হয়ত অভিজ্ঞতার জোরেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, মিটিঙের সামনে সমাধানের একটা মুহূর্ত এসেছে, ওটাকে কাজে লাগানো উচিত। সুবিমলবাবু বা হাঁটুর ওপর ডান পা তুলে ডান হাঁটু নাচাচ্ছেন–শাদা চারদরটা ঠোঁট পর্যন্ত ভোলাই কিন্তু একটু বায়ে কেতরে বসেছেন। ওঁর চোখেমুখে বেশ একটা প্রশংসার হাসি। আর, এই সবের ফলে যে সুবিমলবাবু স্বনির্বাচিত সভাপতি হয়ে বসেছিলেন, মিটিঙের এই চরম মুহূর্তে তাকেই সভার বিষয় থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী মনে হয়। এমন-কি, তাকে বিপক্ষের, প্রতি কিছু সহানুভূতিশীলও ঠেকে যায় যেন।
শিল্পমন্ত্রীর জিজ্ঞাসার জবাবে বীরেনবাবু চোখ তুলে তাকান। সন্তোষবাবু জিজ্ঞাসা করেন, বেঅঙ্কের হিশেবটা কী সেটা বলুন।
